‎সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি আর বন্দুকের দাপট ডেভিড ইমনের উত্থানের গল্প ‎

প্রকাশিত: ২৯ জুলাই ২০২৬, ০৯:৩৬ পিএম
‎সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি আর বন্দুকের দাপট ডেভিড ইমনের উত্থানের গল্প  ‎

‎মোহাম্মদ ইব্রাহিম, চট্টগ্রাম প্রতিনিধি: ‎

‎দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী মহলে আতঙ্কের আরেক নাম ছিল ডেভিড ইমন। চাঁদাবাজি, সশস্ত্র হামলা, গুলিবর্ষণ ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের একাধিক অভিযোগে অভিযুক্ত এই শীর্ষ সন্ত্রাসী অবশেষে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জালে ধরা পড়েছেন।

‎বুধবার (২৯ জুলাই) যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার ধুমধুমপুর এলাকায় চট্টগ্রাম ও যশোর জেলা পুলিশের যৌথ অভিযানে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। একই অভিযানে আরও চারজনকে আটক করা হয়েছে। দীর্ঘদিন পলাতক থাকা ডেভিড ইমনের গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে চট্টগ্রামের আলোচিত সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

‎সাধারণ জীবন থেকে অপরাধ জগতের উত্থান

‎পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ডেভিড ইমনের প্রকৃত নাম মোবারক হোসেন ওরফে ডেভিড ইমন। তিনি চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগর এলাকার মো. মুসার ছেলে।

‎স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, একসময় তিনি সাধারণ জীবনযাপন করতেন। তবে সময়ের সঙ্গে শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ গ্রুপে যোগ দিয়ে দ্রুত অপরাধ জগতে নিজের অবস্থান শক্ত করেন। একের পর এক সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে অল্প সময়েই তিনি হয়ে ওঠেন গ্রুপটির অন্যতম প্রভাবশালী সদস্য।

‎সাজ্জাদ গ্রুপের ‘সেকেন্ড ইন কমান্ড’

‎আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, হত্যা, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী হামলাসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে ডেভিড ইমন সাজ্জাদ গ্রুপের ‘সেকেন্ড ইন কমান্ড’ হিসেবে পরিচিতি পান। বিদেশি পিস্তল হাতে তার একাধিক ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তাকে ঘিরে আতঙ্ক আরও বাড়ে।

‎দুবাইয়ে থেকেও চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ

‎পুলিশের দাবি, দেশ ছেড়ে দুবাইয়ে অবস্থান করলেও থেমে থাকেননি ডেভিড ইমন। বরং সেখান থেকেই চট্টগ্রামের বিভিন্ন ব্যবসায়ী ও প্রতিষ্ঠানের কাছে নিয়মিত চাঁদা দাবি করতেন। অভিযোগ রয়েছে, তার নির্দেশে চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানানো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, বাসাবাড়ি ও বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা ও গুলিবর্ষণের ঘটনাও ঘটেছে।

‎ডিডিএন কার্যালয়ে হামলার পর সামনে আসে নাম

‎গত ১৩ জুলাই চট্টগ্রাম নগরের চকবাজার এলাকায় ডিডিএন নামে একটি ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে সংঘটিত সশস্ত্র হামলার ঘটনায় ডেভিড ইমনের নাম ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে।

‎মামলার এজাহার অনুযায়ী, হামলার আগে হোয়াটসঅ্যাপে কল করে নিজেকে ডেভিড ইমন পরিচয় দিয়ে প্রতিষ্ঠানের মালিকের কাছে এককালীন ২ কোটি টাকা এবং পরে প্রতি মাসে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়।

‎চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানানো হলে ৩০ থেকে ৪০ জনের একটি সশস্ত্র দল অফিসে হামলা চালিয়ে কম্পিউটার, ল্যাপটপ, প্রিন্টার, আসবাবপত্রসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম ভাঙচুর করে। পাশাপাশি নগদ অর্থ ও মূল্যবান সামগ্রী লুটের অভিযোগও রয়েছে।

‎ভাইরাল অডিও নিয়ে তদন্ত

‎হামলার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে একটি অডিও ক্লিপ। সেখানে নিজেকে ডেভিড ইমন পরিচয় দেওয়া এক ব্যক্তি বলতে শোনা যায়, "আমরা ছুরি-কিরিচ নিয়ে হামলা করি না, আমাদের হামলার ধরন চট্টগ্রামের মানুষ জানে।" তবে অডিওটির সত্যতা এখনও তদন্তাধীন বলে জানিয়েছে পুলিশ।

‎যেভাবে ধরা পড়লেন

‎যশোরের পুলিশ সুপার সৈয়দ রফিকুল ইসলাম জানান, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ধুমধুমপুর এলাকায় চেকপোস্ট বসিয়ে অভিযান পরিচালনা করা হয়। যৌথ অভিযানে ডেভিড ইমনকে আটক করে পরে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

‎চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বলেন, ডেভিড ইমনসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একই সঙ্গে তার সহযোগী দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী রায়হানসহ চক্রের অন্য সদস্যদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। নোয়াখালীতে পরিচালিত এক অভিযানে রায়হান অল্পের জন্য পালিয়ে গেলেও তাকে দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

‎পুলিশ জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ডেভিড ইমনের বিরুদ্ধে থাকা মামলার সংখ্যা, অপরাধ কর্মকাণ্ডের বিস্তারিত এবং গ্রেপ্তার অভিযানের পূর্ণাঙ্গ তথ্য তুলে ধরা হবে।