চাঁদা দাবির পর ডিডিএনে হামলা: গ্রেপ্তার ৮, ডেভিড ইমনকে ঘিরে তদন্তের নতুন মোড়
মোহাম্মদ ইব্রাহিম, চট্টগ্রাম প্রতিনিধি:
চট্টগ্রাম নগরের আন্ডারওয়ার্ল্ডে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত নাম মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ‘ডেভিড ইমন’। বিভিন্ন হত্যা, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের ঘটনায় এর আগে তার নাম আলোচনায় এলেও সাম্প্রতিক সময়ে চকবাজারে ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান ডিজিটাল ডট নেট (ডিডিএন)-এর কার্যালয়ে হামলার ঘটনায় তাকে ঘিরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিচারিক নিষ্পত্তি এখনো হয়নি।
এদিকে, হামলার মাত্র একদিনের মধ্যে অভিযানে নেমে ঘটনার সঙ্গে জড়িত আটজনকে গ্রেপ্তার করেছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি)। পুলিশের দাবি, হামলাটি ছিল পূর্বপরিকল্পিত এবং চাঁদা আদায়ের উদ্দেশ্যে সংঘটিত।
যেভাবে শুরু হয় ঘটনা
সিএমপির তথ্যমতে, গত ১১ জুলাই ডিডিএনের স্বত্বাধিকারীর হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে বিদেশি নম্বর থেকে কল আসে। কলকারী নিজেকে ‘ডেভিড ইমন’ পরিচয় দিয়ে এককালীন দুই কোটি টাকা এবং পরবর্তীতে প্রতি মাসে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে। দাবি মানতে অস্বীকৃতি জানালে প্রতিষ্ঠানটিতে হামলার হুমকি দেওয়া হয়।
দুই দিন পর, ১৩ জুলাই দুপুর ১২টা ১৫ থেকে ১২টা ৩০ মিনিটের মধ্যে, চকবাজার থানার চন্দনপুরা-বাকলিয়া এক্সেস রোডের মরিয়ম হাইটস ভবনের তৃতীয় তলায় অবস্থিত ডিডিএন কার্যালয়ে ৩০ থেকে ৪০ জন অস্ত্রধারী হামলাকারী প্রবেশ করে।
১৫ লাখ টাকার ভাঙচুর, লুট ৩৫ লাখ টাকার ব্যাগ
মামলার এজাহার অনুযায়ী, হামলাকারীরা অফিসে থাকা কম্পিউটার, ল্যাপটপ, প্রিন্টার, ফিঙ্গারপ্রিন্ট মেশিন, আসবাবপত্র, কাচের দরজাসহ বিভিন্ন মালামাল ভাঙচুর করে। এতে প্রায় ১৫ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়।
এ ছাড়া অফিসের ড্রয়ারে থাকা ৪৭ হাজার টাকা, তিনটি অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ফোন, একটি ক্যানন প্রিন্টার এবং প্রতিষ্ঠানের পরিচালক অরিফুল ইসলামের কাঁধের ব্যাগ নিয়ে যায়। ওই ব্যাগে কর্মচারীদের বেতনের জন্য রাখা প্রায় ৩৫ লাখ টাকা ছিল বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।
রাতভর অভিযানে ৮ জন গ্রেপ্তার
মঙ্গলবার সিএমপি কার্যালয়ে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) মোহাম্মদ ফয়সাল আহম্মেদ জানান, পুলিশ কমিশনার হাসান মো. শওকত আলীর নির্দেশনায় চকবাজার থানা, সিএমপির একাধিক চৌকস টিম এবং র্যাব-৭ যৌথভাবে রাতভর অভিযান চালিয়ে আটজনকে গ্রেপ্তার করে।
গ্রেপ্তাররা হলেন মো. ইউনুস (৪১), ইমরান হোসেন চ্যাং (৩১), আকবর হোসেন (২৪), মো. সুমন (২৭), মো. মনির ওরফে কেহেরমান (৩৮), মো. গিয়াস উদ্দিন (২১), মো. নয়ন (২০) এবং মোহাম্মদ আবদুল নাহিদ ওরফে ফরহাদ (২৮)।
তাদের আদালতে পাঠানো হয়েছে এবং অন্যদের ধরতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
গ্রেপ্তারদের বিরুদ্ধে আগেও একাধিক মামলা
সিএমপির তথ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তার হওয়া কয়েকজনের বিরুদ্ধে আগে থেকেই চাঁদাবাজি, অস্ত্র, মাদক, মানবপাচার, ডাকাতি, ছিনতাই, চোরাচালান ও দ্রুত বিচার আইনের একাধিক মামলা রয়েছে।
পুলিশের ভাষ্য, এসব ব্যক্তিকে ঘিরে আগে থেকেই অপরাধমূলক তথ্য ছিল। হামলার ঘটনার পর প্রযুক্তিগত তথ্য ও গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ করে তাদের শনাক্ত করা হয়।
তদন্তে এখন ডেভিড ইমন
ডিডিএনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আদিল বিন মামুন অভিযোগ করেছেন, হামলার দুই দিন আগে বিদেশি নম্বর থেকে ফোন করে নিজেকে ডেভিড ইমন পরিচয় দিয়ে চাঁদা দাবি করা হয়েছিল। টাকা না দিলে অফিসে হামলার হুমকি দেওয়া হয়। এরপরই হামলার ঘটনা ঘটে।
পুলিশ বলছে, অভিযোগটি তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে শুধুমাত্র কারও নাম ব্যবহার করা হয়েছে বলেই তার সম্পৃক্ততা নিশ্চিত হয়ে যায় না। প্রযুক্তিগত তথ্য, কল রেকর্ড, সিসিটিভি ফুটেজ এবং অন্যান্য আলামত বিশ্লেষণ করে প্রকৃত সম্পৃক্ততা যাচাই করা হচ্ছে।
আন্ডারওয়ার্ল্ডে কেন আলোচিত ডেভিড ইমন?
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, ডেভিড ইমন
চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগরের বাসিন্দা এবং বিদেশে অবস্থানরত শীর্ষ সন্ত্রাসী 'বড় সাজ্জাদ'-এর ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন তদন্তে তাকে বড় সাজ্জাদের নেটওয়ার্কের মাঠপর্যায়ের সমন্বয়কারী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া ২০২৫ সালের বাকলিয়ার আলোচিত জোড়া হত্যা মামলা, পতেঙ্গার ঢাকাইয়া আকবর হত্যা মামলাসহ বিভিন্ন ঘটনায়ও তার নাম এসেছে। তবে এসব অভিযোগ এখনো বিচারাধীন এবং আদালতে প্রমাণিত হয়নি।
গুজব বনাম বাস্তবতা
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ডেভিড ইমন গ্রেপ্তার হয়েছেন বলে একটি ফটোকার্ড ভাইরাল হয়। পরে সিএমপি আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়, সেটি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর। পুলিশ কমিশনারের নামে প্রচারিত বক্তব্যও ভুয়া বলে জানানো হয়।
বর্তমান প্রেস ব্রিফিংয়েও পুলিশ জানায়, ডেভিড ইমনকে ঘিরে তদন্ত চলছে এবং তাকে আইনের আওতায় আনতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ
হামলার পর চট্টগ্রামের ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের মালিকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। আইএসপিএবি চট্টগ্রাম বিভাগ সংবাদ সম্মেলন ও মানববন্ধন করে হামলাকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তার, চাঁদাবাজি বন্ধ এবং আইএসপি খাতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে।
যে প্রশ্ন এখন সামনে
ডিডিএনে হামলার ঘটনায় আটজন গ্রেপ্তার হলেও তদন্তের কেন্দ্রবিন্দুতে এখনো রয়েছেন কথিত ডেভিড ইমন এবং হামলার নেপথ্যের নির্দেশদাতারা। পুলিশ বলছে, প্রযুক্তিগত তথ্য, গোয়েন্দা নজরদারি ও জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে পুরো চক্রকে শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে।
এখন দেখার বিষয়, গ্রেপ্তার হওয়া আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদে হামলার মূল পরিকল্পনাকারী ও অর্থদাতাদের বিষয়ে নতুন কোনো তথ্য সামনে আসে কি না। সেই উত্তর মিলবে চলমান তদন্ত শেষ হওয়ার পরই।








