দুদক মামলায় চাকরিচ্যুত সেই আবুল হাসানের বিরুদ্ধে গ্রামবাসীর নানা অভিযোগ

প্রকাশিত: ০৩ জুলাই ২০২৬, ১০:০১ পিএম
দুদক মামলায় চাকরিচ্যুত সেই আবুল হাসানের বিরুদ্ধে গ্রামবাসীর নানা অভিযোগ

কালিয়াকৈর( গাজীপুর) প্রতিনিধিঃ

দুর্নীতি মামলায় গ্রেফতার ও কারাভোগ করা সমালোচিত সেই কর পরিদর্শক আবু হাসান মোহাম্মদ খাইরুল ইসলামের বিরুদ্ধে এবার নানা অভিযোগ তোলছেন গ্রামবাসী। চাকরিচ্যুত হয়ে তিনি এখন মরিয়া হয়ে উঠেছেন গ্রাম্য রাজনীতিতে। তবে জনগণের সেবায় নয় বরং নিজ স্বার্থ হাসিলে ব্যাস্ত তিনি। একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কমিটির সভাপতি পদে দৌড়ঝাঁপ, বিভিন্ন ব্যবসায়ীকে হয়রানিসহ কয়েকজন বখাটে যুবকদের ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের নামে অভিযোগ তৈরি করে হয়রানির অভিযোগ উঠছে তার বিরুদ্ধে।

সরেজমিন ঘুরে জানা যায়, গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার ঢোলসমুদ্র গ্রামের মৃত: চান মিয়ার ছেলে আবু হাসান, দুদকের মামলায় কয়েকদিন কারাভোগের পর জামিনে বেরিয়ে আসেন। এ ঘটনায় তাকে সাময়িক সময়ের জন্য চাকরিচ্যুত করা হয়। চাকরি হারিয়ে তিনি এবার প্রভাব বিস্তার শুরু করেন নিজ গ্রামে। তার আয় করা অবৈধ টাকার জোরে ২০২৫ সালের প্রথমদিকে তিনি কালিয়াকৈর উপজেলার বড়ইবাড়ী এ.কে.ইউ ইনস্টিটিউশন ও কলেজের গবর্নিং বডির এডহক কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হন। মাত্র আট মাসে তিনি প্রতিষ্ঠানের অফিস সংস্কার, এসি স্থাপন, বার্ষিক ক্রিড়া প্রতিযোগিতা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের নামে গড়মিল করেন লাখ লাখ টাকা।

নাম প্রকাশ না করে ওই প্রতিষ্ঠানের এক শিক্ষক বলেন, একটি বার্ষিক ক্রিড়া প্রতিযোগিতা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেই ব্যয় হয়েছে ১৪ লাখ টাকা। এছাড়াও প্রধান শিক্ষকের অফিস কক্ষ উন্নয়ন, এসি লাগানোর খরচ প্রায় ১৫ লাখ টাকা। যা আগে কখনোই হয়নি। প্রতিষ্ঠানে ফান্ডে অন্তত ৮০ লাখ টাকা থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে তার পরিমান খুব কম। যার কারণে অর্ধশত শিক্ষক কর্মচারীদের প্রাতিষ্ঠানিক বেতন গত ৬ মাস ধরে বকেয়া।

আরও এক শিক্ষক নাম প্রকাশ না করে বলেন, যে ব্যক্তি দুর্নীতি মামলার আসামি তিনি কিভাবে একটা প্রতিষ্ঠানের সভাপতি হতে পারে। তিনি থাকা অবস্থায় বিভিন্ন ভাবে আরও প্রতিষ্ঠানের ফান্ডের টাকা লুটপাট করেছে।

এদিকে আবু হাসান তার অর্জিত অবৈধ অর্থের বিনিময়ে কয়েকজন যুবক ও ছাত্রদল পরিচয়ধারী শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করে এলাকার ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে সরকারের বিভিন্ন দফতরে মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে হয়রানি করছে। সম্প্রতি উপজেলার বড়ইবাড়ী এলাকার কয়েকজন স”মিল ব্যবসায়ীদের নামে ভূয়া তথ্য দিয়ে বন বিভাগের কর্মকর্তা ও নামধারি সাংবাদিক এনে হয়রানির অভিযোগ উঠেছে। এ কাজে তার ব্যবহার করা রিমন মিয়া নামে এক শিক্ষার্থীকে টাকার বিনিময়ে ভাড়া করা হয়। শুধু তাই নয়, মাদক সেবনের দায়ে পুলিশ তাকে আটক করে নিলেও তাকে ছাড়িয়ে আনতে মোটা টাকা খরচ করেছেন আবু হাসান।

একই ভাবে তার আপন ছোট ভাই আশরাফুল আলম ও ঘনিষ্টজনদের দিয়ে বিভিন্ন সময়ে গ্রামের বিভিন্ন মানুষের বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যমূলক ভাবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন।

জানা গেছে, নিজেকে বিএনপি দলীয় লোক দাবী করে বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতার ঘনিষ্ঠজন পরিচয় দেন আবু হাসান।নিজের দুর্নীতি বন্ধ হলেও নিজের আপন ভাই আশরাফুল আলমকে বানিয়েছেন গাজীপুর ট্যাক্সেস বার এসোসিয়েশনের সদস্য। আবু হাসানের নানা কাজ এখন নিজের ভাইকে দিয়ে করান। চাকরি না থাকলেও ভাইয়ের মাধ্যমে এখনো অবৈধ আয়ের পথ তার সচল রয়েছে।

বড়ই বাড়ী গ্রামের এক ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করে বলেন, আগে আবু হাসানকে কেউ এলাকায় চিনতেন না। তিনি নিজের পরিচিতির জন্য গ্রামের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বহু টাকা দিয়েছেন। অবৈধ ভাবে অর্জন করা সম্পদের পাহার গড়েছে তিনি। গ্রামের সবাই তাকে টাকার কুমির বলে। এখন তিনি গ্রামে এসে ভিলেন হয়ে গেছে। তার দাপটে কেউ ভয়ে প্রতিবাদ করে না। অনেকেই তার ব্যাপারে মুখ খুলতেও ভয় পায়। 

নাম প্রকাশ না করে আরও এক বাসিন্দা জানান, যার বাড়িতে নুন আনতে পান্তা ফুড়াত তিনি এখন এলাকার সবচেয়ে বড়লোক। চাকরি না থাকলেও তিনি টাকা কামানোর রাস্তা খুব ভাল ভাবেই রব্দ করেছেন।গ্রামের মানুষকেও তিনি নানা ভাবে হয়রানি করে থাকে। তার পিছনে নাকি এই গ্রামের এক পুলিশ কর্মকর্তার শক্তি রয়েছে।

এসব বিষয়ে জানতে আবু হাসান মোহাম্মদ খাইরুল ইসলামের ব্যবহৃত মুঠোফোনে কল করলে তিনি প্রতিবেদককে বলেন, লিখে দেন, যা যা শুনেছেন সব লিখে দেন। এই বলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন তিনি। পরে একাধিকবার ফোনকল করলেও তিনি ফোন রিসিভ করেন নি। 

প্রসঙ্গত, কর পরিদর্শক আবু হাসান মোহাম্মদ খাইরুল ইসলামে অবৈধ সম্পদের সুনির্দিষ্ট অভিযোগে ২০২১ সালে আবু হাসান ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে দুটি মামলা করে দুদক। 

পরে কর পরিদর্শক আবু হাসান মোহাম্মদ খাইরুল ইসলাম ২০২১ সালের ৬ সেপ্টেম্বর কমিশনে সম্পদ বিবরণী দাখিল করেন। যেখানে তিনি মাত্র ২৮ লাখ ২৮ হাজার ২৭৭ টাকার অস্থাবর সম্পদের হিসাব জমা দেন। কিন্তু খাইরুল ইসলামের রেকর্ডপত্র পর্যালোচনায় তার নামে গাজীপুরের কালিয়াকৈরে ১৫ শতাংশ জমির ওপর ডুপ্লেক্স বাড়ির সন্ধান পায় দুদক। যার দালিলিক মূল্য পাওয়া যায় ১ কোটি ৩৩ লাখ ৪৪ হাজার ২৪৫ টাকা, যা তিনি গোপন করার চেষ্টা করেছেন। অন্যদিকে তার বিরুদ্ধে ১ কোটি ৩২ লাখ ১ হাজার ৮৯৮ টাকার সম্পদের তথ্য গোপন করার প্রমাণ পাওয়া গেছে। এছাড়া তার বিরুদ্ধে ২০১৯ সালে নতুন টিআইএন খুলে আয়কর নথিতে প্রতারণার আশ্রয়ে ভুয়াভাবে প্রদর্শন করে বৈধ করার অপচেষ্টা চালানোর অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে মামলায়।

অন্যদিকে, দ্বিতীয় মামলায় কর পরিদর্শকের স্ত্রী লাকী রেজওয়ানার ২০২১ সালের ৬ সেপ্টেম্বর দুদকে দাখিল করা সম্পদ বিবরণীতে ১ কোটি ৪১ লাখ ১৭ হাজার ৬৭১ টাকা সম্পদের তথ্য গোপনের প্রমাণ পাওয়া গেছে। প্রকৃতপক্ষে তিনি স্বামীর দুর্নীতির মাধ্যমে আয়ের অবৈধ উৎস আড়াল করতে সহযোগিতা করেছেন। খাইরুল ইসলাম তার আয়ের অবৈধ উৎস, প্রকৃতি, উৎস ও অবস্থান গোপন করতে তার স্ত্রী আসামি লাকী রেজওয়ানাকে ব্যবহার করে ওই গোপন করা সম্পদসহ মোট ২ কোটি ৬৮ লাখ ২৯ হাজার ৮৭৭ টাকার অবৈধ সম্পদ গড়েছেন।

সূত্র আরও জানায়, লাকী দুদকের দাখিল করা সম্পদ বিবরণীতে মোট ১ কোটি ৬৯ লাখ ৯১ হাজার টাকা।