সিংহ ঘুমাচ্ছে তাইতো ছাগল লাফাচ্ছে

প্রকাশিত: ২০ অক্টোবর ২০২৫, ১০:১৮ পিএম
সিংহ ঘুমাচ্ছে তাইতো ছাগল লাফাচ্ছে

আজকের লিখাটি একটি গল্প দিয়ে শুরু করছি। গল্পটি এরকম, বনের রাজা সিংহ প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে গর্জন দিয়ে জানান দেয় এই সাম্রাজ্যে একচ্ছত্র আধিপত্য তার। অন্যান্য পশু-পাখি জীব-জন্তু তখন যার যার মত ভয়ে চুপচাপ অবস্থান নেয়। একদিন দুপুরবেলা একটি হরিণ সিংহের ঢেরার কাছে এক পাল ছাগল কে মনের সুখে নাচতে দেখে ধারনা করে যে, সিংহ বুঝি আর নেই। তাই হরিণটি চেরার নিকটবর্তী জলাশয়ে পানি পান করতে গিয়ে সিংহের নাক ডাকার শব্দ শুনে। কান খাড়া করে দেখতে পায় সিংহটি ঘুমোচ্ছে। হরিণটি প্রাণ হাতে নিয়ে দৌড়াতে থাকে আর আল্লাহর কাছে শোকরিয়া জানায়, এ যাত্রায় তার অসীম দয়ায় সে প্রাণে বেঁচে গেছে।


জুলাই গণঅভ্যূত্থান পরবর্তী মানুষের আকাঙ্খা ছিল এবার হয়তো বা চুরি-ডাকাতি, ঘুষ-দুর্নীতি অন্যায় অবিচার থেকে দেশের মানুষের মুক্তি মিলবে। এ লক্ষ্যে সরকার, প্রশাসন, শিক্ষা-স্বাস্থ্য, ঐক্যমত কমিশন, সংবিধান সংস্কার সহ বিভিন্ন কমিশন গঠন করে। ইতিমধ্যে কিছু কিছু কমিশন সরকারের নিকট তাদের সুপারিশ প্রদান করেছে এবং ১৭ই অক্টোবর জুলাই সনদ স্বাক্ষরিত হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের রেফারেন্স এর ভিত্তিতে নব-গঠিত অর্ন্তবর্তীকালীন সরকার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে পুলিশ বিভাগে ব্যাপক সংস্কারসহ নানাবিধ কার্যক্রম গ্রহন করে। বির্পযন্ত পুলিশ প্রশাসনকে কর্মক্ষম করে মাঠের আইন শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে নানাবিধ পরিকল্পনা গ্রহণ করলেও তা ভেঙে যায়। তাই পুলিশের মনোবল ফিরিয়ে আনতে মাঠে থাকা সেনাবাহিনীকে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা প্রদান করে যৌথ অভিযান পরিচালনা শুরু করে। যৌথ অভিযান অব্যাহত থাকলেও চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, রাহাজানি-চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করা সরকারের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাড়ায়। চাঁদাবাজেরা এতটা বেপরোয়া যে ঢাকার মিডফোর্ডে মোঃ সোহাগ নামের এক ভাঙ্গারী ব্যবসায়ীকে পাথর দিয়ে আঘাত করে হত্যা করে। ভোলায় স্বামীকে বেধে রেখে তার সামনে স্ত্রীকে ধর্ষন করে চাঁদাবাজরা। তাছাড়া গত ৮ই অক্টোবর মালিবাগে বোরকা পরে ফরচুন শপিং মলের শম্পা জুয়েলার্স থেকে ৫০০ ভরি স্বর্ণ লুট করে দুর্বৃত্যুরা। আইন শৃঙ্খলা পরস্থিতি অবনতি হতে থাকলে মানুষের স্বপ্ন ভঙ্গ শুরু হয়। জনগণ এখন বলাবলি করছে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা নিয়ে মাঠে যৌথ বাহিনী আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হলে সিভিল সরকারের নিকট আর কি বা করার বাকী থাকে। অপরদিকে প্রশাসনে ফ্যাসিবাদী আমলের কর্মকর্তারা বহাল তরিয়তে থাকায় ভারা হাত পা গুটিয়ে বসে আছে। কবে বর্তমান সরকারের পতন হবে? ফলে প্রশাসনে এক ধরনের স্থবিরতা বিরাজ করছে। তাছাড়া ডিসি নিয়োগ কেলেঙ্কারী সহ নানান অনিয়ম দূর্নীতির খরব ইতি মধ্যেই সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।


আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়াটার্স জানায় জনসন এন্ড জনসন কোম্পানীর বেবী ট্যালকম পাউডারে ক্যান্সারের উপদান থাকায় গত ৮ই অক্টোবর ২০২৫ যুক্তরাষ্ট্রে ৯৬৬ মিলিয়ন ডলার জরিমানা করে পণ্যটি বাজার থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশ প্রদান করা হয়। নকল-ভেজাল নিম্ন মানের পণ্য পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে কোম্পানী কর্তৃক বাজার থেকে প্রত্যাহার করা হলেও বাংলাদেশে তার প্রচলন নাই বললেই চলে। ঔষধ শিল্পে বাংলাদেশ স্বয়ং সম্পূর্ণ হলেও দেশের কসমেটিকসের বাজার এখনো আমদানী নির্ভরশীল। পঁচাশি শতাংশ কসমেটিকস ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট, যুক্তরাজ্য, ভারত ও মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করে থাকে। ঔষধের মত কসমেটিকসকে ও রপ্তানীমূণী খাত হিসাবে প্রতিষ্ঠা করতে গত ২৩শে সেপ্টেম্বর ২০২৩ সংসদে ঔষধ ও কসমেটিকস আইন পাস করা হয়। দীর্ঘ ২ বছর অতিক্রান্ত হলেও আইনটির প্রয়োগ তেমন একটা পরিলক্ষিত হয় নি এবং নকল-ভেজাল কসমেটিকসে বাজার সয়লাব হলে ও দৃষ্টান্ত মূলক শাস্তি প্রদান করা যায়নি।


প্রতিটি ঔষধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া রয়েছে তাই ঔষধের বিজ্ঞাপন প্রচারে বিশ্বব্যাপী বিধি নিষেধ আরোপ করা হয়ে থাকে। ক্যান্সার, ডায়াবেটিকস, লিভার ডিজিস সহ দুরারোগ্য ব্যাধিসহ ৭ দিনেই মুক্তি, বিফলে মূল্য ফেরত এই রকম চটকদার বিজ্ঞাপন, ফেসবুক, ইউটিউব সহ অনলাইন মিডিয়ায় ব্যাপক হারে প্রচারিত হচ্ছে। এতে সহজ সরল মানুষ শুধু প্রতারিত হচ্ছে না অপচিকিৎসায় তাদের জীবন হুমকির মুখে পড়ছে। ইদানিং এক শ্রেণির অসাধু কোম্পানী ট্রেডিশনাল ঔষুধের সাথে যৌন উত্তেজক ভায়গ্রার উপাদান সিলডিনাফেল সাইট্রেট মিশিয়ে বানানো ক্যাপসুল ও বড়ি অথবা বিদেশী ঔষধের নামে যৌন উত্তেজক বিজ্ঞাপন ফেইজবুক সহ বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রচার করছে। বদমাইশ কোম্পানীগুলো এসব বিজ্ঞাপনের নিচে সেক্স ভিডিও ক্লিপ জুড়ে দিচ্ছে। ফলে ধর্ষণ ও যৌন হয়রানী দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং যুবসমাজ রসাতলে যাচ্ছে। বিদ্যমান আইনে এসব অপরাধকে ওয়ারেন্ট ব্যতীত গ্রেপ্তার করার ক্ষমতা সম্পূন্ন আমলযোগ্য অপরাধ বিবেচনা করে ৫ বছরের সশ্রম কারাদন্ডের বিধান রয়েছে। দিনের পর দিন এসব অপরাধ চোখের সামনে সংঘঠিত হতে থাকলেও এসব নিয়ন্ত্রণ করা দায়িত্ব প্রাপ্তরা চোখে রঙ্গিন চশমা লাগিয়ে বসে আছেন বলে সমাজ সচেতন বিজ্ঞ মহল মনে করছেন।


বাংলাদেশ কেমিষ্ট এবং ড্রাগিষ্ট সমিতি (বিসিডিএস), ঔষধ উৎপাদনকারী কোম্পানী কর্তৃক ফার্মেসীতে ঔষধ বিক্রয় কমিশন বৃদ্ধির দাবিতে গত ৯ই অক্টোবর জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে। উক্ত সাংবাদিক সম্মেলনে সংগঠনটির সভাপতি ঔষধ ব্যবসায়ীদের বিক্রয় কমিশন বৃদ্ধির পক্ষে বিভিন্ন দাবি দাওয়া পেশ করেছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী ১৯৪০ সাল থেকে ১৫ শতাংশ ঔষধ বিক্রয় কমিশন দিয়ে আসা হলেও ঔষষ প্রস্তুতকারী কোম্পানী সমূহ হঠাৎ করে তা ১২ শতাংশে নামিয়ে নিয়ে আসে। বিসিডিএস সন্ত্রপতির মতে দীর্ঘ

পেশ করেছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী ১৯৪০ সাল থেকে ১৫ শতাংশ ঔষধ বিক্রয় কমিশন দিয়ে আসা হলেও ঔষধ প্রস্তুতকারী কোম্পানী সমূহ হঠাৎ করে তা ১২ শতাংশে নামিয়ে নিয়ে আসে। বিসিডিএস সভাপতির মতে দীর্ঘ পঁচাশি বছরে ড্রাগ লাইসেন্স, ট্রেড লাইসেন্স ফিসহ ভ্যাট-ট্যাক্স, দোকান ভাড়া বহুগুন বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই তারা ঔষধ বিক্রয় কমিশন ৩০ শতাংশ করার দাবি জানিয়েছে এবং পনেরো দিনের মধ্যে উক্ত দাবি মানা না হলে পাঁচ লক্ষ কেমিষ্ট নিয়ে কঠোর কর্মসূচি দিতে বাধ্য হবেন বলে তিনি হুশিয়ারি দিয়েছেন।



অন্যদিকে ঔষধ উৎপাদন কারী ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানী সমূহের সংগঠন বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতি (বাপী) কাঁচা মালের মূল্য বৃদ্ধি, পানি, বিদ্যুৎ সহ ইউটিলিটিস বিল, কর্মচারীদের বেতন ও মার্কেটিং খরচ পূর্বের তুলনায় বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে বলে ঔষধের মূল্য বৃদ্ধির যৌক্তিকতা তুলে ধরেছেন। ইতিমধ্যে ঔষধের মূল্য কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে বলে সংবাদ প্রচারিত হয়েছে। কাঁচামালের মূল্য, উৎপাদন ব্যয় এবং মার্কেটিং খরচ মিলিয়ে ঔষধের মূল্য নির্ধারণ করা হয়ে থাকে। কাঁচা মালের আমদানী নির্ভরতা কমাতে বিগত ২০০৭ সালে মুন্সিগঞ্জের গজারিয়ায় ২৭ কোম্পানীকে ৪২টি অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যালস ইনগ্রেডিয়েন্ট (এপিআই) প্লান্ট বরাদ্দ দেয়। দীর্ঘ ২২ বছর অতিক্রান্ত হলেও মাত্র ৪টি প্রতিষ্ঠান এপিআই উৎপাদন শুরু করেছে। আমদানির বদলে নিজস্ব প্লান্টে কাঁচামাল উৎপাদন করা হলে ঔষধের মূল্য অনেকাংশে কমে যাবে বলে শিল্প সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছেন। মান্ধাতার আমলের বিক্রয় প্রতিনিধির (এমআর) মার্কেটিং এর বদলে অনলাইন মার্কেটিং চালু করা হলে এ খাতে ব্যয় অনেক কমবে বলে বিশেজ্ঞরা আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। তাছাড়া ডাক্তারদের গাড়ী, বাড়ি ফ্ল্যাট ও বিদেশ সফরসহ নানান ধরনের উপঢৌকন প্রদান করে ঔষধের প্রেসক্রিপসন করান বলে কোম্পানী গুলোর বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের পুরনো অভিযোগ রয়েছে। অনৈতিক উপঢৌকন প্রথা বন্ধ করা গেলে ঔষধের মূল্য ৩০ শতাংশ কমে যাবে বলে এক সমীক্ষায় জানা যায়। ঔষধের বাজারে বিদ্যমান বিশৃঙ্খল অবস্থা থেকে উত্তোরনের জন্য স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশন ই-প্রেসক্রিপশন সহ জেনেরিক নামে ঔষধ প্রেসক্রাইব করার সুপারিশ করেছেন।


বিসিডিএস ও ঔষধ শিল্প মালিক সমিতি মুখোমুখি অবস্থান নেয়ায় জনসাধারনের মাঝে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। ঔষধের মূল্য নির্ধারণে ভারতসহ উন্নত বিশ্বের অনেক দেশে প্রাইজ কমিশন রয়েছে। তারা বাজার পরিস্থিতি বিবেচনা করে ঔষধের মূল্য ও বিক্রয় কমিশন নির্ধারণ করে থাকে। বাংলাদেশেও ঔষধের বাজার মনিটরিং এর জন্য বাপী, বিসিডিএস, ক্যাব এবং ভোক্তা সংগঠনসহ সংশ্লিষ্টদের নিয়ে একটি শক্তিশালী কমিশন গঠন করা যেতে পারে। এমতাবস্থায় অন্তবর্তী সরকারের নিকট প্রত্যাশা, ন্যায্য মূল্যে মানসম্মত ঔষধ প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে দ্রুত প্রাইজ কমিশন গঠন করা হউক।

সড়কে মৃত্যুর মিছিল যেন থামছেই না। প্রতিদিন কোন না কোন সড়ক দুর্ঘটনায় অকালে ঝরে যাচ্ছে তরতাজা প্রাণ। এর মূল কারণ হিসাবে ফিটনেস বিহীন লক্কর ঝক্কর মার্কা গাড়ি, অপ্রসস্থ সড়ক, রাস্তায় ভটভটি ও বাজার এবং অদক্ষ ড্রাইভারসহ সড়ক আইনের সঠিক প্রয়োগের অভাবকে দায়ী করা হচ্ছে। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার আঞ্চলিক মহাসড়কটি খুবই ছোট পাশাপাশি দুইটি গাড়ী চলাচলের অনুপযুক্ত। প্রতিদিন সড়কটির কোন না কোন স্থানে দূঘর্টনা সংঘটিত হচ্ছে। কিছুদিন পূর্বে লোহাগড়া উপজেলার চুনতিতে কক্সবাজার গামী পিকনিকের মাইক্রো বাসের সাথে চট্টগ্রাম গামী রিলাক্স পরিবহনের যাত্রী বাহী বাসের মুখমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে শিশুসহ মাইক্রো বাসের ১০ জন যাত্রী ঘটনাস্থলেই নিহত হয। ভাই অত্যন্ত ব্যস্ত চট্টগ্রাম-কক্সবাজার আঞ্চলিক মহাসড়কটি ৬ লাইনে উন্নীত করার জন্যে এলাকাবাসী দীর্ঘদিন ধরে মানববন্ধন, ব্লকেড সহ নানামুখী আন্দোলন করে আসলেও কার্যকর কোন পদক্ষেপ এখনো গ্রহণ করা হয়নি। সড়কটি ৬ লাইনে উন্নীত হলে দূর্ঘটনা বহুলাংশে কমে যাবে এবং কক্সবাজারের পর্যটন শিল্পে ব্যাপক সাড়া পাওয়া বলে আশা করা হচ্ছে।


পরিশেষে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা সম্পন্ন সেনাবাহিনী মাঠে রেখে যদি আইন শৃঙ্খলার উন্নতি করা না যায়, নকল-ভেজান পণ্যে বাজার সয়লাব হয়ে যায়, যৌন উত্তেজক ঔষধের অবৈধ বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে প্রতারণা বন্ধ না হয়, সড়কে মৃত্যুর মিছিল চলতেই থাকে এবং কমিশন ভাগাভাগির দন্দ্বে জনস্বাস্থ্য হুমকির সম্মুখীন হয়, তাহলে স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে উপরোল্লেখিত ঘুমন্ত সিংহের ন্যায় দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তা ব্যাক্তিরা ও কি অঘোরে ঘুমাচ্ছেন ??? 


লেখক:

 ড. এম এন আলম

কলামিষ্ট ও অবসর প্রাপ্ত সরকারী কর্মকর্তা