রাজশাহীতে রাতে পাম্প ঘরে তার উধাও! — ওয়াসার সম্পদ লুটে নিচ্ছে চোর চক্র

প্রকাশিত: ২২ অক্টোবর ২০২৫, ০৬:১২ পিএম
রাজশাহীতে রাতে পাম্প ঘরে তার উধাও! — ওয়াসার সম্পদ লুটে নিচ্ছে চোর চক্র

ইব্রাহীম হোসেন সম্রাট, রাজশাহী প্রতিনিধি:

রাজশাহী নগরের বিভিন্ন এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে রাজশাহী পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষের (ওয়াসা) পাম্প ঘরগুলো থেকে বৈদ্যুতিক তার কেটে নেওয়া ও চুরির ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে গেছে। গত কয়েক সপ্তাহে অন্তত সাত-আটটি পাম্প ঘরে একই ধরনের চুরি ঘটেছে। ফলে একাধিক ওয়ার্ডে রাতের বেলা হঠাৎ পানির সরবরাহ বন্ধ হয়ে পড়ছে এবং নগরবাসী তীব্র ভোগান্তিতে পড়ছেন।

ওয়াসার কন্ট্রোল রুম ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নগরের ১২৩টি পাম্প ঘরের বড় অংশই রাতের বেলা অরক্ষিত থাকে। চোরচক্রগুলো সুযোগ বুঝে তালা ভেঙে বা ছাদের স্ল্যাব সরিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে বোর্ড থেকে পাম্প পর্যন্ত থাকা সাবমারসিবল ও টেন-আরএম বৈদ্যুতিক তার কেটে নিয়ে যায়। এতে পাম্প বন্ধ হয়ে পানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। গত ১১, ১৬, ১৯ ও ২০ অক্টোবরের চুরির ঘটনাগুলো এই ধারাবাহিকতার সাম্প্রতিক উদাহরণ।

চুরি হওয়া পাম্প এলাকার বাসিন্দারা জানান, রাতে তার কেটে গেলে পরদিন সকালে পানির অভাবে চরম দুর্ভোগে পড়তে হয়। মেরামত করতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় লাগে। স্থানীয় বৈদ্যুতিক মিস্ত্রি জয়নাল আবেদিন বলেন, “ইদানীং পাম্পঘর থেকে নিয়মিত তার চুরি হচ্ছে। দামি এসব তার মাদকাসক্তরা কেজি দরে বিক্রি করছে বলে মনে হয়।”

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই চোরচক্র মূলত তামা বা কপার তার টার্গেট করছে, কারণ এগুলোর বাজারমূল্য বেশি এবং কালোবাজারে সহজেই বিক্রি করা যায়। আন্তর্জাতিকভাবে এই প্রবণতাকে ‘কপার-থেফট’ বলা হয়, যা বিভিন্ন দেশের ইউটিলিটি অবকাঠামোতে বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। এর ফলে শুধু ওয়াসার সম্পদই নয়, নগরের পানি সরবরাহ ব্যবস্থাও ঝুঁকিতে পড়ছে।

ওয়াসার সচিব সুবর্ণা রানী সাহা সোমবার রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের (আরএমপি) কমিশনারকে চিঠি দিয়ে শহরের ১২৩টি পাম্প ঘরের ঠিকানাসহ রাত্রীকালীন টহল বাড়ানোর অনুরোধ জানান। তবে চিঠি দেওয়ার পর রাতেই নগরের কাজলা ও খোজাপুর গোরস্থানসংলগ্ন দুটি পাম্প ঘরে আবারও চুরির ঘটনা ঘটে। ওয়াসার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জনবল সংকটের কারণে রাতে পাম্প ঘরে কোনো কর্মী বা প্রহরী থাকে না। এ সুযোগেই চোরচক্র চুরি চালাচ্ছে।

রাজশাহী ওয়াসার উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (অর্থ ও প্রশাসন) তৌহিদুর রহমান বলেন, “রাতে পাম্প চলে না, তাই অপারেটররা থাকে না। আমাদের কোনো নৈশপ্রহরীও নেই। তাই চুরির ঘটনা ঘটছে। আমরা থানায় অভিযোগ দিচ্ছি এবং পুলিশ কমিশনারকে অনুরোধ করেছি টহল বাড়াতে।”

আরএমপি মুখপাত্র গাজিউর রহমান বলেন, “পাম্পগুলো রাতে অরক্ষিত থাকে, যা ওয়াসার নিজস্ব সম্পদ। তবে আমরা চুরির ঘটনাগুলোর তদন্ত করছি। কিছু এলাকায় রাত্রীকালীন টহল বাড়ানো হয়েছে।”

বিশ্লেষকদের মতে, এই ধারাবাহিক চুরি শুধু ওয়াসার নিরাপত্তা ব্যর্থতাই নয়, বরং একটি সুসংগঠিত অপরাধচক্রের ইঙ্গিত দেয়। স্থানীয় পর্যায়ে নিরাপত্তা জোরদার, নাইট গার্ড নিয়োগ, পাম্পঘরে সিসি ক্যামেরা স্থাপন এবং চুরি হওয়া তারের ক্রেতাদের আইনের আওতায় আনাই হতে পারে কার্যকর সমাধান।

নগরবাসীর দাবি, ওয়াসা ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয়ে দ্রুত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে পুরো নগরের পানি সরবরাহ ব্যবস্থা আরও বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে।