কালাইয়ে শিক্ষকের ওপর হামলার প্রতিবাদে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন
সউদ আব্দুল্লাহ, কালাই(জয়পুরহাট) প্রতিনিধি:
জয়পুরহাটের কালাই উপজেলায় মাদ্রাসার এক শিক্ষকের ওপর বর্বর হামলার প্রতিবাদে আজ শুক্রবার জুমার নামাজের পর স্থানীয় মুসল্লি ও এলাকাবাসী বিক্ষোভ ও মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছেন। ঘটনার সূত্রপাত বৃহস্পতিবার বিকেলে হলেও আজকের কর্মসূচি পুরো এলাকাজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে।
জানা যায়, কালাইয়ের হাতিয়র কামিল মাদ্রাসার আরবি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মাওলানা সেলিম রেজাকে বৃহস্পতিবার বিকেলে মাদ্রাসা থেকে ফেরার পথে নিজ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে দুই ব্যক্তি বেধড়ক মারধর করেন। অভিযুক্তরা হলেন স্থানীয় ব্যবসায়ী ও একই মার্কেটের ব্যবসায়ী আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ ও তার ভাই নুরনবী।এদের মধ্যে নুরনবীর স্ত্রী ঐ মাদ্রাসার এক শিক্ষার্থী,যিনি সম্প্রতি কামিল পরীক্ষা দিয়েছেন।
জানা গেছে, ফাজিল পরীক্ষার প্রবেশপত্র সংক্রান্ত কাগজপত্র না পাওয়াকে কেন্দ্র করে বৃহস্পতিবার সকালে মাদ্রাসা অফিসে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেন নুরনবী। অফিসে প্রবেশ করে হুমকি-ধামকি দেন তিনি। পরে সহকারী অধ্যাপক মাওলানা সেলিম রেজা ও মাওলানা ফারুক হোসেন তাকে শান্ত করার চেষ্টা করলে উল্টো তাদের সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে পড়েন তিনি।একপর্যায়ে ‘দেখে নেওয়ার’ হুমকি দিয়ে চলে যান নুরনবী।
গতকাল বিকেলে, মাওলানা সেলিম রেজা কালাই আহলে হাদীস মসজিদ মার্কেটে তার কাপড়ের দোকানে বসে ছিলেন। তখন অভিযুক্ত দুই ভাই সেখানে এসে আবারও কাগজপত্রের কথা তুলে তাকে দোকান থেকে টেনে বের করে মারধর শুরু করেন। মারধরের এক পর্যায়ে তিনি গলিতে পড়ে গিয়ে গুরুতর আহত হন। সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় জনগণ ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। তারা ঘটনাস্থলে ভিড় জমিয়ে অভিযুক্ত দুই ভাইকে তাদের দোকানঘরে অবরুদ্ধ করেন এবং জয়পুরহাট-বগুড়া মহাসড়কের বাসস্ট্যান্ড এলাকায় বিক্ষোভে ফেটে পড়েন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে উপজেলা নির্বাহী অফিসার শামিমা আক্তার জাহান এবং কালাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জাহিদ হোসেন ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে উত্তেজিত জনতাকে শান্ত করেন। পরে অভিযুক্ত দুই ভাইকে উদ্ধার করে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয়ে নেওয়া হয়। অবস্থা বেগতিক দেখে প্রশাসন দ্রুত ভ্রাম্যমাণ আদালত বসায় এবং অভিযুক্ত নুরনবী ও তার ভাই আব্দুল্লাহ আল মাহমুদকে ১৫ দিনের কারাদণ্ডাদেশ দেয়। শুক্রবার সকালে তাদেরকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
এই নির্মম ঘটনার প্রতিবাদে আজ শুক্রবার জুমার নামাজের পর কালাই আহলে হাদীস জামে মসজিদ থেকে বের হয়ে বিক্ষোভে ফেটে পড়েন মুসল্লিরা। এরপর তারা কালাই বাসস্ট্যান্ড এলাকায় জয়পুরহাট-বগুড়া মহাসড়কে অবস্থান নিয়ে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ করেন। সমাবেশে স্থানীয় রাজনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় নেতারা একযোগে এই বর্বরতার নিন্দা জানিয়ে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
বক্তব্য রাখেন কালাই টেকনিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ ও উপজেলা জামায়াতের নায়েবে আমীর তাইফুল ইসলাম ফিতা, পৌর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আব্দুল আলিম সরকার, আহম্মেদাবাদ ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক ও কালাই ডিগ্রি কলেজের সভাপতি মো. তাজ উদ্দিন আহম্মেদ, জুমার নামাজের ইমাম মাওলানা গোলাম মোস্তফা, মাওলানা মোজাফ্ফর হোসেনসহ আরও অনেকে।
বক্তারা বলেন, একজন সম্মানিত শিক্ষক, যিনি শুধু মাদ্রাসার শিক্ষকই নন, বরং কালাই আহলে হাদীস জামে মসজিদের খতিব এবং ঈদগাঁ মাঠের খতিব হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন, তার ওপর প্রকাশ্যে এমন হামলা গভীর লজ্জাজনক ও উদ্বেগজনক। তাঁরা আরও বলেন, শুধুমাত্র ১৫ দিনের কারাদণ্ড যথেষ্ট নয়, অভিযুক্তদের ব্যবসায়িক বরাদ্দ বাতিল, স্থায়ী বহিষ্কার এবং তাদের বিরুদ্ধে কঠোর মামলা দায়েরের দাবি জানান তারা।
মানববন্ধন চলাকালে পুলিশের কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা লক্ষ্য করা যায়। উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) শামিমা আক্তার জাহান জানান, পরিস্থিতি বর্তমানে শান্ত রয়েছে।অভিযুক্ত দুই ভাইকে গতকাল বৃহস্পতিবার ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করে উপজেলা কার্যালয়ে এনে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ১৫ দিনের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে এবং আজ শুক্রবার সকালে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়েছে। মার্কেট কমিটি এবিষয়ে কি পদক্ষেপ নেয়, সেদিকেও প্রশাসনের নজর রয়েছে বলে জানান তিনি।
অন্যদিকে, মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষও এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। হাতিয়র কামিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ আমিনুল ইসলাম বলেন, একজন শিক্ষককে এভাবে বাইরে এনে মারধর করা চরম ন্যক্কারজনক। আমরা এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই এবং আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করব।
আহত মাওলানা সেলিম রেজার সহকর্মী শামীম আহম্মেদ জানান, সেলিম হুজুরের শারীরিক অবস্থা ভালো নয়। বর্তমানে তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন। এ ঘটনায় শুধু কারাদণ্ড নয় বরং অভিযুক্তদের দোকান বরাদ্দ বাতিল করে মার্কেট থেকে বিতাড়িত করতে হবে।আমরা এবিষয়ে মার্কেট কমিটির সেক্রেটারিকে জানানোর পরেও এখন পর্যন্ত কোনো পদক্ষেপ তিনি নেননি।
ঘটনার পর থেকে কালাই আহলে হাদীস মসজিদ মার্কেট সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। কালাই থানার ওসি জাহিদ হোসেন জানান, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ সর্বদা প্রস্তুত রয়েছে। এলাকায় শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।









