২৪ ঘণ্টায় মৌসুমের সর্বোচ্চ বৃষ্টি, জলাবদ্ধতায় স্থবির চট্টগ্রাম
মোহাম্মদ ইব্রাহিম, চট্টগ্রাম প্রতিনিধি:
চট্টগ্রামে সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে টানা অতি ভারী বৃষ্টিতে নগরজীবন কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। মঙ্গলবার সকাল ৯টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসে ৩৩০ দশমিক ৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যা চলতি মৌসুমে সর্বোচ্চ। ভারী বর্ষণের সঙ্গে জোয়ারের প্রভাব মিলিয়ে নগরের বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। কোথাও হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমেছে, কোথাও সড়ক ধসে পড়েছে, আবার কোথাও গাছ উপড়ে পড়ে যান চলাচল ব্যাহত হয়েছে। দুর্ভোগে পড়েছেন অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী ও সাধারণ নগরবাসী।
আবহাওয়া ও ভূপ্রাকৃতিক কেন্দ্র চট্টগ্রামের উপপরিচালক মোহাম্মদ আবদুর রহমান খান বলেন, গত ২৪ ঘণ্টার বৃষ্টিপাত চলতি মৌসুমের সর্বোচ্চ। সম্প্রতি সৃষ্ট মৌসুমি নিম্নচাপের প্রভাব এবং সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর কারণে বৃষ্টিপাতের তীব্রতা বেড়েছে। যদিও নিম্নচাপটি ভারতের ঝাড়খণ্ড ও ওডিশা অঞ্চলে সরে গেছে, তবুও সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর কারণে আগামী অন্তত এক সপ্তাহ বৃষ্টির এই ধারা অব্যাহত থাকতে পারে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, মৌসুমি বায়ু বাংলাদেশের ওপর সক্রিয় এবং উত্তর বঙ্গোপসাগরে প্রবল অবস্থায় রয়েছে। এর প্রভাবে চট্টগ্রাম বিভাগে থেমে থেমে মাঝারি থেকে ভারী এবং কোথাও কোথাও অতি ভারী বৃষ্টি হচ্ছে। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কতা সংকেত বহাল রাখা হয়েছে। আগামী ৭২ ঘণ্টাও ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনার কথা জানিয়েছে আবহাওয়া অফিস।
টানা বৃষ্টির ফলে নগরের মুরাদপুর, বহদ্দারহাট, চকবাজার, বাকলিয়া, কাতালগঞ্জ, কাপাসগোলা, আগ্রাবাদসহ বিভিন্ন নিচু এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। অনেক এলাকায় হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমে যায়। বিভিন্ন সড়কে যানবাহন চলাচল ব্যাহত হওয়ায় সকাল থেকেই দীর্ঘ সময় আটকে থাকতে দেখা যায় অফিসগামী যাত্রী ও শিক্ষার্থীদের। পর্যাপ্ত গণপরিবহন না থাকায় অনেকে হেঁটে গন্তব্যে যাওয়ার চেষ্টা করেন।
অন্যদিকে রিকশাচালকদের অতিরিক্ত ভাড়া চাওয়ার অভিযোগও করেছেন যাত্রীরা। চকবাজার এলাকার বাসিন্দা শরিফুল ইসলাম বলেন, মূল সড়কে একটি খালি রিকশাও পাওয়া যায়নি। গতকাল সন্ধ্যায় হাঁটুসমান পানি ভেঙে বাড়ি ফিরতে হয়েছে। প্রায় প্রতিটি ভারী বর্ষণেই একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
কাতালগঞ্জের বাসিন্দা মো. হাবিব বলেন, সামান্য বৃষ্টিতেই তাঁদের বাসার নিচতলায় পানি উঠে যায়। আজ সকালে সন্তানকে স্কুলে নিয়ে যাওয়া ছিল অত্যন্ত কষ্টকর। পশ্চিম বাকলিয়ার বাসিন্দা আমানুল জানান, কে বি আমান আলী সড়ক পুরোপুরি পানির নিচে চলে যাওয়ায় তিনি অফিসে যেতে পারেননি।
ভারী বর্ষণের মধ্যে পতেঙ্গা এলাকায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বাইপাস সড়ক ধসে পড়ে। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) প্রধান প্রকৌশলী আহমেদ আনোয়ারুল নজরুল বলেন, আউটার রিং রোডের সঙ্গে সংযুক্ত একটি উড়ালসড়কের নির্মাণকাজের জন্য ওই বাইপাস সড়ক তৈরি করা হয়েছিল। অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে সড়কটির একটি অংশ ধসে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত অংশ দ্রুত মেরামতের কাজ শুরু হয়েছে।
বৈরী আবহাওয়ার কারণে নগরের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পূর্বনির্ধারিত পরীক্ষাও স্থগিত করা হয়েছে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের অধীন ৪৮টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা মঙ্গলবার নেওয়ার কথা থাকলেও তা স্থগিত করা হয়। সিটি করপোরেশনের প্রধান শিক্ষা কর্মকর্তা কিসিঞ্জার চাকমা বলেন, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে নতুন সময়সূচি ঘোষণা করা হবে।
এদিকে জলাবদ্ধতা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে সকালে নগরের বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র শাহাদাত হোসেন। তিনি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন।
কাতালগঞ্জ আবাসিক এলাকা পরিদর্শনের সময় মেয়র বলেন, গত সোমবার থেকে শুরু হওয়া বৃষ্টি এখনো অব্যাহত রয়েছে। হিজড়া খাল, জামাল খান খাল, আজব বাহার খাল ও গুলজার খালসহ বিভিন্ন খালে উন্নয়নকাজ চলছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড এসব কাজ বাস্তবায়ন করছে। কিছু কাজ এখনো বাকি থাকলেও সেগুলো দ্রুত শেষ করার চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি সিটি করপোরেশন নালা-নর্দমা পরিষ্কার করেছে। তাঁর দাবি, সামগ্রিকভাবে নগরের জলাবদ্ধতা আগের তুলনায় প্রায় ৮০ শতাংশ কমেছে। তবে কাতালগঞ্জ নিচু এলাকা হওয়ায় সেখানে বৃষ্টি চলাকালে পানি জমে। বৃষ্টি থেমে গেলে এক থেকে দেড় ঘণ্টার মধ্যে পানি নেমে যাওয়ার কথা।
তবে বাস্তব চিত্রে নগরের একাধিক এলাকায় দীর্ঘ সময় ধরে পানি আটকে থাকতে দেখা গেছে। বিশেষ করে নিচু ও খালসংলগ্ন এলাকাগুলোর বাসিন্দারা চরম দুর্ভোগে পড়েছেন।
নগরের জলাবদ্ধতা নিরসনে ১৪ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয়ের চারটি বড় প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন থাকলেও সেগুলোর কাজ এখনো সম্পূর্ণ হয়নি। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রকল্পটি হলো সিডিএর ৩৬টি খাল উন্নয়ন প্রকল্প। ২০১৭ সালে শুরু হওয়া প্রকল্পটির প্রাথমিক ব্যয় ছিল ৫ হাজার ৬১৬ কোটি টাকা। পরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ৬২৬ কোটি টাকায়। একই সঙ্গে প্রকল্পের মেয়াদও কয়েক দফা বাড়িয়ে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।
সিডিএ সূত্র জানায়, প্রকল্পটির প্রায় ৯৫ শতাংশ কাজ শেষ হলেও গত এপ্রিলের শেষ দিক থেকে মাঠপর্যায়ের কাজ বন্ধ রয়েছে। বর্ষা মৌসুমে পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়ে আশপাশের এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কায় সরকারের নির্দেশে অস্থায়ী মাটির বাঁধ অপসারণের পর কাজ স্থগিত করা হয়। সিডিএর নির্বাহী প্রকৌশলী আহমেদ মঈনুদ্দিন বলেন, বাকি কাজ অক্টোবরের আগে শুরু করা সম্ভব নয়। ফলে চলতি বর্ষায় চকবাজার, কাতালগঞ্জ, আগ্রাবাদসহ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো এখনো অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে।
নগর পরিকল্পনাবিদ ও প্রকৌশলীরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে চলা উন্নয়ন প্রকল্পগুলো কাঙ্ক্ষিত সুফল দিতে পারেনি। কারণ হিসেবে তাঁরা পরিকল্পনার ঘাটতি, বাস্তবায়নে ধীরগতি এবং চট্টগ্রামের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যকে যথাযথ গুরুত্ব না দেওয়ার বিষয়টি তুলে ধরছেন।
আইইবি, চট্টগ্রাম কেন্দ্রের সাবেক সভাপতি প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার বলেন, জোয়ারের সময় সমুদ্রের পানির উচ্চতা প্রায় পাঁচ মিটার পর্যন্ত উঠে যায়। অথচ নগরের অনেক আবাসিক এলাকা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মাত্র দুই থেকে তিন মিটার উঁচু। এ ছাড়া চট্টগ্রাম তার প্রাকৃতিক জলাধার এবং ১০৪টি খালের মধ্যে ৪৭টি ইতোমধ্যে হারিয়েছে। ফলে স্বাভাবিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
আবহাওয়াবিদদের মতে, মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকায় আগামী কয়েক দিনও চট্টগ্রামজুড়ে থেমে থেমে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি হতে পারে। ফলে পাহাড়ধস, জলাবদ্ধতা এবং নিম্নাঞ্চলে আকস্মিক জলাবৃদ্ধির ঝুঁকিও বাড়তে পারে। তাই প্রয়োজন ছাড়া বাইরে না যাওয়া এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারীদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
বর্ষার শুরুতেই মৌসুমের সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত আবারও স্পষ্ট করে দিয়েছে, উন্নয়ন প্রকল্পের অগ্রগতি সত্ত্বেও জলাবদ্ধতা এখনো চট্টগ্রাম নগরের অন্যতম বড় সংকট। প্রতি বছরের মতো এবারও কয়েক ঘণ্টার ভারী বৃষ্টিতেই জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে। নগরবাসীর প্রত্যাশা, সাময়িক পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই পরিকল্পনার মাধ্যমে এই দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করা হবে।









