প্লাস্টিকের দাপটে হারিয়ে যাচ্ছে সাতক্ষীরার বাঁশশিল্প

প্রকাশিত: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:২২ পিএম
প্লাস্টিকের দাপটে হারিয়ে যাচ্ছে সাতক্ষীরার বাঁশশিল্প

সূত্রঃ সংগৃহীত

জেলা প্রতিনিধি


একসময় সাতক্ষীরার গ্রামীণ জীবনে বাঁশ-বেতের তৈরি হাতপাখা, কুলা, ডালি, ঝুড়ি, চালুনি ও মাছ ধরার সরঞ্জামের ব্যাপক ব্যবহার ছিল। ঘর-গৃহস্থালি থেকে কৃষিকাজ—সব ক্ষেত্রেই এসব পণ্যের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে মানুষের চাহিদা বদলেছে। সস্তা ও সহজলভ্য প্লাস্টিকের পণ্যের দাপটে কমেছে বাঁশের তৈরি সামগ্রীর চাহিদা। ফলে সংকটে পড়েছেন ঐতিহ্যবাহী বাঁশশিল্পের কারিগর ও ব্যবসায়ীরা।


সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলার কোরাপাক্রাতলা গ্রামের সড়কের পাশে বসে বাঁশের চিকন শলা দিয়ে ঝুড়ি তৈরি করছিলেন ৬৫ বছরের বেশি বয়সী বিশ্বনাথ দাস। অভিজ্ঞ হাতে একের পর এক বাঁশের ফালি বুনে তৈরি করছেন ঝুড়ি।


বিশ্বনাথ দাস বলেন, বাপ-দাদার আমল থেকে তিনি এই কাজ করে আসছেন। একটি ঝুড়ি ১৫০ টাকায় বিক্রি করলেও বাঁশ ও অন্যান্য খরচে ৭০ থেকে ৮০ টাকা চলে যায়। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত কাজ করে সর্বোচ্চ দুটি ঝুড়ি তৈরি করা সম্ভব। আয় কম হলেও সংসার চালাতে বাধ্য হয়ে এখনো এ পেশা ধরে রেখেছেন তিনি।


একই এলাকার কারিগর পঞ্চরঞ্জন দাসের পরিবারও প্রায় ৭০ বছর ধরে বাঁশের কাজের সঙ্গে যুক্ত। বাপ-দাদার পেশা ধরে রাখলেও বর্তমানে এ কাজ থেকে আগের মতো আয় হয় না। কোনো রকমে সংসার চালাতে গিয়ে মাঝেমধ্যে ঋণও করতে হয় বলে জানান তিনি।


পঞ্চরঞ্জন বলেন, বাঁশের কাজের সামান্য আয় দিয়ে সন্তানদের পড়াশোনার খরচ চালানোও কঠিন হয়ে পড়েছে। অর্থের অভাবে তার এক ছেলের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গেছে।


কোরাপাক্রাতলা গ্রামের আরেক কারিগর অরবিন্দ দাস বাঁশ দিয়ে কাঁকড়া ধরার আটন, ঢাকনা, চিংড়ি ধরার খোলুই, মাটির ঝুড়ি, কাবড়া ও কুলাসহ বিভিন্ন পণ্য তৈরি করেন। তার তথ্য অনুযায়ী, গ্রামে প্রায় ৫০ জন মানুষ এখনো বাঁশের কাজের সঙ্গে যুক্ত।


তবে কাজ থাকলেও বাজার আগের মতো নেই। প্লাস্টিকের তৈরি ঝুড়ি, কুলা, ডালি ও অন্যান্য সামগ্রী সহজলভ্য হওয়ায় বাঁশের পণ্যের চাহিদা কমেছে। একই সঙ্গে বেড়েছে বাঁশ ও উৎপাদন খরচ।


কারিগর স্বপন দাস জানান, বর্তমানে একটি বাঁশ কিনতেই ১৫০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। কিন্তু সেই অনুপাতে তৈরি পণ্যের দাম বাড়েনি। স্বল্প সুদে বা সুদমুক্ত ঋণ এবং সরকারি সহায়তা পেলে বাঁশশিল্পের সঙ্গে যুক্ত মানুষগুলো টিকে থাকতে পারবেন বলে মনে করেন তিনি।


দেবহাটা উপজেলা পরিষদের সামনের সড়কে ভ্যানে করে বাঁশের পণ্য বিক্রি করেন ৬০ বছরের বেশি বয়সী রবিন দাস। প্রায় ২৫ বছর ধরে এ ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত তিনি। তার ভ্যানে টাবরা, কুলা, ডালি, টোকা ও ধামা-পালিসহ বিভিন্ন পণ্য থাকে। তিনি জানান, ১৮০ টাকায় একটি টাবরা কিনে ২০০ টাকায় বিক্রি করেন। এ ব্যবসার আয় দিয়েই তার সংসার চলে।


সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ব্রহ্মরাজপুর বাজারে বাঁশের পণ্য বিক্রি করেন কানাই কুমার। তার ভাষ্য, ব্যবসা শুরুর সময় প্লাস্টিকের ব্যবহার এতটা ছিল না। গত পাঁচ বছরে প্লাস্টিকের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় বাঁশের পণ্যের বাজার অনেকটাই সংকুচিত হয়েছে। ২০২৪ সালে প্রায় দুই লাখ টাকা লোকসান হয়েছে বলেও জানান তিনি।


বাজারে পণ্য বিক্রি করতে না পারায় কারিগর ও বিক্রেতা—দুই পক্ষই আর্থিক সংকটে পড়েছেন। অনেকে সমিতি ও সুদের টাকা নিয়ে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। বিক্রি কমে যাওয়ায় দিন আনা-দিন খাওয়া অবস্থায় জীবন কাটছে বলে জানান ব্যবসায়ীরা।


সাতক্ষীরা সদর উপজেলার চিংড়ি, ফয়জুল্লাহপুর, দেবহাটার কাজীরহাট, বিষ্ণুপুর ও পারুলিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় এখনো বাঁশের পণ্য তৈরি হয়। তবে চাহিদা কমে যাওয়ায় অনেক কারিগর বাধ্য হয়ে পেশা পরিবর্তন করছেন। কেউ কেউ ভ্যান চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন।


বাঁশের পণ্য তৈরির পুরো প্রক্রিয়াতেই রয়েছে শ্রম ও সময়ের প্রয়োজন। বাঁশ কেটে দা বা ছুরি দিয়ে চিকন ফালি তৈরি করা হয়। পরে সেগুলো রোদে শুকিয়ে বুনে তৈরি করা হয় ঝুড়ি, কুলা, ডালি, চালুনিসহ নানা পণ্য। পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে শেখা এই ঐতিহ্য এখনো ধরে রেখেছেন অনেকে। তবে নতুন প্রজন্মের মধ্যে এ পেশার প্রতি আগ্রহ ক্রমেই কমছে।


কালীগঞ্জের কারিগর মো. হোসাইন আলী বলেন, বাপ-দাদার পেশা বলেই তিনি এখনো কাজটি ধরে রেখেছেন। কিন্তু তার ছেলে-মেয়েরা এই পেশায় আসতে চায় না। কারণ পরিশ্রম বেশি, লাভ কম এবং পণ্যের চাহিদাও আগের মতো নেই।


সাতক্ষীরা বিসিকের প্রচার কর্মকর্তা পীযূষ ঘোষ বলেন, জেলার অনেক মানুষ বাঁশ ও বেতের কুটিরশিল্পের সঙ্গে যুক্ত। তাদের জন্য প্রশিক্ষণ ও ঋণের সুযোগ রয়েছে। তবে সরকারি চাকরিজীবী জামিনদারের শর্ত থাকায় অনেক কারিগর ঋণ নিতে পারছেন না। ‘একটি পণ্য, একটি গ্রাম’ প্রকল্পের আওতায় এ শিল্প টিকিয়ে রাখতে উদ্যোগ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে বলেও জানান তিনি।


কারিগর ও ব্যবসায়ীদের দাবি, প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো এবং বাঁশের পণ্যের বাজার সম্প্রসারণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে এ শিল্প টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে। বাঁশের শলায় বোনা প্রতিটি পণ্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে সাতক্ষীরার গ্রামীণ জীবনের পুরোনো ঐতিহ্য। কিন্তু কমতে থাকা চাহিদা, বাড়তি উৎপাদন খরচ ও ঋণের চাপে সেই ঐতিহ্য এখন অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে।


এমকে/বিএম২৪