তীব্র তাপদাহে বাড়ছে নানান রোগব্যাধি, ঝুঁকিতে শিশু ও বৃদ্ধরা

প্রকাশিত: ০৫ জুলাই ২০২৬, ০৪:২৩ পিএম
তীব্র তাপদাহে বাড়ছে নানান রোগব্যাধি, ঝুঁকিতে শিশু ও বৃদ্ধরা

 শাহীন আহমেদ, কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি:

একসময় শীতপ্রধান জেলা হিসেবে পরিচিত কুড়িগ্রাম এখন ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উত্তরাঞ্চলের এই সীমান্তবর্তী জেলায় গ্রীষ্ম মৌসুমে দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ, খরা ও অস্বাভাবিক উচ্চ তাপমাত্রা প্রায় নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। চলমান দাবদাহে জনজীবন যেমন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে, তেমনি ঘরে ঘরে বাড়ছে নানা ধরনের রোগব্যাধি। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি, গর্ভবতী নারী, কৃষক, শ্রমিক এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত মানুষ।

জেলার বিভিন্ন উপজেলা ঘুরে এবং স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট সূত্রের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তীব্র গরমের কারণে হাসপাতাল, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও বেসরকারি ক্লিনিকগুলোতে রোগীর চাপ আগের তুলনায় বেড়েছে। বিশেষ করে ডায়রিয়া, পানিশূন্যতা, হিট স্ট্রোক, চর্মরোগ, শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা এবং মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত জটিলতায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।

নাগেশ্বরী উপজেলার দক্ষিণ রতনপুর গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল জলিল বলেন, প্রচণ্ড গরমে মাঠে কাজ করার সময় তিনি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেন।

রাজারহাট উপজেলার ওমর মজিদ গ্রামের বাসিন্দা দিনেশ চন্দ্র বর্মন বলেন, অতিরিক্ত গরমের কারণে হঠাৎ তার ডায়রিয়া শুরু হয়। বাড়িতে স্যালাইন খেয়েও অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় তাকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়।

কুড়িগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. নিসর্গ মেরাজ চৌধুরী বলেন, তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মানুষের শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রমে প্রভাব পড়ে। অতিরিক্ত ঘাম, বিশুদ্ধ পানির সংকট এবং খাদ্যদূষণের কারণে বিভিন্ন রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। এ অবস্থায় শিশু ও বৃদ্ধরা সবচেয়ে বেশি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকেন।। এছাড়াও এই গরমে যে বিষয়গুলো সবার মেনে চলা দরকার-

 অতিরিক্ত গরমে প্রাপ্ত বয়স্কদের দিনে কমপক্ষে ৩লিটার ও বাচ্চাদের ক্ষেত্রে ১.৫-২লিটার পানি পান করা উচিত।

দিনে তিনবারের বেশি পাতলা পায়খানা হলে দ্রুত খাবার স্যালাইন খাওয়ানো এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া।

হিট স্ট্রোকের ঝুঁকি কমাতে দীর্ঘ সময় রোদে কাজ না করা, শরীরের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে, মাথা ঘোরা, বমি বমি ভাব, দ্রুত হৃদস্পন্দন, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, অতিরিক্ত দুর্বলতা কিংবা বিভ্রান্তিকর আচরণ দেখা দিলে দ্রুত রোগীকে ছায়াযুক্ত স্থানে নিয়ে ঠান্ডা করার ব্যবস্থা করতে হবে এবং যত দ্রুত সম্ভব হাসপাতালে নিতে হবে।

চর্মরোগের ঝুঁকি কমাতে অতিরিক্ত ঘাম এবং অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে দীর্ঘ সময় না থাকা।

 হাঁপানি ও দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসতন্ত্রের রোগে আক্রান্ত, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ এবং কিডনি রোগীদের জন্যও গরম আবহাওয়া বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করছে।

 কয়েকদিন ধরে টানা জ্বরের সঙ্গে মাথাব্যথা বা শরীরব্যথা ডেঙ্গু, চিকেনগুনিয়া ও টাইফয়েডের লক্ষণ, তাই অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

কুড়িগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন ডা. স্বপন কুমার বিশ্বাস বলেন, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের শরীরে খুব দ্রুত পানিশূন্যতা দেখা দেয়। ফলে ডায়রিয়া, জ্বর, হিট র‌্যাশ, শ্বাসকষ্ট এবং ঘামাচির ঝুঁকি তাদের মধ্যে বেশি থাকে। স্কুলগামী শিশু ও কিশোর-কিশোরীরা দীর্ঘ সময় বাইরে খেলাধুলা বা যাতায়াতের কারণে হিট এক্সহসশন ও পানিশূন্যতায় আক্রান্ত হতে পারে। তাই শিশুদের পর্যাপ্ত পানি পান করানো এবং রোদে দীর্ঘ সময় অবস্থান না করার বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা কমে যায়। ফলে তাপপ্রবাহের সময় তাদের শরীরে দ্রুত জটিলতা দেখা দিতে পারে। এ কারণে পর্যাপ্ত পানি ও তরল খাবার নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি আরও জানান, গভবিষ্যতে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপপ্রবাহের মাত্রা আরও বাড়তে পারে। তাই শুধু চিকিৎসা সেবার ওপর নির্ভর করলে চলবে না। জনসচেতনতা বৃদ্ধি, পর্যাপ্ত বৃক্ষরোপণ, নিরাপদ পানির ব্যবস্থা এবং শিশু ও বয়স্কদের জন্য বিশেষ সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি জানান, কুড়িগ্রামের নদীবেষ্টিত বিভিন্ন এলাকা ও চরাঞ্চলে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে পরিবার পরিকল্পনা বিভাগ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ব্র্যাক, হ্যান্ডিক্যাপ ইন্টারন্যাশনাল এবং এসওএস-এর সহযোগিতায় বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।