ডিভোর্সি নারীকে বিয়ে করায় যুবককে সাড়ে ৫ লাখ টাকা জরিমানা, গ্রামছাড়ার অভিযোগ

প্রকাশিত: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৩৫ এএম
ডিভোর্সি নারীকে বিয়ে করায় যুবককে সাড়ে ৫ লাখ টাকা জরিমানা, গ্রামছাড়ার অভিযোগ

সূত্রঃ সংগৃহীত

রবিউল মোল্লা, শরীয়তপুর জেলা প্রতিনিধি


শরীয়তপুরের জাজিরায় ডিভোর্সি এক নারীকে বিয়ে করায় রতন সরদার (৪৫) নামে এক যুবককে সালিশে সাড়ে ৫ লাখ টাকা জরিমানা ও গ্রামছাড়া করার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে।


ঘটনার পর সালিশকারীদের ভয়ে গত নয় দিন ধরে গ্রাম ছেড়ে বিভিন্ন স্থানে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন রতন। এ ঘটনায় বিচার চেয়ে বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) জাজিরা থানায় লিখিত অভিযোগ করেছেন তিনি।


রতন জাজিরা উপজেলার বড়কান্দি ইউনিয়নের মনাই ছৈয়াল কান্দি গ্রামের মৃত রাজ্জাক সরদারের ছেলে।


রতনের অভিযোগ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, একই গ্রামের রুবেল শিকদারের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব ছিল। পারিবারিক কলহের জেরে ২০২৫ সালের ২৯ অক্টোবর রুবেল তার স্ত্রী রুবিনা আক্তারকে ডিভোর্স দেন। পরে চলতি বছরের ৩ আগস্ট রুবিনাকে বিয়ে করেন রতন।


রতনের দাবি, প্রথম স্ত্রীর সম্মতি নিয়েই তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন। তবে বিয়ের পর রুবেল শিকদার ও তার লোকজন তার বিরুদ্ধে পরকীয়ার অপবাদ দিয়ে সামাজিকভাবে হেয় করার চেষ্টা করেন।


এরই ধারাবাহিকতায় গত ৮ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় মনাই ছৈয়াল কান্দি এলাকায় সাবেক ইউপি সদস্য মতিউর রহমান খানের বাড়ির উঠানে সালিশ বৈঠক বসে। রতনের অভিযোগ, ওই বৈঠকে পাঁচ শতাধিক মানুষ উপস্থিত ছিলেন।


সালিশকারীদের মধ্যে জাজিরা উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি আলী আশরাফ মাল, সাংগঠনিক সম্পাদক মোশারফ বেপারী, বড়কান্দি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহসভাপতি রাজ্জাক শেখ, ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সদস্য মতিউর রহমান খান, লতিফ খান ও রাজ্জাক বেপারীসহ কয়েকজন ছিলেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। স্থানীয় আরও কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধেও ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগ করেছেন রতন।


রতনের অভিযোগ, সালিশে তার বিরুদ্ধে পরকীয়ার কোনো প্রমাণ না পেলেও তাকে সাড়ে ৫ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। একই সঙ্গে ৯ সেপ্টেম্বর সূর্য ওঠার আগেই তাকে গ্রাম ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।


তিনি আরও অভিযোগ করেন, সালিশকারীরা ভয়ভীতি দেখিয়ে তার কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা নিয়ে যান। এ ছাড়া রুবেল শিকদারের পরিবারের কাছে বন্ধক রাখা তার জমির এক লাখ টাকা কেটে নেওয়া হয়েছে। বাকি ৪ লাখ ৪০ হাজার টাকা এক মাসের মধ্যে তিন কিস্তিতে পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া হয়।


সালিশে উপস্থিত মোশারফ বেপারী বলেন, রতনের বিরুদ্ধে পরকীয়াসহ কোনো অপরাধের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এরপরও বেশিরভাগ সালিশকারী তাকে জরিমানা ও গ্রামছাড়া করার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি বলেন, গ্রামের বিচারে সর্বোচ্চ জরিমানা সাধারণত তিন লাখ টাকা হলেও রতনের ক্ষেত্রে এর চেয়ে বেশি জরিমানা করা হয়েছে।


অন্যদিকে সালিশকারীদের একজন রাজ্জাক বেপারী বলেন, রতনের কারণে রুবেল শিকদারের সংসার ভেঙে গেছে এবং পরে রতন রুবিনাকে বিয়ে করেছেন। এ কারণে সালিশে জুরি ভোটের মাধ্যমে তাকে সাড়ে ৫ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। পরে রতন মাফ চাওয়ায় জরিমানার পরিমাণ ৫০ হাজার টাকা কমানো হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।


রতনের প্রথম স্ত্রী হোসনে আরা বেগম বলেন, তার স্বামীর দ্বিতীয় বিয়েতে তার সম্মতি ছিল। স্বামীর বিয়েতে তার কোনো অভিযোগ নেই। এরপরও কয়েকজন মিলে তার স্বামীকে জরিমানা ও ঘরছাড়া করেছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। এ ঘটনায় জড়িতদের বিচার দাবি করেন হোসনে আরা।


অভিযোগের বিষয়ে রুবেল শিকদার বলেন, রতনের সঙ্গে পরকীয়ার কারণে তার সংসার ভেঙে গেছে। পরে রতন তার সাবেক স্ত্রীকে বিয়ে করেছেন। এতে তিনি আর্থিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এসব কারণে সালিশে রতনকে জরিমানা ও গ্রামছাড়া করা হয়েছে বলে জানান তিনি।


তবে পরকীয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন রতন সরদার। তিনি বলেন, রুবেল ও রুবিনার ডিভোর্স হয়েছে ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে। আর তিনি রুবিনাকে বিয়ে করেছেন চলতি বছরের আগস্টে। তাই তার বিরুদ্ধে পরকীয়ার অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই। স্থানীয় কিছু ব্যক্তি ক্ষিপ্ত হয়ে তার ওপর জুলুম করেছেন বলেও দাবি করেন তিনি।


জাজিরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সালেহ আহাম্মদ বলেন, রতন সরদার থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। বিষয়টি তদন্তের জন্য এসআই হেমায়েতকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


এমকে/বিডিমেইল২৪