ঠাকুরগাঁও-১ আসনে হিন্দু ভোটারদের দিকে নজর বিএনপি-জামায়াতের

প্রকাশিত: ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:০৭ পিএম
ঠাকুরগাঁও-১ আসনে হিন্দু ভোটারদের দিকে নজর বিএনপি-জামায়াতের

সংগৃহীত

রহমত আরিফ, ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি


ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচন ঘিরে সরগরম হয়ে উঠেছে জেলার রাজনৈতিক অঙ্গন। প্রতীক বরাদ্দের পর থেকেই শহর থেকে প্রত্যন্ত গ্রামের চায়ের দোকান, হাটবাজার ও পাড়া-মহল্লায় চলছে নির্বাচনি আলোচনা। এ আসনে জয়-পরাজয়ের হিসাব-নিকাশে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছেন প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার হিন্দু ভোটার। তাঁদের সমর্থন পেতে প্রচার-প্রচারণা ও গণসংযোগে ব্যস্ত সময় পার করছেন বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ প্রতিদ্বন্দ্বী দলের প্রার্থীরা।


স্থানীয়দের মতে, এ আসনে হিন্দু ভোটারদের অবস্থান নির্বাচনের ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ঐতিহাসিকভাবে আওয়ামী লীগের সমর্থক হিসেবে পরিচিত এই ভোটারদের সমর্থন পেতে এবার বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে বিএনপি। অন্যদিকে, প্রচলিত নির্বাচনি সমীকরণ বদলে তাঁদের ভোট নিজেদের পক্ষে টানতে মাঠে সক্রিয় রয়েছে ১১ দলীয় জোটের মনোনীত জামায়াতে ইসলামী।

মোট ভোটারের এক-চতুর্থাংশের বেশি হিন্দু

নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ঠাকুরগাঁও সদর, রুহিয়া ও ভূল্লী এলাকা নিয়ে গঠিত ঠাকুরগাঁও-১ আসনে মোট ভোটার ৫ লাখ ১৬ হাজার ১৩৮ জন। এর মধ্যে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার হিন্দু ধর্মাবলম্বী ভোটার রয়েছেন, যা মোট ভোটারের এক-চতুর্থাংশেরও বেশি।


ফলে এই ভোটারদের সমর্থন নির্বাচনের ফলাফলে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ভোটাররা।


গত জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের প্রতি হিন্দু ভোটারদের সমর্থন ছিল বলে স্থানীয়ভাবে আলোচনা রয়েছে। এবার তাঁর ছোট ভাই ও বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মির্জা ফয়সল আমীনের সামনে সেই সমর্থন ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ রয়েছে।

হিন্দু ভোট ধরে রাখতে সম্প্রীতির বার্তা বিএনপির

হিন্দু অধ্যুষিত গ্রাম ও পাড়া-মহল্লায় গণসংযোগ বাড়িয়েছেন বিএনপির নেতাকর্মীরা। ধর্মীয় স্বাধীনতা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও জানমালের নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোটারদের কাছে টানার চেষ্টা করছেন তাঁরা।


বিএনপির নেতারা বিভিন্ন পথসভা ও মতবিনিময় সভায় বলছেন, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব নাগরিকের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা তাঁদের অগ্রাধিকার।


বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মির্জা ফয়সল আমীন বলেন, হিন্দু ভোটাররা এখন আর আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংকে সীমাবদ্ধ নেই। ঠাকুরগাঁওয়ের হিন্দু সম্প্রদায় বিএনপির ওপর আস্থা রেখে ইতিবাচক প্রতিফলন পেয়েছে। যেকোনো পরিস্থিতিতে তাঁরা বিএনপির পাশেই থাকবেন বলে তিনি বিশ্বাস করেন।

হিন্দু ভোটারদের কাছে টানতে জামায়াতের প্রচারণা

অন্যদিকে, হিন্দু ভোটারদের সমর্থন আদায়ে সক্রিয় প্রচারণা চালাচ্ছেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. দেলাওয়ার হোসেন। ভোটারদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে এলাকার শান্তি-শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা ও উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন দলটির নেতাকর্মীরা।


জামায়াতের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, নির্বাচিত হলে এলাকায় চাঁদাবাজি, দখলদারত্ব ও অস্থিতিশীলতা প্রতিরোধে পদক্ষেপ নেওয়া হবে। পাশাপাশি সব সম্প্রদায়ের মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতিও দিচ্ছেন তাঁরা।


১১ দলীয় জোটের মনোনীত জামায়াত প্রার্থী মো. দেলাওয়ার হোসেন বলেন, দীর্ঘদিন ধরে তিনি হিন্দু সম্প্রদায়ের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে কাজ করেছেন এবং তাঁদের বোঝার চেষ্টা করেছেন। তাঁদের জীবনমান উন্নয়নে পাশে থাকার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন। এ কারণে হিন্দু ভোটাররা তাঁকে ভোট দেবেন বলে তিনি আশাবাদী।

নিরাপত্তা ও ধর্মীয় স্বাধীনতাই ভোটারদের প্রধান চাওয়া

নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক দলগুলোর নানা প্রতিশ্রুতির মধ্যে নিজেদের অধিকার, নিরাপত্তা ও শান্তিপূর্ণভাবে বসবাসের বিষয়টিকে গুরুত্ব দিচ্ছেন হিন্দু ভোটাররা।


ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার আকচা এলাকার বাসিন্দা বিশ্বজিৎ চক্রবর্তী বলেন, তাঁরা ভেবেচিন্তে ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেবেন। আগের মতো এবারও তাঁদের কিছু প্রত্যাশা রয়েছে। শান্তিতে বসবাস, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং জানমালের নিরাপত্তা তাঁদের প্রধান চাওয়া। যে দল ও প্রার্থী এসব বিষয়ে আস্থা দিতে পারবেন, তাঁরা তাঁকেই বেছে নেবেন।


ঠাকুরগাঁও সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক তাপস দেবনাথ বলেন, বিগত নির্বাচনে ঠাকুরগাঁওয়ের হিন্দু ভোটাররা একজোট হয়ে একজন প্রার্থীকে ভোট দিয়েছিলেন। তবে এবারও তাঁরা একইভাবে নির্দিষ্ট কোনো দলের দিকে ঝুঁকবেন, এমন ধারণা করা ঠিক হবে না। হিন্দু সম্প্রদায়ের ভোটাররা এখন অনেক বেশি সচেতন। তাঁরা দলীয় পরিচয়ের পাশাপাশি প্রার্থীর যোগ্যতাও বিবেচনায় নিচ্ছেন।

পাঁচ প্রার্থীর লড়াই, ভোট ২৯ অক্টোবর

ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন পাঁচজন প্রার্থী। তাঁরা হলেন—বিএনপির মির্জা ফয়সল আমীন (ধানের শীষ), বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মো. দেলাওয়ার হোসেন (দাঁড়িপাল্লা), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের হাফেজ ডা. মো. খাদেমুল ইসলাম (হাতপাখা), বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মো. আবদুল আলীম নিজামী (বটগাছ) এবং বাংলাদেশ কংগ্রেসের হুসাইন মুহাম্মদ ওমর ফারুক (ডাব)।


নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, আসনটির ১৮৫টি ভোটকেন্দ্রের ৯৮৯টি বুথে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। আগামী ২৯ অক্টোবর ভোটগ্রহণের তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রার্থীদের আনুষ্ঠানিক প্রচারণা চলবে ২৭ অক্টোবর সকাল ৮টা পর্যন্ত।


রিটার্নিং কর্মকর্তা ও নির্বাচন কর্মকর্তা মো. কামরুল ইসলাম বলেন, উৎসবমুখর পরিবেশে নির্বাচন আয়োজনের ব্যাপারে তাঁরা আশাবাদী। প্রার্থীরা প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছেন এবং এখন পর্যন্ত বড় ধরনের কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি। নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সেনাবাহিনী, পুলিশ ও আনসার সদস্যদের পাশাপাশি ১২ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।


সব মিলিয়ে ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে হিন্দু ভোটারদের সমর্থন আদায় বিএনপি ও জামায়াতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে ভোটারদের বক্তব্যে স্পষ্ট, কোনো দলের ঐতিহাসিক সমর্থক হিসেবে পরিচিত থাকাই এবার ভোট পাওয়ার নিশ্চয়তা নয়। নিরাপত্তা, ধর্মীয় স্বাধীনতা, প্রার্থীর যোগ্যতা ও জনকল্যাণে দেওয়া প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নই শেষ পর্যন্ত ভোটারদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে।


এমকে/বিএম২৪