চলনবিলে অতিথি পাখির মেলা, সৌন্দর্যের আড়ালে শিকারের ফাঁদ

প্রকাশিত: ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:১৩ পিএম
চলনবিলে অতিথি পাখির মেলা, সৌন্দর্যের আড়ালে শিকারের ফাঁদ

ছবি: বিডি মেইল


শীতের আগমনে মুখর জলাভূমি, পাখির নিরাপদ আবাসস্থল রক্ষায় অভয়াশ্রম গড়ার দাবি


মো. আব্দুর রউফ, গুরুদাসপুর (নাটোর) প্রতিনিধি


শীতের আগমনী হাওয়ায় প্রাণ ফিরে পাচ্ছে নাটোর, সিরাজগঞ্জ ও পাবনাজুড়ে বিস্তৃত প্রাকৃতিক জলাভূমি চলনবিল। নীল আকাশে পাখির ঝাঁক, জলরাশিতে ডুবসাঁতার আর বিলের কিনারে খাবারের সন্ধানে ছুটে চলা নানা প্রজাতির পাখির কলকাকলিতে মুখর হয়ে উঠছে চারপাশ। প্রকৃতির এই অপরূপ দৃশ্য মুগ্ধ করছে স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রকৃতিপ্রেমীদের। কিন্তু সৌন্দর্যের এই প্রাণবন্ত ছবির আড়ালেই রয়েছে উদ্বেগের ছায়া। কোথাও পাখি ধরার ফাঁদ, কোথাও বিষটোপ প্রয়োগের অভিযোগ, আবার কোথাও জলাভূমি সংকুচিত হওয়া ও পানির স্বল্পতায় হুমকির মুখে পড়ছে পাখির নিরাপদ আবাসস্থল।


সরেজমিনে চলনবিলের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, অগভীর পানিতে খাবার খুঁজছে সাদা বক, পানিতে ডুব দিয়ে শিকার ধরছে পানকৌড়ি, আর দল বেঁধে বিচরণ করছে বালিহাঁস। পাশাপাশি ডাহুক ও শামুকখোলসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখির উপস্থিতিতে বিলের প্রকৃতি ফিরে পাচ্ছে তার চিরচেনা রূপ। পাখির এই অবাধ বিচরণ দেখতে অনেকেই ছুটে আসছেন বিলের বিভিন্ন প্রান্তে।


প্রকৃতির এমন মনোমুগ্ধকর দৃশ্য একদিকে যেমন চলনবিলের সৌন্দর্য বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে পাখি শিকারের অভিযোগ পরিবেশসচেতন মানুষকে ভাবিয়ে তুলছে। তাঁদের মতে, এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে অতিথি পাখির নিরাপদ বিচরণক্ষেত্র হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।


জীববৈচিত্র্যের আধার চলনবিল


বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ প্রাকৃতিক জলাভূমি চলনবিল মৎস্য ও কৃষি উৎপাদনের জন্য সুপরিচিত। নাটোর, সিরাজগঞ্জ ও পাবনা জেলার বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে থাকা এই বিল বর্ষা শেষে জলজ প্রাণী ও পাখিদের জন্য নতুন পরিবেশ তৈরি করে।


বর্ষার পানি কমে এলে বিলের বিভিন্ন স্থানে অগভীর জলাশয় তৈরি হয়। এসব এলাকায় সহজে খাবার পাওয়ায় নানা প্রজাতির পাখির সমাগম ঘটে। তাদের উপস্থিতিতে প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে জলাভূমি। একই সঙ্গে পাখিরা খাদ্যশৃঙ্খল ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।


তবে জলাভূমির স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হওয়া, পানির স্বল্পতা এবং অবৈধ শিকারের কারণে পাখির নিরাপদ বিচরণ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।


ফাঁদ পেতে শিকার, ঝুঁকিতে অতিথি পাখি


স্থানীয় সূত্রে অভিযোগ পাওয়া গেছে, একশ্রেণির অসাধু শিকারি বাঁশের খুঁটি, কলাপাতা, খেজুরের ডালসহ বিভিন্ন উপকরণ ব্যবহার করে পাখি ধরার ফাঁদ তৈরি করেন। কোথাও কোথাও বিষটোপ প্রয়োগের অভিযোগও রয়েছে। খাবারের সন্ধানে জলাভূমিতে আসা পাখিরা এসব ফাঁদে পড়ে প্রাণ হারাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।


প্রকৃতিপ্রেমীদের আশঙ্কা, পাখি শিকারের পাশাপাশি জলাভূমির সংকোচন অব্যাহত থাকলে অতিথি পাখির আগমন ও বিচরণে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাই শিকারিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি পাখির নিরাপদ আবাসস্থল সংরক্ষণেও গুরুত্ব দেওয়ার দাবি উঠেছে।


২০১২ সাল থেকে পাখি সংরক্ষণে কাজ করছে সংগঠন


চলনবিলের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে চলনবিল জীববৈচিত্র্য রক্ষা কমিটি। সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, প্রতিবছর এ সময়ে খাবারের সন্ধানে বক, বালিহাঁস, পানকৌড়ি ও শামুকখোলসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখি চলনবিলে আসে। তাদের বিচরণে বিলের প্রকৃতি প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। তবে কিছু অসাধু শিকারি ফাঁদ পেতে এসব পাখি শিকার করেন।


তিনি বলেন, পাখি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় তাঁদের সংগঠন ২০১২ সাল থেকে চলনবিলের দুর্গম এলাকায় কাজ করছে। কোথাও পাখি শিকারের খবর পাওয়া গেলে প্রশাসনকে জানানো হয়। পাশাপাশি পাখি সংরক্ষণে মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরির জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে।


অভয়াশ্রম গড়ে তোলার দাবি স্থানীয়দের


চলনবিলের পাখি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় উপযুক্ত এলাকায় অভয়াশ্রম গড়ে তোলার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় কৃষক আব্দুস সামাদ, মোসলেম উদ্দিনসহ অনেকে।


তাঁদের ভাষ্য, অতিথি পাখি শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্য বাড়ায় না, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং কৃষিজমির ক্ষতিকর পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণেও ভূমিকা রাখে। তাই এসব পাখির নিরাপদ বিচরণ নিশ্চিত করা জরুরি।


স্থানীয়দের মতে, পাখি শিকার বন্ধে প্রশাসনের নিয়মিত নজরদারি, অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা এবং জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে জলাভূমির স্বাভাবিক পরিবেশ রক্ষা করতে পারলে চলনবিল অতিথি পাখির নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে টিকে থাকবে।


অভিযানে আটক, জেল-জরিমানা শিকারিদের


চলনবিলে পাখি শিকার বন্ধে প্রশাসনের অভিযানও পরিচালিত হচ্ছে। গত ৩ অক্টোবর নাটোরের সিংড়ায় অভিযান চালিয়ে তিন পাখি শিকারিকে আটক করা হয়। পরে সহকারী কমিশনার (ভূমি) পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ আদালত তাঁদের প্রত্যেককে দুই হাজার টাকা জরিমানা ও এক দিনের কারাদণ্ড দেন।


এর তিন দিন পর, ৬ অক্টোবর, আবারও অভিযান চালানো হয়। এ সময় ৫০টি জবাই করা পাখি উদ্ধার করা হয়। পাশাপাশি পাখি শিকারের সঙ্গে জড়িত পাঁচজনের বিরুদ্ধে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়।


তাঁদের মধ্যে তিনজনকে দুই মাস করে কারাদণ্ড এবং প্রত্যেককে দুই হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। অন্য দুই সহযোগীর একজনকে সাত হাজার টাকা এবং অপরজনকে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।


প্রশাসনের এমন অভিযান পাখি শিকার বন্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন স্থানীয় পরিবেশকর্মীরা। তবে তাঁদের মতে, বিচ্ছিন্ন অভিযানের পাশাপাশি নিয়মিত নজরদারি নিশ্চিত করা জরুরি।


পাখি রক্ষায় অভিযান অব্যাহত থাকবে


রাজশাহী বিভাগীয় বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপক ও পরিদর্শক মো. জাহাঙ্গীর কবির বলেন, চলনবিল জীববৈচিত্র্য রক্ষা কমিটির সহযোগিতায় পাখি শিকারের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে। পাখি শিকারের অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হচ্ছে।


তিনি আরও বলেন, পাখি শিকারের বিষয়ে কোনো তথ্য পাওয়া গেলে স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় অভিযান পরিচালনা করা হয়। বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে।


চলনবিলকে পর্যটনকেন্দ্র করার পাশাপাশি প্রকৃতি রক্ষার উদ্যোগ


নাটোর-৪ (গুরুদাসপুর-বড়াইগ্রাম) আসনের সংসদ সদস্য মো. আব্দুল আজিজ বলেন, চলনবিল এ অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ ও জীববৈচিত্র্যের আধার। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ এই জলাভূমিকে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পাশাপাশি পরিবেশ ও পাখি রক্ষায় সবাইকে সচেতন হতে হবে।


তিনি বলেন, পাখি শিকার বন্ধ, জলাভূমি সংরক্ষণ এবং পাখির নিরাপদ আবাসস্থল তৈরিতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।


সৌন্দর্য টিকিয়ে রাখতে চাই নিরাপদ আশ্রয়


চলনবিলের আকাশে পাখির ডানা মেলা, জলরাশিতে তাদের বিচরণ আর সকাল-সন্ধ্যার কলকাকলি এ অঞ্চলের প্রকৃতিকে দিয়েছে অনন্য বৈশিষ্ট্য। কিন্তু এই সৌন্দর্য ধরে রাখতে হলে শুধু অতিথি পাখির আগমন উপভোগ করলেই চলবে না, নিশ্চিত করতে হবে তাদের নিরাপত্তাও।


এ জন্য প্রয়োজন পাখি শিকারের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান, নিয়মিত প্রশাসনিক অভিযান, জলাভূমি সংরক্ষণ, অভয়াশ্রম প্রতিষ্ঠা এবং স্থানীয় মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ।


প্রকৃতির এই অমূল্য সম্পদ রক্ষায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া গেলে চলনবিল হয়ে উঠতে পারে অতিথি পাখির আরও নিরাপদ বিচরণক্ষেত্র। পাখির কলকাকলিতে মুখর এই জলাভূমি যেন শিকারিদের ফাঁদের আতঙ্ক নয়, বরং মুক্ত ডানায় উড়ে বেড়ানোর নিশ্চিন্ত আশ্রয় হয়ে ওঠে—এটাই প্রকৃতিপ্রেমী ও স্থানীয় মানুষের প্রত্যাশা।