তামাকজাত দ্রব্যের মোড়কে সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কতায় গুরুতর অনিয়ম: আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ

প্রকাশিত: ২৯ জানুয়ারি ২০২৬, ১০:৫১ পিএম
তামাকজাত দ্রব্যের মোড়কে সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কতায় গুরুতর অনিয়ম: আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ

ঢাকা প্রতিনিধি:

বাংলাদেশে তামাকজাত দ্রব্যের মোড়কে সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণী বাস্তবায়নে গুরুতর অনিয়ম ও আইন লঙ্ঘনের চিত্র উঠে এসেছে টোব্যাকো কন্ট্রোল অ্যান্ড রিসার্চ সেল (টিসিআরসি) পরিচালিত এক গবেষণায়। গতকাল ২৮ জানুয়ারি রাজধানীর বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এই গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করা হয়।

টোব্যাকো কন্ট্রোল অ্যান্ড রিসার্চ সেল (টিসিআরসি), ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি এবং বাংলাদেশ তামাক বিরোধী জোটের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত অনুষ্ঠানের শিরোনাম ছিল— “বাংলাদেশে তামাকজাত দ্রব্যের মোড়কে সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কতার বাস্তবায়নের অবস্থা: গবেষণার ফলাফল প্রকাশ ও প্রেস ব্রিফিং”।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) প্রাক্তন ন্যাশনাল প্রফেশনাল অফিসার ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. সৈয়দ মাহফুজুল হক। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন বিএসটিআই-এর মেট্রোলজি বিভাগের ডেপুটি ডিরেক্টর আবদুল্লাহ আল মামুন, ভাইটাল স্ট্রাটেজিসের সিনিয়র টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজার অ্যাডভোকেট সৈয়দ মাহবুবুল আলম তাহিন এবং বাংলাদেশ তামাক বিরোধী জোটের ভারপ্রাপ্ত সমন্বয়কারী ও প্রত্যাশা মাদক বিরোধী সংগঠনের সেক্রেটারি জেনারেল হেলাল আহমেদ।

বিশেষজ্ঞ আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ টোব্যাকো কন্ট্রোল অ্যাডভোকেটস (বিটিসিএ)-এর এক্সপার্ট সদস্য আমিনুল ইসলাম সুজন, গ্রামবাংলা উন্নয়ন কমিটির নির্বাহী পরিচালক এ কে এম মাকসুদ, পাবলিক হেলথ ল’ইয়ার্স নেটওয়ার্কের সদস্য সচিব ব্যারিস্টার নিশাত মাহমুদ, ডাস-এর টিম লিড আমিনুল ইসলাম বকুলসহ আরও অনেকে।

টিসিআরসির প্রজেক্ট কোঅর্ডিনেটর ফারহানা জামান লিজার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন টিসিআরসির প্রজেক্ট ডিরেক্টর ও ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক মো. বজলুর রহমান। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন টিসিআরসির প্রকল্প কর্মকর্তা মো. জুলহাস আহমেদ।

মূল প্রবন্ধে জানানো হয়, ‘ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০০৫ (সংশোধনী ২০১৩)’ এর ধারা ১০ অনুযায়ী দেশের আটটি বিভাগীয় শহরে বাজারজাত তামাকজাত দ্রব্যের মোড়কে সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণীর বাস্তব অবস্থা বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষণায় দেখা যায়, আইন অনুযায়ী মোড়কের নির্ধারিত অংশজুড়ে সতর্কচিত্র প্রদর্শনের বাধ্যবাধকতা থাকলেও বাস্তবে বহু পণ্যে এর আকার, অবস্থান, রঙ ও মুদ্রণের মান বিধিমালা অনুসরণ করা হয়নি। অনেক পণ্যে সতর্কবাণী নির্ধারিত আকারে ছাপা হয়নি এবং এমন স্থানে দেওয়া হয়েছে যা সহজে দৃশ্যমান নয়। কোথাও ছবি অস্পষ্ট ও মানহীন, আবার কিছু ক্ষেত্রে একই সতর্কচিত্র বারবার ব্যবহার করা হয়েছে, যা বিধিমালার পরিপন্থী।

গবেষণায় আরও বলা হয়, তামাকদ্রব্যের দুর্বল মোড়কজাতকরণ, উৎপাদনের তারিখের অনুপস্থিতি এবং তামাক কোম্পানির জবাবদিহিতার অভাবই আইন বাস্তবায়নের প্রধান অন্তরায়। এসব অনিয়ম রোধে তামাকজাত দ্রব্যের স্ট্যান্ডার্ড প্যাকেজিং চালু করা অত্যন্ত জরুরি।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডা. সৈয়দ মাহফুজুল হক বলেন, সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণী তামাক ব্যবহার নিরুৎসাহিত করার একটি কার্যকর উপায়। গবেষণায় উঠে আসা অনিয়মগুলো দ্রুত সমাধান না হলে জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি তৈরি হবে। নতুন অধ্যাদেশ দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

অ্যাডভোকেট সৈয়দ মাহবুবুল আলম তাহিন বলেন, বাজারে প্রচলিত পণ্যের মধ্য থেকেই একটি স্ট্যান্ডার্ড প্যাকেজিং মডেল নির্ধারণ করা হয়েছে, যাতে তামাক কোম্পানিগুলোর বাস্তবায়নে সমস্যা না হয়। স্ট্যান্ডার্ড প্যাকেজিং চালু হলে সচিত্র সতর্কবাণী সঠিকভাবে প্রদর্শনের পাশাপাশি কর আদায়ও সহজ হবে।

বিএসটিআই-এর ডেপুটি ডিরেক্টর আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, প্যাকেটজাত সব পণ্যের নিবন্ধন বাধ্যতামূলক। তামাকজাত দ্রব্যও মোড়কজাত পণ্য হওয়ায় তামাক কোম্পানির নিবন্ধন প্রয়োজন। অথচ গবেষণায় দেখা গেছে, বেশিরভাগ তামাক কোম্পানির নিবন্ধন নেই। নিবন্ধনের আওতায় আনা গেলে আইন বাস্তবায়ন সহজ হবে।

হেলাল আহমেদ বলেন, ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণী চালু হওয়ার পর থেকে গত এক দশক ধরে তামাক কোম্পানিগুলো ধারাবাহিকভাবে আইন লঙ্ঘন করে আসছে। আইনে মোড়কের উপরের অংশে সতর্কবাণী দেওয়ার নির্দেশ থাকলেও তা নিচের দিকে দেওয়া হচ্ছে।

সভাপতির বক্তব্যে মো. বজলুর রহমান বলেন, আইন থাকলেও বাস্তবায়ন দুর্বল হলে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা সম্ভব নয়। সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণী পুরোপুরি বাস্তবায়নের জন্য স্ট্যান্ডার্ড প্যাকেজিং চালু করা, কঠোর মনিটরিং এবং শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।

মুক্ত আলোচনায় তামাক নিয়ন্ত্রণে কর্মরত বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধি, চিকিৎসক, আইনজীবী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও সাংবাদিকরা অংশ নেন। তারা সম্প্রতি পাশকৃত অধ্যাদেশটি দ্রুত আইন হিসেবে কার্যকর করা, নিয়মিত বাজার তদারকি এবং আইন লঙ্ঘনকারী তামাক কোম্পানির বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান।



বা/মে২৪/ম