ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত সাত কলেজে প্রশ্ন ফাঁসের গোপন নেটওয়ার্ক: পাঁচ বছরে কোটি টাকার বাণিজ্যের অভিযোগ

প্রকাশিত: ২১ জানুয়ারি ২০২৬, ০১:৩১ এএম
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত সাত কলেজে প্রশ্ন ফাঁসের গোপন নেটওয়ার্ক: পাঁচ বছরে কোটি টাকার বাণিজ্যের অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক:

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত সরকারি সাত কলেজে অনার্স থেকে মাস্টার্স পর্যন্ত ফাইনাল পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের একটি সংঘবদ্ধ ও সুসংগঠিত চক্র দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় থাকার অভিযোগ উঠেছে। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, অন্তত পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে রাজধানীর সরকারি কলেজগুলোতে নিয়মিতভাবে প্রশ্ন ফাঁস হয়ে আসছে, যা পুরো পরীক্ষাব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাকে মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

অনুসন্ধান সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অত্যন্ত গোপন ও সুশৃঙ্খল কৌশলে পরিচালিত এই চক্র পরীক্ষার তিন থেকে চার দিন আগেই শিক্ষার্থীদের হাতে সম্পূর্ণ প্রশ্ন সেট তুলে দেয়। এর বিনিময়ে প্রতিটি সেটের জন্য শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে দেড় হাজার থেকে আড়াই হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়। একটি কলেজের একটি সেশন থেকেই দেড় থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত সংগ্রহের তথ্য পাওয়া গেছে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে নিয়মিত প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ

তথ্য অনুসন্ধানে বিশেষভাবে উঠে এসেছে রাজধানীর সরকারি কলেজগুলোর রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে অনার্স প্রথম বর্ষ থেকে মাস্টার্স ফাইনাল পর্যন্ত পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসের ধারাবাহিক অভিযোগ। সংশ্লিষ্টদের দাবি, প্রতিটি কলেজে ওই বিভাগের প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থী প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই প্রশ্ন বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থী জানান, প্রশ্ন সংগ্রহের আগে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন ধর্মীয় গ্রন্থে শপথ করানো হয়, যাতে বিষয়টি বাইরে প্রকাশ না পায়। তিনি বলেন,

“শুরুতে মনে হতো বিষয়টা সীমিত কয়েকজনের মধ্যেই আছে। কিন্তু পরীক্ষার হলে গিয়ে দেখি প্রায় সবার কাছেই একই প্রশ্ন। পরীক্ষা শেষে সবাই বলাবলি করে—সব প্রশ্ন কমন পড়েছে।”

আরেক শিক্ষার্থী জানান, পরীক্ষার তিন থেকে চার দিন আগেই তাদের হাতে সম্পূর্ণ প্রশ্ন সেট তুলে দেওয়া হতো। কেউ দেড় হাজার, কেউ আবার দুই হাজার থেকে আড়াই হাজার টাকা পর্যন্ত দিয়েছেন। পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের সঙ্গে আগেই পাওয়া প্রশ্নের হুবহু মিল ছিল বলে তিনি দাবি করেন।

অভিযোগের কেন্দ্রে ঢাকা কলেজের এক অফিস সহকারী

অনুসন্ধানে অভিযোগের কেন্দ্রে উঠে এসেছে ঢাকা কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অফিস সহকারী ও সাবেক শিক্ষার্থী ইলিয়াস হোসেনের নাম। তাঁর সঙ্গে বিভাগের কয়েকজন বর্তমান শিক্ষার্থীও যুক্ত বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে নতুন ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের কাছ থেকেই তুলনামূলক বেশি টাকা আদায় করা হয় বলে জানা গেছে। একটি নতুন ব্যাচ থেকেই দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা আদায়ের তথ্য মিলেছে।

পরীক্ষার হলে প্রশ্ন ফাঁসের সরাসরি প্রমাণ পাওয়ার দাবিও করেছেন সংশ্লিষ্টরা। অনার্স দ্বিতীয় ও চতুর্থ বর্ষ রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ফাইনাল পরীক্ষার সময় দুই শিক্ষার্থী জানান, পরীক্ষার আগেই প্রশ্ন সম্পর্কে তারা অবগত ছিলেন। পরবর্তীতে মোবাইলে সংরক্ষিত প্রশ্নের সঙ্গে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র মিলিয়ে হুবহু মিল পাওয়া যায়। একই ধরনের অভিযোগ অনার্স প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় বর্ষের পরীক্ষাগুলোতেও পাওয়া গেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক শিক্ষার্থী বলেন,

“দীর্ঘদিন ধরে একটি অসাধু চক্র সিনিয়রদের মাধ্যমে প্রশ্ন ফাঁস করছে। এতে পরিশ্রমী ও মেধাবী শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পুরো পরীক্ষাব্যবস্থার ওপর আস্থা হারাচ্ছে সবাই।”

অভিযোগ অস্বীকার অভিযুক্তের

অভিযোগ প্রসঙ্গে ইলিয়াস হোসেন বলেন, তিনি টানা পাঁচ বছর রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে যুক্ত ছিলেন না এবং মাঝখানে দুই বছর তিনি বিভাগে কাজ করেননি।

তিনি দাবি করেন, প্রশ্ন কমন পড়ার বিষয়টি সিলেবাস ও পূর্ববর্তী বছরের প্রশ্ন বিশ্লেষণের ফল। টাকা নেওয়ার অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, কারও কাছ থেকে তিনি কোনো অর্থ নেননি।

কর্তৃপক্ষের প্রতিক্রিয়া

ঢাকা কলেজ রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক মো. আবু সালেক খান বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে তিনি অবগত নন। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

সাত কলেজের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক হিমাদ্রি শেখর চক্রবর্তী বলেন, প্রশ্ন ফাঁসের বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য পেলে তা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে। এরপর তদন্ত কমিটি গঠন করে দোষীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে প্রস্তাবিত ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসক অধ্যাপক এ কে এম ইলিয়াস বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে তিনি আগে কিছু শোনেননি। সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পেলে তদন্তের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

বিশ্বাসযোগ্যতা সংকটে পরীক্ষা ব্যবস্থা

শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এ ধরনের প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ সত্য হলে তা শুধু শিক্ষার্থীদের মেধা মূল্যায়নকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে না, বরং দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।



বা/মে২৪/ম