এনজিওর আশ্বাসে ঋণ শোধ, তবুও মামলা থেকে রেহাই নেই; চার বছর ধরে আদালতে ঘুরছেন বৃদ্ধ খামারি

প্রকাশিত: ১৬ জুন ২০২৬, ১১:১৬ পিএম
এনজিওর আশ্বাসে ঋণ শোধ, তবুও মামলা থেকে রেহাই নেই; চার বছর ধরে আদালতে ঘুরছেন বৃদ্ধ খামারি

সউদ আব্দুল্লাহ,  কালাই (জয়পুরহাট) প্রতিনিধি:

ঋণের বকেয়া টাকা পরিশোধ করলেই মামলা প্রত্যাহার করা হবে—এমন আশ্বাস দিয়েছিল এনজিও কর্তৃপক্ষ। সেই আশ্বাসে নিজের সঞ্চয় ভেঙে, এমনকি সম্পত্তি বন্ধক রেখে ঋণের পুরো টাকাও পরিশোধ করেন ৭৪ বছর বয়সী খামারি শামসুর রহমান। কিন্তু ঋণ শোধের পরও মামলা থেকে মুক্তি মেলেনি তাঁর। উল্টো আজও তাকে নিয়মিত আদালতে হাজিরা দিতে হচ্ছে। এনজিওর পক্ষ থেকে মামলা প্রত্যাহার না করায় চরম ভোগান্তি ও মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে দিন কাটছে এই প্রবীণ খামারির।ঘটনাটি জয়পুরহাটের কালাই পৌরশহরের পাঁচশিরা বাজার এলাকায়। দীর্ঘদিন ধরে ন্যায়বিচারের আশায় বিভিন্ন দপ্তর ও ব্যক্তির দ্বারস্থ হলেও কোনো সুরাহা পাননি তিনি।

ভুক্তভোগী শামসুর রহমান জানান, ২০২১ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি ব্র্যাক মাইক্রোফাইন্যান্স (প্রগতি) কালাই শাখা থেকে তার পোল্ট্রি খামারের জন্য ৩ লাখ টাকা ঋণ গ্রহণ করেন। সেই অর্থে ব্রয়লার মুরগির বাচ্চা কিনে খামার পরিচালনা শুরু করেন। কিন্তু ঋণ নেওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই দেশে করোনা মহামারির প্রভাব শুরু হয়। একই সময় ব্রয়লার মুরগি খেলে ক্যান্সার হতে পারে, এমন গুজব ছড়িয়ে পড়লে বাজারে মুরগির চাহিদা একেবারে কমে যায়। বিক্রি করতে না পেরে দেড় থেকে দুই কেজি ওজনের অসংখ্য জীবিত মুরগি মাটিতে পুঁতে ফেলতে বাধ্য হন তিনি।

এতে কয়েক লাখ টাকার ক্ষতির মুখে পড়ে প্রায় নিঃস্ব হয়ে যান শামসুর রহমান। তারপরও প্রথম দিকে প্রতি মাসে ২৮ হাজার ৫০০ টাকা করে কিস্তি পরিশোধ করেন। পরবর্তীতে আর্থিক সংকটের কারণে নিয়মিত কিস্তি দিতে না পারলেও সামর্থ্য অনুযায়ী টাকা জমা দিতে থাকেন। একপর্যায়ে কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হলে ২০২৩ সালের ২১ সেপ্টেম্বর তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে ব্র্যাক। সে সময় এনজিওর দাবি ছিল প্রায় ১ লাখ ২২ হাজার টাকা।

শামসুর রহমানের অভিযোগ, মামলা দায়েরের পরও এনজিওর তৎকালীন ক্রেডিট অফিসার অজিত রায় তার কাছ থেকে কিস্তির টাকা আদায় করেন। ২০২৩ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর ৫ হাজার টাকা এবং পরের মাসেও আরও ৫ হাজার টাকা কিস্তি দেওয়া হয়। পরে আদালতের নোটিশ পাওয়ার পর তিনি এনজিওর ব্যবস্থাপক ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা আশ্বাস দেন,ঋণের মূল টাকা পরিশোধ করলে মামলা প্রত্যাহার করে নেওয়া হবে এবং সুদের টাকাও মওকুফ করা হবে।

এই আশ্বাসে তিনি সম্পত্তি বন্ধক রেখে টাকা জোগাড় করেন। মামলায় এনজিও ২ লাখ ৮৯৪ টাকার দাবি করলেও ২০২৩ সালের ৩০ নভেম্বর নগদ ৬৫ হাজার টাকা এবং তার সঞ্চয় হিসাবের অর্থসহ মোট ৭১ হাজার ২০০ টাকা আদায় করা হয়। শামসুর রহমানের দাবি, আদালতের মাধ্যমে টাকা গ্রহণ না করে এনজিও কর্তৃপক্ষ সরাসরি পাস বইয়ের মাধ্যমে ওই টাকা জমা নেয়। কিন্তু এরপরও মামলা প্রত্যাহার করা হয়নি।

বর্তমানে তাকে নিয়মিত জয়পুরহাট আদালতে হাজিরা দিতে হচ্ছে। তিনি বলেন, ঋণের টাকা শোধ করার পরও কেন আমাকে আদালতে ঘুরতে হচ্ছে, আমি জানি না। বাদীপক্ষ অনেক সময় আদালতে উপস্থিত না থাকলেও আমাকে হাজিরা দিতে হয়।খামার শেষ হয়ে গেছে,বয়স হয়েছে।এখন শুধু আদালত আর অফিসে ঘুরে বেড়াচ্ছি।

তিনি আরও বলেন,যারা আমাকে আশ্বাস দিয়েছিল তারা এখন আর ওই অফিসে নেই। নতুন কর্মকর্তারা দায়িত্ব নেওয়ার পর কেউ কোনো কথা বলতে চায় না। অনেক সময় কিছুই জানি না বলে আমাকে অফিস থেকে বের করে দেওয়া হয়। আমার সমস্যাটা দেখার যেন কেউ নেই।

শামসুর রহমান ১৯৭৩ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন এবং ১৯৯৮ সালে পোল্ট্রি খামার শুরু করেন। ২০২০ সাল পর্যন্ত তার খামার লাভজনক ছিল। কিন্তু করোনা পরিস্থিতি ও বাজার ধসের কারণে তিনি আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেননি। এরপরও এনজিওর আশ্বাসে ঋণের পুরো টাকা পরিশোধ করেন বলে দাবি করেন।

ব্র্যাক মাইক্রোফাইন্যান্স (প্রগতি) কালাই শাখার বর্তমান ব্যবস্থাপক মো.বেলাল হোসেন বলেন,মামলা প্রত্যাহারের বিষয়ে পূর্বে কী আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল, সে বিষয়ে আমার জানা নেই। আমি নতুন যোগদান করেছি। বিষয়টি এখন আদালতের অধীনে রয়েছে। আদালতই এর সমাধান করবেন।

আসামি পক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট লক্ষণ শীল বলেন,ঋণ পরিশোধের কাগজপত্র আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ঋণের বিপরীতে করা চেক ডিজঅনার মামলাটি এখনো প্রত্যাহার করা হয়নি। ঋণের টাকা পরিশোধের পরও মামলা চালিয়ে যাওয়া আসামিকে হয়রানি করার শামিল।

এ বিষয়ে কালাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামীম আরা বলেন, খামারি যদি ঋণের টাকা পরিশোধ করে থাকেন, তাহলে মামলা প্রত্যাহার হবে না কেন, সেটি অবশ্যই প্রশ্নের বিষয়। বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।