‎সিএমপির মালখানায় জমা হয়নি এক লাখ ইয়াবা : ‎তদন্তে ওসির নির্দেশে আসামি ছাড়ার অভিযোগ, গায়েব আড়াই কোটি টাকার মাদক

প্রকাশিত: ১৬ জুন ২০২৬, ০৭:৫০ পিএম
‎সিএমপির মালখানায় জমা হয়নি এক লাখ ইয়াবা :  ‎তদন্তে ওসির নির্দেশে আসামি ছাড়ার অভিযোগ, গায়েব আড়াই কোটি টাকার মাদক

মোহাম্মদ ইব্রাহিম, ‎ চট্টগ্রাম  প্রতিনিধি:

‎চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের (সিএমপি) অভ্যন্তরীণ তদন্তে উঠে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। কক্সবাজার থেকে ঢাকায় পাচারের উদ্দেশ্যে নেওয়া এক লাখ পিস ইয়াবা উদ্ধারের পর তা সরকারি মালখানায় জমা না দিয়ে আত্মসাতের অভিযোগ পাওয়া গেছে পুলিশের একাধিক সদস্যের বিরুদ্ধে। একই সঙ্গে ইয়াবাসহ আটক এক পুলিশ কনস্টেবলকে মামলা ছাড়াই ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগও তদন্তে প্রাথমিকভাবে সত্য বলে প্রতীয়মান হয়েছে।

‎ঘটনার প্রায় ছয় মাস পার হলেও এখনো হয়নি নিয়মিত মামলা, উদ্ধার হয়নি আনুমানিক আড়াই কোটি টাকা মূল্যের ইয়াবা।

‎সিএমপির উচ্চপর্যায়ের একটি তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছরের ৮ ডিসেম্বর কক্সবাজার থেকে ঢাকাগামী ‘দেশ ট্রাভেলস’-এর একটি বাসে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা বহন করা হচ্ছিল। চট্টগ্রাম নগরের বাকলিয়া এলাকায় শাহ আমানত সেতুর তল্লাশিচৌকিতে বাসটি থামিয়ে তল্লাশি চালান দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা।

‎তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, তল্লাশির সময় এক যাত্রীর লাগেজে ইয়াবা পাওয়া যায়। পরে ওই ব্যক্তির পরিচয় নিশ্চিত হয়ে জানা যায়, তিনি কক্সবাজার জেলা আদালতে কর্মরত এক বিচারকের গানম্যান কনস্টেবল ইমতিয়াজ হোসেন। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি ইয়াবার চালান বহনের কথা স্বীকার করেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

১০ প্যাকেটে এক লাখ ইয়াবা

‎তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, পুলিশ বক্সে নিয়ে লাগেজ তল্লাশি করলে ১০টি প্যাকেটে ১০ হাজার করে মোট এক লাখ পিস ইয়াবা পাওয়া যায়। যার আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় আড়াই কোটি টাকা।

‎তবে আইন অনুযায়ী জব্দ তালিকা প্রস্তুত, মামলা রুজু কিংবা মাদকদ্রব্য মালখানায় জমা দেওয়ার পরিবর্তে ঘটনাটি ভিন্ন দিকে মোড় নেয়। তদন্তে উঠে এসেছে, ইয়াবাগুলো নিজেদের হেফাজতে রেখে কনস্টেবল ইমতিয়াজকে কোনো আইনি ব্যবস্থা ছাড়াই ছেড়ে দেওয়া হয়। পরে তিনি ব্যক্তিগত মালামাল নিয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন।

ওসির নির্দেশে পুরো প্রক্রিয়া

‎তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশে বলা হয়েছে, তৎকালীন বাকলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আফতাব উদ্দিন শেখের নির্দেশেই পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয়। অথচ মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন অনুযায়ী এ ঘটনায় মামলা করা ছিল বাধ্যতামূলক।

‎প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ঘটনাটি আড়াল করতে সংশ্লিষ্ট সিসিটিভি ফুটেজ সংরক্ষণ করা হয়নি। পাশাপাশি কয়েকজন কর্মকর্তা তথ্য গোপনেরও চেষ্টা করেছেন বলে তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে।

ভাইরাল অডিও থেকে তদন্ত

‎ঘটনাটি দীর্ঘদিন প্রকাশ্যে না এলেও সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি অডিও কল রেকর্ড ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে ইয়াবাসহ আটক ব্যক্তির কথোপকথন সামনে আসার পর সিএমপি প্রশাসন তদন্ত কমিটি গঠন করে।

‎অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মো. ওয়াহিদুল হক চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত কমিটি তদন্ত শেষে গত ২৯ এপ্রিল পুলিশ সদর দপ্তরে প্রতিবেদন জমা দেয়।

বরখাস্ত ৯ পুলিশ সদস্য

‎তদন্তে প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার পর কনস্টেবল ইমতিয়াজ হোসেনসহ এসআই, এএসআই ও কনস্টেবল পদমর্যাদার আট সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। পরে গত ৯ জুন তৎকালীন পরিদর্শক (তদন্ত) তানভীর আহমেদকেও সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।

‎তবে তদন্ত প্রতিবেদনে মূল নির্দেশদাতা হিসেবে নাম আসলেও ওসি আফতাব উদ্দিন শেখের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বর্তমানে তিনি নগরের কোতোয়ালি থানার ওসির দায়িত্ব পালন করছেন।

‎অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে আফতাব উদ্দিন শেখ বলেন, “ইয়াবার বিষয়ে আমি কিছু জানি না। আমি আত্মসাৎ করিনি। ঘটনার সময় আমি বাসায় ছিলাম।

প্রশ্নের মুখে জবাবদিহি

‎আইনজীবী ও অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, উদ্ধার হওয়া এক লাখ ইয়াবা কোথায় গেল, কেন মামলা হয়নি এবং কারা এর সুবিধাভোগী এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত ঘটনাটির পূর্ণ সত্য উদ্‌ঘাটিত হবে না।

‎তদন্ত কমিটি জড়িতদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে। তবে আড়াই কোটি টাকার ইয়াবা গায়েব হওয়ার ঘটনায় এখনো কোনো নিয়মিত মামলা না হওয়ায় সিএমপির জবাবদিহি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।