‎অশ্রু, ভালোবাসা আর জনতার ঢলে শেষ বিদায় চট্টগ্রাম কাঁদালো ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনকে

প্রকাশিত: ১৪ মে ২০২৬, ০৪:১৩ পিএম
‎অশ্রু, ভালোবাসা আর জনতার ঢলে শেষ বিদায় চট্টগ্রাম কাঁদালো ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনকে

‎মোহাম্মদ ইব্রাহিম, চট্টগ্রাম প্রতিনিধি:

চট্টগ্রামের প্রবীণ রাজনীতিবিদ, সাবেক গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী, আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের জানাজা বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম নগরের জমিয়াতুল ফালাহ জাতীয় মসজিদ প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয়েছে।

বেলা ১১টায় অনুষ্ঠিত জানাজায় অংশ নেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ, রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, মুক্তিযোদ্ধা, জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বসহ হাজারো সাধারণ মানুষ।

‎জানাজাকে কেন্দ্র করে পুরো এলাকায় কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। সকাল থেকেই জমিয়াতুল ফালাহ এলাকায় মানুষের ভিড় বাড়তে থাকে। মরহুমের মরদেহ সেখানে আনা হলে শোকাবহ পরিবেশের সৃষ্টি হয়। জানাজা শেষে তাঁর আত্মার মাগফিরাত কামনা করে বিশেষ দোয়া ও মোনাজাত করা হয়। পরে মরদেহ নেওয়া হয় তাঁর গ্রামের বাড়ি মিরসরাইয়ের উদ্দেশে। এ সময় উপস্থিত কিছু লোকজন ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেন।

‎জানাজায় উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ও বিএনপি নেতা শাহাদাত হোসেন। তিনি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, বিএনপি এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে গভীর শোক প্রকাশ করেন। সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে তিনি বলেন,

‎“ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন ছিলেন বৃহত্তর চট্টগ্রামের উন্নয়নের একজন গুরুত্বপূর্ণ কারিগর। তাঁর অবদান মানুষ দীর্ঘদিন শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে।

‎এ ছাড়া বক্তব্য দেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী, সিপিবির সাবেক সভাপতি শাহ আলম এবং চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ আতাউর রহমান। বক্তারা মহান মুক্তিযুদ্ধে তাঁর সাহসী ভূমিকা, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এবং চট্টগ্রামের উন্নয়নে তাঁর অবদানের কথা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন।

পরিবারের পক্ষ থেকে মরহুমের বড় ছেলে সাবেদুর রহমান আবেগঘন কণ্ঠে সবার কাছে তাঁর পিতার জন্য দোয়া কামনা করেন। তিনি বলেন,

‎“আজ আমাদের পরিবারের জন্য অত্যন্ত কষ্টের দিন। বাবা দীর্ঘদিন হাসপাতালে ছিলেন। তাঁকে বাঁচানোর অনেক চেষ্টা করেছি, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। তাঁর জন্য সবাই দোয়া করবেন। 

‎বুধবার সকাল ১০টায় রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর। দীর্ঘদিন ধরে তিনি শ্বাসতন্ত্রের জটিলতাসহ নানা শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন।

মুক্তিযুদ্ধ থেকে জাতীয় রাজনীতির শীর্ষে

‎ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন ছিলেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, রাজনীতি ও উন্নয়ন ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ নাম। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি চট্টগ্রাম অঞ্চলে স্বাধীনতার পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করা, স্থানীয় প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং স্বাধীনতার পক্ষে জনমত তৈরিতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

‎মুক্তিযুদ্ধের চেতনা তাঁর রাজনৈতিক জীবনের মূল ভিত্তি ছিল। যুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশ গঠনের স্বপ্ন নিয়েই তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় হন। প্রকৌশলবিদ্যায় শিক্ষিত এই নেতা ধীরে ধীরে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেন এবং পরবর্তীতে দলটির সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

‎চট্টগ্রাম-১ (মিরসরাই) আসন থেকে একাধিকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে তিনি জাতীয় রাজনীতিতে নিজের শক্ত অবস্থান গড়ে তোলেন। রাজনৈতিক অঙ্গনে তিনি ছিলেন শান্ত, মার্জিত ও অভিজ্ঞ নেতৃত্বের প্রতীক।

চট্টগ্রামের উন্নয়নে এক নিবেদিত প্রাণ

‎ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের নাম উচ্চারণ হলেই উঠে আসে চট্টগ্রামের উন্নয়নের প্রসঙ্গ। বিশেষ করে মিরসরাই ও বৃহত্তর চট্টগ্রামের অবকাঠামোগত উন্নয়নে তাঁর অবদান স্থানীয় মানুষের কাছে আজও স্মরণীয়।

‎সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, গ্রামীণ অবকাঠামো নির্মাণ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সম্প্রসারণ, বিদ্যুৎ সুবিধা বৃদ্ধি এবং আবাসন খাতের উন্নয়নে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

‎চট্টগ্রামে শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির বিষয়েও তিনি ছিলেন অত্যন্ত দূরদর্শী। মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চল বাস্তবায়নের পেছনে তাঁর রাজনৈতিক সমর্থন ও উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। আজ যে মিরসরাই ধীরে ধীরে দেশের অন্যতম শিল্পাঞ্চলে পরিণত হচ্ছে, তার পেছনে এই প্রবীণ নেতার দীর্ঘ পরিকল্পনা ও প্রচেষ্টা ছিল বলে মনে করেন স্থানীয়রা।

‎গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নেও তিনি ভূমিকা রাখেন। উন্নয়নকে তিনি কেবল প্রকল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি; মানুষের জীবনমান উন্নয়নের মাধ্যম হিসেবেই দেখতেন।

মানুষের হৃদয়ে থেকে যাবে যে নাম

‎রাজনীতির কঠিন বাস্তবতার মাঝেও ব্যক্তি মোশাররফ হোসেন ছিলেন সহজপ্রাপ্য ও মানবিক। নেতা-কর্মীদের বিপদে পাশে দাঁড়ানো, সাধারণ মানুষের খোঁজখবর নেওয়া এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত থাকার কারণে তৃণমূল পর্যায়ে তাঁর জনপ্রিয়তা ছিল ব্যাপক।

‎রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও ব্যক্তি হিসেবে তিনি ছিলেন অনেকের শ্রদ্ধার পাত্র। তাঁর মৃত্যুতে শুধু একটি রাজনৈতিক অঙ্গন নয়, পুরো চট্টগ্রাম যেন হারিয়েছে অভিজ্ঞ ও প্রভাবশালী এক অভিভাবককে।

‎মুক্তিযুদ্ধ, রাজনীতি, উন্নয়ন এবং জনমানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার যে অধ্যায় তিনি রেখে গেছেন, তা দীর্ঘদিন স্মরণ করবে চট্টগ্রামবাসী।