কোটি টাকা খরচেও চট্টগ্রামে কমেনি মশার উপদ্রব

প্রকাশিত: ২০ আগস্ট ২০২৬, ১২:৫৮ পিএম
কোটি টাকা খরচেও চট্টগ্রামে কমেনি মশার উপদ্রব

সূত্রঃ সংগৃহীত

চট্টগ্রাম প্রতিনিধি



চট্টগ্রাম নগরীতে মশক নিধনে কোটি কোটি টাকা ব্যয় হলেও কমছে না মশার উপদ্রব। বরং বর্ষা মৌসুমে এডিস মশার বিস্তার বাড়ার পাশাপাশি ঊর্ধ্বমুখী হচ্ছে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক জরিপেও নগরীর বিভিন্ন এলাকায় এডিস মশার লার্ভার ঘনত্ব উদ্বেগজনক মাত্রায় পাওয়ার তথ্য উঠে এসেছে।


আজ ২০ আগস্ট বিশ্ব মশা দিবস। মশাবাহিত রোগ সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়ানো এবং এসব রোগ প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপের গুরুত্ব তুলে ধরতে প্রতিবছর দিবসটি পালিত হয়।


চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৯ আগস্ট পর্যন্ত জেলায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ৪৯৭ জন। এ সময়ে মারা গেছেন তিনজন। শুধু জুলাই মাসেই আক্রান্ত হয়েছেন ৫৩৬ জন। আর আগস্টের প্রথম ১৯ দিনে নতুন করে ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে ৬৬৩ জনের। বর্তমানে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন হাসপাতালে ১৬৩ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন।


চট্টগ্রামে সাধারণত জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি থাকে। গত কয়েক বছরের পরিসংখ্যানেও এর প্রতিফলন দেখা যায়। ২০২২ সালের জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৬৪০ জন। ২০২৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১২ হাজার ৩ জনে। ২০২৪ সালে আক্রান্ত হন ২ হাজার ৭৩৭ জন এবং ২০২৫ সালে ৩ হাজার ৬০ জন।


চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে জানুয়ারিতে ৬৮, ফেব্রুয়ারিতে ২২, মার্চে ২০, এপ্রিলে ২৯, মে মাসে ৩৭ এবং জুনে ১২২ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন। এরপর জুলাইয়ে আক্রান্তের সংখ্যা এক লাফে বেড়ে ৫৩৬ জনে দাঁড়ায়। ওই মাসে ডেঙ্গুতে মারা যান দুজন।


চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, জুলাই ও আগস্টের প্রথম দিকের আক্রান্তের সংখ্যা আগের ছয় মাসের মোট আক্রান্তের প্রায় দ্বিগুণ। বর্ষাকালে থেমে থেমে বৃষ্টির কারণে এডিস মশার প্রজননের উপযোগী পরিবেশ তৈরি হয়। বিভিন্ন উপজেলায় ডেঙ্গু শনাক্ত হলেও ৯৯ শতাংশের বেশি রোগী সুস্থ হয়ে উঠছেন। মারা যাওয়া তিনজনই হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে দেরি করেছিলেন।


জরিপে মিলেছে উদ্বেগজনক চিত্র


চট্টগ্রাম নগরীর ১৮টি ওয়ার্ডে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রাক্-বর্ষা জরিপে এডিস মশার লার্ভার ঘনত্ব আশঙ্কাজনক মাত্রায় পাওয়া গেছে।


৮ থেকে ১৮ জুন পর্যন্ত পরিচালিত জরিপে ৩৭০টি বাড়ি পরিদর্শন করা হয়। এর মধ্যে ৯৯টি বাড়িতে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া যায়। ৩৪৫টি পানির পাত্র পরীক্ষা করে ১১৪টিতেও লার্ভার উপস্থিতি শনাক্ত হয়।


জরিপে কনটেইনার ইনডেক্স পাওয়া গেছে ৩৩ দশমিক ০৪ শতাংশ, যেখানে নিরাপদ মাত্রা ১০ শতাংশের নিচে। হাউস ইনডেক্স ২৬ দশমিক ৭৬ শতাংশ, যার নিরাপদ মাত্রা ৫ শতাংশের নিচে। আর ব্রেটো ইনডেক্স পাওয়া গেছে ৩০ দশমিক ৮১ শতাংশ, যেখানে নিরাপদ মাত্রা ২০ শতাংশের নিচে।


জরিপে উত্তর কাট্টলী, পাঁচলাইশ, জালালাবাদ, পশ্চিম বাকলিয়া, দক্ষিণ বাকলিয়া, পাথরঘাটা, আন্দরকিল্লা ও দক্ষিণ হালিশহরকে উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।


বিভাগীয় কীটতত্ত্ববিদ মো. মফিজুল হক শাহ জানান, জরিপে পাওয়া লার্ভার ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই এডিস ইজিপ্টাই প্রজাতির। পানি সংকটের কারণে বাসাবাড়িতে জমিয়ে রাখা পানি এবং নির্মাণাধীন ভবনগুলোকে এডিস মশার অন্যতম প্রধান প্রজননস্থল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।


মশা নিধনে ব্যয় সাড়ে ৫ কোটি টাকা


ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়লেও মশক নিয়ন্ত্রণে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ব্যয়ও কম নয়। ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ১০ মাসে শুধু মশার ওষুধ ও যন্ত্রপাতি কেনায় প্রায় ৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয় করেছে চসিক। এর বাইরে ওষুধ ছিটানোর কাজে নিয়োজিত ৩৫৫ জন অপারেটরের বেতন বাবদ প্রতি মাসে প্রায় ৫০ লাখ টাকা ব্যয় হচ্ছে।


২০২৫-২৬ অর্থবছরে মশা নিয়ন্ত্রণে ৯ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর আগের অর্থবছর ২০২৪-২৫-এ এ খাতে ব্যয় হয়েছিল ৩ কোটি ৮০ লাখ টাকা। ২০০০ সাল থেকে চসিক মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে প্রায় ৪৬ কোটি ৯৬ লাখ টাকা ব্যয় করেছে। এর মধ্যে গত এক দশকেই ব্যয় হয়েছে প্রায় ২৫ কোটি টাকা।


তবে এত অর্থ ব্যয়ের পরও নগরীর চান্দগাঁও, মোহরা, বহদ্দারহাট, শুলকবহর, হামজারবাগ, জামালখান, চকবাজার ও হালিশহরসহ বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা মশার উপদ্রব কমেনি বলে অভিযোগ করছেন।


৭০ লাখ মানুষের জন্য ৩৫৫ কর্মী


চসিকের তথ্য অনুযায়ী, নগরীর ৪১টি ওয়ার্ডে মশা নিয়ন্ত্রণে কাজ করছেন ৩৫৫ জন কর্মী। সংস্থাটির দাবি, প্রতিটি ব্লকে ৭২ ঘণ্টা পরপর ওষুধ ছিটানোর ব্যবস্থা রয়েছে।


তবে নগরবাসীর অভিযোগ, অনেক এলাকায় নিয়মিত ওষুধ ছিটানো হয় না। কোথাও কোথাও দীর্ঘদিনেও মশার ওষুধ ছিটানোর কর্মীদের দেখা যায় না।


চসিকের প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা ইখতিয়ার উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী বলেন, প্রায় ৭০ লাখ মানুষের নগরীতে মাত্র সাড়ে তিনশ কর্মী দিয়ে সেবা দেওয়া কঠিন। তবুও সর্বোচ্চ চেষ্টা চালানো হচ্ছে।


তিনি বলেন, পূর্ণবয়স্ক মশা নিধনের চেয়ে লার্ভা ধ্বংস করা বেশি কার্যকর। তাই ফগার মেশিনে ধোঁয়া ছড়ানোর পাশাপাশি মশার লার্ভা ধ্বংসের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।


বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে নিয়ন্ত্রণের তাগিদ


বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু কীটনাশক ছিটিয়ে মশা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। কোন এলাকায় কোন প্রজাতির মশা রয়েছে, তাদের প্রজননস্থল কোথায় এবং কোন কীটনাশক কার্যকর—এসব বিষয় নিয়মিত পরীক্ষা ও গবেষণার মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হবে।


চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের প্রভাষক মো. আহসান হাবিব সিয়াম বলেন, চসিকের মশক নিধন কার্যক্রমে বড় ঘাটতি হলো কীটতত্ত্ববিদদের পর্যাপ্ত সম্পৃক্ততা না থাকা। বৈজ্ঞানিক দক্ষতা ছাড়া বড় বাজেট বরাদ্দ করেও কার্যকর ফল পাওয়া সম্ভব নয়।


নগর পরিকল্পনাবিদ মো. দেলোয়ার হোসেন মজুমদার বলেন, দীর্ঘদিন ধরে একই ধরনের কীটনাশক ব্যবহারের ফলে মশার মধ্যে এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়েছে। তাই কোন ওষুধে লার্ভা ও পূর্ণবয়স্ক মশা কার্যকরভাবে ধ্বংস হচ্ছে, তা নিয়মিত পরীক্ষাগারে যাচাই করা প্রয়োজন।


চসিকের মশক নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা মো. শরফুল ইসলাম মাহি জানান, ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিশেষ কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। চিহ্নিত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে ৬০ সদস্যের বিশেষ দল কাজ করছে। পাশাপাশি ছয় মাসের জন্য পর্যাপ্ত লার্ভিসাইড ও অ্যাডাল্টিসাইড মজুত রয়েছে।


বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু সিটি করপোরেশনের কার্যক্রমের ওপর নির্ভর করলে হবে না। বাড়ির ছাদ, বারান্দা, ফুলের টব, পরিত্যক্ত পাত্র ও নির্মাণাধীন ভবনসহ আশপাশে পানি জমতে না দেওয়া এবং জমে থাকা পানি দ্রুত অপসারণে নগরবাসীকেও দায়িত্বশীল হতে হবে। এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করাই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের অন্যতম কার্যকর উপায়।



এমকে/বিএম২৪