অভিজ্ঞতা ছাড়াই তমা মির্জার এভিপি নিয়োগ, প্রশ্নের মুখে এবি ব্যাংক
সূত্রঃ সংগৃহীত
নিজস্ব প্রতিবেদক
চিত্রনায়িকা তমা মির্জাকে অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট (এভিপি) পদে নিয়োগ দিয়েছে এবি ব্যাংক। ব্যাংকটির ব্র্যান্ড অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগে তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। তবে ব্যাংকিং খাতে পূর্বঅভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও সরাসরি এভিপি পদে নিয়োগ পাওয়ায় এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি বেসরকারি ব্যাংকে কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার কথা জানান তমা মির্জা। এরপর থেকেই তার নিয়োগ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য, আর্থিকভাবে সংকটে থাকা এবি ব্যাংকে অনেক কর্মকর্তার পদোন্নতি আটকে রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ব্যাংকিং খাতে অভিজ্ঞতা না থাকা একজনকে সরাসরি এভিপি পদে নিয়োগ দেওয়ার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ব্যাংকটির কয়েকজন কর্মকর্তা ও বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা।
তমা মির্জা মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি থেকে আইন বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন। নিজের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি প্রায় ১৬ বছর ধরে অভিনয় পেশার সঙ্গে যুক্ত। আইন বিষয়ে পড়াশোনা ও দীর্ঘ অভিনয়জীবনের অভিজ্ঞতা থাকলেও তাকে ব্যাংকের ব্র্যান্ড অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগে এভিপি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
এবি ব্যাংকের কয়েকজন নির্বাহী জানান, ব্যাংকের আর্থিক পরিস্থিতির কারণে বর্তমানে ব্র্যান্ড অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের বাজেটও সীমিত। এ অবস্থায় নতুন করে এ ধরনের নিয়োগের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ব্যাংকটির এক কর্মকর্তা বলেন, ‘ব্যাংকের অবস্থা ভালো নয়। আর্থিক দিক থেকে লাইফ সাপোর্টে আছে। এমন অবস্থায় একজন নায়িকাকে নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টি অনেক প্রশ্ন তৈরি করেছে। যেখানে বহু কর্মকর্তা পদোন্নতির অপেক্ষায় রয়েছেন, সেখানে সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে কোনো অভিজ্ঞতা না থাকা একজনকে সরাসরি এভিপি পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।’
ওই কর্মকর্তা আরও দাবি করেন, ব্যাংকের চেয়ারম্যান একজন মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীর সুপারিশে তমা মির্জাকে নিয়োগ দিয়েছেন বলে তারা জানতে পেরেছেন। তবে এ দাবির স্বাধীন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র, নির্বাহী পরিচালক ও এবি ব্যাংকের পর্যবেক্ষক আরিফ হোসাইন খান বলেন, তিনি তমা মির্জার নিয়োগের বিষয়ে আগে অবগত ছিলেন না। নিয়োগের যোগ্যতা ও প্রক্রিয়া সম্পর্কে ব্যাংকের কাছে জানতে চাওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
তার ভাষ্য, ব্যাংকের যেকোনো নিয়োগের তথ্য বোর্ডকে জানানোর সিদ্ধান্ত রয়েছে। কিন্তু তমা মির্জার নিয়োগের বিষয়ে বোর্ডকে কোনো তথ্য জানানো হয়নি। বিষয়টি পরবর্তী বোর্ড সভায় তোলা হবে বলেও জানান তিনি।
আরিফ হোসাইন খান বলেন, ব্যাংকের প্রতিটি পদের জন্য নির্দিষ্ট অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতা প্রয়োজন। সাধারণত ব্যাংকিং খাতে নিয়োগের ক্ষেত্রে অ্যাকাউন্টিং, ফাইন্যান্স ও ব্যবসায় শিক্ষার বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। তমা মির্জাকে কোন যোগ্যতা ও ক্যাটাগরিতে এভিপি পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে ব্যাংককে ব্যাখ্যা দিতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের আরেক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বিভিন্ন বেসরকারি ব্যাংকে এভিপি পদে সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রে সাধারণত ৮ থেকে ১০ বছরের অভিজ্ঞতা চাওয়া হয়। তাই তমা মির্জাকে কী যোগ্যতা ও প্রয়োজনের ভিত্তিতে এ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, সেটি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
এ বিষয়ে এবি ব্যাংকের সদ্য নিয়োগ পাওয়া ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরিফ বিল্লাহ আদিল চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। পরে খুদে বার্তা পাঠিয়ে নিয়োগের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলেও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
তমা মির্জার সঙ্গেও ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তাকে পাওয়া যায়নি। পরে হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠানো হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
আর্থিক সংকটে এবি ব্যাংক
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, আর্থিকভাবে দুর্বল অবস্থায় রয়েছে এবি ব্যাংক। ২০২৬ সালের মার্চ প্রান্তিক শেষে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ১৯ হাজার ৫০৭ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের প্রায় ৫৪ শতাংশ।
২০২৫ সালে ব্যাংকটি প্রায় ৩ হাজার ৮৮৯ কোটি টাকা নিট লোকসান করে। ওই বছরের প্রথম ছয় মাসেই লোকসানের পরিমাণ ছিল প্রায় ১ হাজার ৭৫৮ কোটি টাকা।
চলতি বছরেও ব্যাংকটির লোকসানের ধারা অব্যাহত রয়েছে। ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ছয় মাসে ব্যাংকটির শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) দাঁড়িয়েছে ঋণাত্মক ২১ দশমিক ৬২ টাকা। একই সময়ে সমন্বিত নিট সম্পদমূল্য (এনএভি) শেয়ারপ্রতি ঋণাত্মক ৫৭ দশমিক ৮৫ টাকায় নেমে এসেছে। ২০২৫ সালের জুনে এই সংখ্যা ছিল ঋণাত্মক ১২ দশমিক ৩৩ টাকা।
এ ছাড়া ২০২৫ সালের হিসাব অনুযায়ী, বিভিন্ন বিনিয়োগের বিপরীতে এবি ব্যাংকের প্রায় ৫৬৬ কোটি ৫১ লাখ টাকার প্রভিশন ঘাটতি ছিল। ব্যাংকটির ক্রেডিট রেটিংয়েও নেতিবাচক পূর্বাভাস রয়েছে।
এ অবস্থায় ব্যাংকটির আর্থিক সংকটের মধ্যে তমা মির্জাকে সরাসরি এভিপি পদে নিয়োগের বিষয়টি ব্যাংকিং খাতে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।









