মানবতাবিরোধী অপরাধে ৭ নেতার রায় যেকোনো দিন

প্রকাশিত: ১৭ আগস্ট ২০২৬, ০৩:৫৭ পিএম
মানবতাবিরোধী অপরাধে ৭ নেতার রায় যেকোনো দিন

সূত্রঃ ফাইল ছবি

নিজস্ব প্রতিবেদক



জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ সাত নেতার বিরুদ্ধে যুক্তিতর্ক শেষ হয়েছে। ফলে যেকোনো দিন এ মামলার রায় ঘোষণা করতে পারেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২।


সোমবার (১৭ আগস্ট) ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেলে রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের যুক্তি-পাল্টা যুক্তি উপস্থাপন শেষ হয়।


এদিন রাষ্ট্রপক্ষের পক্ষে প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম আইনগত যুক্তি তুলে ধরে বলেন, জুলাই আন্দোলন ঘিরে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন বৈঠকে আন্দোলনকারীদের দমনে হত্যা ও সহিংসতার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। মামলায় দাখিল করা অডিও-ভিডিওসহ বিভিন্ন তথ্য-উপাত্তে এর প্রমাণ রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। তার ভাষ্য, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের আন্দোলনকারীদের দেখামাত্র গুলির নির্দেশ দিয়েছিলেন। এর পরিণতিতে ৫ আগস্ট পর্যন্ত নির্বিচারে গুলি চালিয়ে বহু মানুষকে হত্যা করা হয়।


এর জবাবে ওবায়দুল কাদের, বাহাউদ্দিন নাছিম ও মোহাম্মদ আলী আরাফাতের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী এম হাসান ইমাম বলেন, জনগণের জানমাল রক্ষার উদ্দেশ্যেই গুলি চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তবে তার তিন মক্কেল কোনো কমান্ডিং অবস্থানে ছিলেন না। তারা কাউকে হত্যা করেননি এবং হত্যার নির্দেশও দেননি বলে দাবি করেন তিনি।


পরে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের সাবেক সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করেন আইনজীবী ইশরাত জাহান। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন দমনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নেতৃত্বদানকারীদের মধ্যে তার মক্কেল সাদ্দাম হোসেন, ওয়ালি আসিফ ইনান, শেখ ফজলে শামস পরশ ও মাইনুল হোসেন খান নিখিলের নাম নেই। তাদের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশন পর্যাপ্ত প্রমাণও উপস্থাপন করতে পারেনি বলে দাবি করেন তিনি।


নারীদের আহত হওয়ার বিষয়টি প্রসিকিউশনের বক্তব্যে বারবার এলেও এ মামলায় কোনো নারী সাক্ষী হাজির করা হয়নি বলেও উল্লেখ করেন ইশরাত জাহান। তার দাবি, সাক্ষ্যপ্রমাণেও এ ধরনের ঘটনার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি।


নিজের চার মক্কেলের খালাস দাবি করে তিনি বলেন, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের অংশ হিসেবে তারা কিছু বক্তব্য দিয়েছেন এবং ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য কিছু পদক্ষেপ নিয়েছেন। প্রসিকিউশনের উপস্থাপিত ভিডিওতেও তাদের হাতে লাঠিসোঁটা দেখা যায়নি। তাই তাদের বিরুদ্ধে অপরাধের প্রমাণ নেই বলে দাবি করেন তিনি।


আসামিপক্ষের যুক্তি শেষে প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম পাল্টা যুক্তি উপস্থাপন করেন। তিনি ‘জয়েন্ট ক্রিমিনাল এন্টারপ্রাইজ’-এর আইনি ব্যাখ্যা তুলে ধরে বলেন, আন্দোলন দমনের সময় একজন মানুষ নিহত হলেও সংশ্লিষ্ট আসামিদের অপরাধের দায় থেকে মুক্তি দেওয়ার সুযোগ নেই।


পরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন আইনজীবী এম হাসান ইমাম। তিনি জানান, মামলায় রাষ্ট্রপক্ষ মোট ২৯ জন সাক্ষী উপস্থাপন করেছে। তাদের মধ্যে ১৬ জন ছিলেন ফরমাল বা বিশেষজ্ঞ সাক্ষী এবং ১২ জন ছিলেন ভুক্তভোগীদের স্বজন। এসব সাক্ষীর কেউই ওবায়দুল কাদের, বাহাউদ্দিন নাছিম ও মোহাম্মদ আলী আরাফাতকে সরাসরি জড়িত করে সাক্ষ্য দেননি বলে দাবি করেন তিনি।


এর আগে গত ১২ আগস্ট সাত আসামির সর্বোচ্চ সাজা দাবি করে প্রসিকিউশনের যুক্তিতর্ক শেষ হয়। চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, আসামিদের বিরুদ্ধে আনা চারটি অভিযোগই রাষ্ট্রপক্ষ প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে। জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে মানুষ হত্যা ও আহত করার ঘটনায় তাদের দায় রয়েছে দাবি করে সাত আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি চান তিনি।


গত ৪ আগস্ট এ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তিতর্ক শুরু হয়। এরপর টানা পাঁচ কার্যদিবসে সাত আসামির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের পক্ষে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত ও আইনি যুক্তি উপস্থাপন করে প্রসিকিউশন।


মামলার সাত আসামি হলেন—আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন এবং সাধারণ সম্পাদক ওয়ালি আসিফ ইনান। তারা সবাই বর্তমানে পলাতক।


গত ২ আগস্ট মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়। তদন্ত কর্মকর্তাসহ রাষ্ট্রপক্ষে মোট ২৯ জন সাক্ষী সাক্ষ্য দেন।


এর আগে গত ২২ জানুয়ারি সাত আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল-২। গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর প্রসিকিউশনের দাখিল করা আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেন একই ট্রাইব্যুনাল।



এমকে/বিএম২৪