ঝুঁকিতে ১৫ ব্যাংক

প্রকাশিত: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৪৮ এএম
ঝুঁকিতে ১৫ ব্যাংক

সূত্রঃ ফাইল ছবি

নিজস্ব প্রতিবেদক


ব্যাংক খাতে অনিয়ম, ঋণ জালিয়াতি ও অর্থ পাচারের কারণে তৈরি সংকট ক্রমেই গভীর হচ্ছে। বিপুল পরিমাণ ঋণ আদায় না হওয়ায় খেলাপি ঋণ বেড়েছে আশঙ্কাজনক হারে। ফলে খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণের চাপও বাড়ছে। তবে আয় কমে যাওয়ায় অনেক ব্যাংক সেই প্রয়োজনীয় প্রভিশন রাখতে পারছে না।


বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন শেষে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে ১৫টি ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ২৯ হাজার ১৪৬ কোটি টাকা। ব্যাংক খাতের ইতিহাসে এত বড় প্রভিশন ঘাটতিকে আর্থিক দুর্বলতার বড় সংকেত হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।


রাষ্ট্রায়ত্ত পাঁচ ব্যাংকের মোট প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৭৮ হাজার ৩৩০ কোটি টাকা। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঘাটতি জনতা ব্যাংকের—৫০ হাজার ১৬০ কোটি টাকা। অগ্রণী ব্যাংকের ঘাটতি ১২ হাজার ৩৩৮ কোটি, রূপালী ব্যাংকের ১০ হাজার ৭৫৩ কোটি, বেসিক ব্যাংকের ৫ হাজার ৪৭ কোটি এবং বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের প্রায় ৩৩ কোটি টাকা।


অন্যদিকে, বেসরকারি ১০ ব্যাংকের সম্মিলিত প্রভিশন ঘাটতি ১ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। এর মধ্যে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের ঘাটতি সর্বোচ্চ, ৮২ হাজার ৩৩৪ কোটি টাকা। ন্যাশনাল ব্যাংকের ২৩ হাজার ৩২৬ কোটি, আইএফআইসি ব্যাংকের ২১ হাজার ৮৯৪ কোটি, প্রিমিয়ার ব্যাংকের ১১ হাজার ৯৭১ কোটি, ইউনিয়ন ব্যাংকের ৫ হাজার ৫ কোটি এবং স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের ২ হাজার ৫৯৫ কোটি টাকা ঘাটতি রয়েছে।


এ ছাড়া মার্কেন্টাইল ব্যাংকের ২ হাজার ৯৫ কোটি, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের ৬৪৫ কোটি, এনআরবিসি ব্যাংকের ৮২০ কোটি এবং এনআরবি ব্যাংকের ১৩০ কোটি টাকা প্রভিশন ঘাটতি রয়েছে।


বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের মতে, ব্যাংক খাতের বর্তমান সংকটের প্রধান কারণ খেলাপি ঋণের লাগামহীন বৃদ্ধি। তিনি মনে করেন, খেলাপি ঋণ না থাকলে প্রভিশন ঘাটতিরও প্রয়োজন হতো না। খেলাপিদের বারবার নীতিগত ছাড় দেওয়া এবং প্রভিশন ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও লভ্যাংশ দেওয়ার সুযোগ ব্যাংকিং খাতে নেতিবাচক বার্তা তৈরি করছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।


তার মতে, এ ধরনের নীতির ফলে আমানতকারীদের অর্থ ঝুঁকিতে পড়ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ক্ষতিকর নীতিগত সুবিধা বন্ধ করার পাশাপাশি ঋণ আদায় বাড়ানো ও খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।


বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাবে, জুন শেষে দেশের ব্যাংক খাতে মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ৫০ হাজার ৫৯৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণ ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। অর্থাৎ ব্যাংকগুলোর দেওয়া প্রতি ১০০ টাকা ঋণের মধ্যে প্রায় ৩৩ টাকা খেলাপি হয়ে পড়েছে। এর বড় একটি অংশ আদায় করা কঠিন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।


গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড পিস স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক ও মানারত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড. মো. মিজানুর রহমান বলেন, রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে এক শ্রেণির প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ঋণ নিয়ে দীর্ঘদিন তা পরিশোধ করছেন না। একই সঙ্গে খেলাপিদের বিভিন্ন সুযোগ দেওয়ার কারণে ঋণ পরিশোধে অনীহা বাড়ছে।


তার মতে, অনিয়ম ও খেলাপি ঋণের অস্বাভাবিক বৃদ্ধিই ব্যাংকগুলোর বর্তমান দুর্বল অবস্থার অন্যতম কারণ। আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষায় বড় খেলাপিদের প্রতি ছাড়ের নীতি বন্ধ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।


আমানতকারীদের অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ঋণের মান অনুযায়ী ব্যাংকগুলোকে নির্দিষ্ট হারে প্রভিশন রাখতে হয়। সাধারণ ঋণের ক্ষেত্রে দশমিক ৫ থেকে ৫ শতাংশ, নিম্নমানের খেলাপি ঋণে ২০ শতাংশ, সন্দেহজনক ঋণে ৫০ শতাংশ এবং মন্দ বা লোকসানি ঋণের বিপরীতে শতভাগ প্রভিশন সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক।


প্রভিশন ঘাটতি থাকলে ব্যাংকের লভ্যাংশ দেওয়ার সক্ষমতা সীমিত হয়ে যায়। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণ করতে না পারলে মূলধন ঘাটতির ঝুঁকি বাড়ে এবং ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। বিশ্লেষকদের মতে, ব্যাংক খাতের এ সংকট কাটাতে খেলাপি ঋণ কমানো এবং ঋণ আদায়ের হার বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই।


এমকে/বিডিমেইল২৪