জ্বালানি স্বনির্ভরতা নাকি আমদানিনির্ভরতা, কোন পথে এগোচ্ছে বাংলাদেশ
সূত্রঃ সংগৃহীত
নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট নতুন কোনো বিষয় নয়। প্রায় দুই দশক আগে থেকেই দেশের প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত কমে আসার বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছিল। ২০০২ সালেই ধারণা করা হয়েছিল, ২০৩০–৩১ সালের দিকে দেশীয় গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের সংকট দেখা দিতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদি অনুসন্ধান ও দেশীয় জ্বালানি উন্নয়নের পাশাপাশি নবায়নযোগ্য শক্তিতে প্রত্যাশিত বিনিয়োগ না বাড়ায় সময়ের সঙ্গে জ্বালানি খাতে আমদানিনির্ভরতা আরও বেড়েছে।
একসময় বাংলাদেশকে প্রধানত পেট্রোলিয়ামজাত জ্বালানি আমদানি করতে হলেও বর্তমানে কয়লা, এলএনজি ও জ্বালানি তেলসহ প্রায় সব ধরনের জ্বালানির ক্ষেত্রেই বিদেশের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দেশে বছরে প্রায় ২০ মিলিয়ন টন কয়লা আমদানি হয়, যার পেছনে ব্যয় হয় ১ দশমিক ১৯ থেকে ১ দশমিক ৩০ বিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে এলএনজি আমদানিতে বছরে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার। ২০২৯–৩০ সালের মধ্যে এই ব্যয় ৮ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।
এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে—বাংলাদেশ কি জ্বালানি স্বনির্ভরতা ও নিরাপত্তার দিকে এগোচ্ছে, নাকি আমদানিনির্ভরতার ঝুঁকি আরও বাড়ছে?
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও আইইউবির উপাচার্য অধ্যাপক এম তামিমের মতে, বিদ্যমান গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন বাড়াতেই দুই থেকে পাঁচ বছর সময় লাগতে পারে। নতুন গ্যাস অনুসন্ধানে সময় লাগবে আরও বেশি। তাই দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি এলএনজি আমদানি, স্থল ও সমুদ্রভিত্তিক গ্যাস অনুসন্ধান এবং সৌরবিদ্যুৎকে সমন্বিত পরিকল্পনার আওতায় আনা প্রয়োজন।
তিনি ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় ৩ হাজার মেগাওয়াট নতুন সৌরবিদ্যুৎ এবং আরও ২ হাজার মেগাওয়াট ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করেছেন।
তবে আমদানিনির্ভরতার ঝুঁকি শুধু বাড়তি ব্যয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্য ওঠানামা, যুদ্ধ ও ভূরাজনৈতিক অস্থিরতাও সরাসরি প্রভাব ফেলে। চলতি বছরের জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশকে স্পট মার্কেট থেকে ১১টি এলএনজি কার্গো কিনতে হয়েছে। প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিটে গড়ে ২১ দশমিক ৩৫ ডলার দরে কেনা এসব এলএনজির জন্য ব্যয় হয়েছে প্রায় ৮৮০ মিলিয়ন ডলার।
ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিনান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের বাংলাদেশ বিশ্লেষক ড. শফিকুল আলম মনে করেন, আমদানি করা জ্বালানির দামের অস্থিরতা থেকে বাংলাদেশকে সুরক্ষা দিতে হবে। এজন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা থেকেও শিক্ষা নেওয়া প্রয়োজন।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের গবেষণা পরিচালক ড. খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের মতে, আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দেশের অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। তাঁর পরামর্শ, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান দ্রুত করা, আবিষ্কৃত গ্যাস দ্রুত জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা এবং দীর্ঘমেয়াদে এলএনজি-নির্ভর অবকাঠামো বাড়ানোর পরিবর্তে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বেশি গুরুত্ব দেওয়া।
তিনি ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ হাজার মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়নের ওপরও জোর দিয়েছেন।
নবায়নযোগ্য জ্বালানির ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের অগ্রগতি প্রত্যাশার তুলনায় ধীর। বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২০ সালে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাত্র ২ দশমিক ৫ শতাংশ এসেছিল নবায়নযোগ্য উৎস থেকে। যদিও তখন লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১০ শতাংশের বেশি।
অন্যদিকে ২০২৬ সালে আমদানিকৃত গ্যাস, কয়লা এবং প্রতিবেশী দেশ থেকে আমদানি করা কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎসহ আমদানিনির্ভর উৎস থেকে দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহের অংশ বেড়ে প্রায় ৬০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ২০২১ সালে এই হার ছিল প্রায় ৪২ শতাংশ।
ফলে বাংলাদেশের সামনে এখন জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। জ্বালানি স্বনির্ভরতা মানেই দেশের মাটির নিচের সম্পদের ওপর পুরোপুরি নির্ভর করা নয়। বরং দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, সৌর ও বায়ুশক্তির সম্প্রসারণ, জ্বালানি দক্ষতা বাড়ানো, বিদ্যুৎ সাশ্রয় এবং আমদানির ঝুঁকি কমানোর মতো উদ্যোগ একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়াই হতে পারে বাস্তবসম্মত কৌশল।
শুধু এলএনজি টার্মিনাল বাড়িয়ে যেমন দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়, তেমনি কেবল দেশীয় গ্যাসের ওপর নির্ভর করাও টেকসই সমাধান নয়। তাই বাংলাদেশের জন্য এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো—আমদানির সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি এমন একটি ভারসাম্যপূর্ণ জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে আমদানি প্রয়োজন হলেও দেশের ভবিষ্যৎ পুরোপুরি এর ওপর নির্ভরশীল হয়ে না পড়ে।
এমকে/বিএম২৪








