‘নামাজ পড়লে নয়, না পড়লে ১০ নম্বর কাটার কথা বলতে চেয়েছিলেন শিক্ষক’
ছবি: সংগৃহীত
বাগেরহাট প্রতিনিধি
বাগেরহাটের ফকিরহাট উপজেলার শিরিন হক পাইলট মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সমর কৃষ্ণ রায়ের ‘নামাজ পড়লে ১০ নম্বর কেটে নেওয়া হবে’—এমন বক্তব্যের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। তবে প্রধান শিক্ষক, বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের দাবি, তিনি মূলত নামাজ না পড়লে পরীক্ষায় ১০ নম্বর কেটে নেওয়ার কথা বলতে চেয়েছিলেন। বক্তব্য দেওয়ার সময় অসাবধানতাবশত ‘না’ শব্দটি বাদ পড়ে যায় বলে স্বীকার করেছেন প্রধান শিক্ষক।
রোববার (১১ অক্টোবর) এ ঘটনা নিয়ে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল করে। তারা বক্তব্যের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিয়ে সঠিক তথ্য প্রকাশের দাবি জানায়।
বিদ্যালয়ের শিক্ষক সেলিম বলেন, প্রধান শিক্ষক সমর কৃষ্ণ রায় বিদ্যালয়ে যোগদানের পর থেকে মুসলিম ছাত্রীদের ধর্মীয় অনুশাসন পালনে উৎসাহ দিয়ে আসছেন। ছাত্রীদের নামাজ আদায়ের জন্য আলাদা কক্ষের ব্যবস্থা এবং জায়নামাজ কেনার উদ্যোগও নিয়েছেন তিনি। তাঁর দাবি, প্রধান শিক্ষকের বক্তব্যের একটি অংশ প্রচার হওয়ায় বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।
বিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থীও একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছে। শিক্ষার্থী নীলা, নবম শ্রেণির তাবাসসুম ও আয়েশা তাহাসিন পুথির দাবি, প্রধান শিক্ষক তাঁদের নামাজ পড়তে উৎসাহ দেন এবং নামাজের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন। তাঁদের মতে, ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে বক্তব্যের সম্পূর্ণ প্রেক্ষাপট উঠে আসেনি।
বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষিকা শারমিন খাতুন বলেন, প্রধান শিক্ষক ধর্মীয় বিষয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ করেন না। ঈদে মিলাদুন্নবীর অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি ছাত্রীদের নিয়মিত নামাজ পড়ার বিষয়ে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। নামাজ না পড়লে পরীক্ষায় ১০ নম্বর কম দেওয়ার কথা বলার সময় বক্তব্যে ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয়েছে বলে তাঁর ধারণা।
বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আব্দুল্লাহ সিদ্দিকীও দাবি করেন, প্রধান শিক্ষক মুসলিম ছাত্রীদের নামাজ আদায়ের জন্য আলাদা কক্ষের ব্যবস্থা করেছেন। তাঁর মতে, বক্তব্যের অংশবিশেষ প্রচার হওয়ায় ঘটনাটি নিয়ে ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয়েছে।
ভুল স্বীকার করে দুঃখ প্রকাশ প্রধান শিক্ষকের
প্রধান শিক্ষক সমর কৃষ্ণ রায় বলেন, মুসলিম ছাত্রীদের নামাজ আদায়ের জন্য তিনি আলাদা কক্ষের ব্যবস্থা করেছেন এবং জায়নামাজ কিনেছেন। তাঁর ভাষ্য, নামাজ না পড়লে পরীক্ষায় ১০ নম্বর কেটে নেওয়ার কথা বলতে গিয়ে অসাবধানতাবশত ‘না’ শব্দটি বাদ পড়ে যায়।
তিনি বলেন, ‘এ অনাকাঙ্ক্ষিত ভুলের জন্য আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত। কাউকে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার উদ্দেশ্য আমার ছিল না।’
পুরোনো খাতা ও নোট বিক্রির অর্থ নিয়ে ওঠা প্রশ্নের বিষয়ে প্রধান শিক্ষক বলেন, বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির অনুমোদন নিয়ে পুরোনো খাতা ও নোট বিক্রি করে পাওয়া ১০ হাজার ৫০০ টাকা ঈদে মিলাদুন্নবীর অনুষ্ঠানে ব্যয় করা হয়েছে। শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের কাছ থেকেও অর্থ সংগ্রহ করা হয় এবং বিদ্যালয়ের সভাপতি আর্থিক সহযোগিতা করেন। তাঁর দাবি, অনুষ্ঠানে মোট প্রায় ৪৬ হাজার ৭০০ টাকা ব্যয় হয়েছে।
এ বিষয়ে ফকিরহাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রোকনুজ জামান বলেন, মানুষ মাত্রই ভুল করতে পারে। কোনো ঘটনা নিয়ে সংবাদ প্রকাশের আগে তথ্য যাচাই করে সত্য তুলে ধরা জরুরি।
তিনি বলেন, পুরো বক্তব্যটি দেখে তাঁর কাছে মনে হয়েছে, প্রধান শিক্ষক অসাবধানতাবশত কথাটি বলেছেন। পরে তিনি নিজের ভুল বুঝতে পেরে ক্ষমা চেয়েছেন বলেও উল্লেখ করেন ইউএনও। বিষয়টি যাচাই-বাছাই করে সংবাদ প্রকাশের জন্য সাংবাদিকদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
ঘটনাটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনা চলছে। সংশ্লিষ্ট শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা ভিডিওর সম্পূর্ণ প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে প্রতিবেদন প্রকাশের আহ্বান জানিয়েছেন।








