একটু সময় দাও, এটাকে অবহেলা ভেবো না
সূত্রঃ ফাইল ছবি
ওমায়ের আহমেদ শাওন
দশ-বারো বছর— ক্যালেন্ডারের পাতায় হয়তো কয়েকটি সংখ্যা মাত্র। কিন্তু মানুষের জীবনে এই সময়টা কখনো কখনো একটি সম্পূর্ণ যুগ। এই দীর্ঘ সময়ে কত ঋতু বদলে যায়, কত মানুষ আসে-যায়, কত সম্পর্কের জন্ম হয়, কত সম্পর্ক নিঃশব্দে মৃত্যুবরণ করে। অথচ কিছু আকাঙ্ক্ষা থেকে যায়- একই রকম তীব্র, একই রকম অনিবার্য।
তোমাকে পাওয়ার সেই আকাঙ্ক্ষাটাও তেমনই ছিল।
তুমি জানো কি না জানিনা, কিন্তু তোমাকে ভালোবাসা আমার কোনো হঠাৎ সিদ্ধান্ত ছিল না। তোমার প্রতি তীব্র কামনাতেই একসময় ভালোবাসা বুঝেছিলাম- আমি আর নিজের ইচ্ছের কাছে স্বাধীন নই। তোমাকে চাওয়া তখন আর কোনো সাধারণ চাওয়া ছিলো না; সেটা ধীরে ধীরে আমার জীবনের অভ্যাস হয়ে উঠেছিলো, অপেক্ষা হয়ে উঠেছিলো, কখনো প্রার্থনা হয়ে উঠেছিলো।
আর তুমি ?
তুমি কখনো কাছে এসেছো, আবার কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই দূরে সরে গেছো। কখনো মনে হয়েছে, তুমি বুঝি সত্যিই আমাকে চাও; আবার হঠাৎ করেই যোগাযোগের সব দরজা বন্ধ করে দিয়েছো। তারপর দীর্ঘ নীরবতার পর কোনো এক অপ্রত্যাশিত সময়ে আবার ফিরে এসেছো- যেন কিছুই ঘটেনি।
তোমার এই আসা-যাওয়ার রহস্যের জট আমি আজও খুলতে পারিনি।
কখনো ভেবেছি, হয়তো দ্বিধায় ছিলে। কখনো মনে হয়েছে, হয়তো তোমারও অনুভূতি ছিল, কিন্তু সাহস ছিলো না। আবার কখনো নিজেকেই বোঝানোর চেষ্টা করেছি- হয়তো তোমার কাছে যতটা নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ ভেবেছি, আসলে ততটা ছিলাম না।
কিন্তু এত বছর পরও একটা প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাইনি !
তুমি যদি আমাকে নাইবা চাও, তবে বারবার ফিরে আসো কেন ?
হয়তো এই প্রশ্নের উত্তর তোমার কাছেও নেই।
সময় আমাদের দুজনকেই বদলে দিয়েছে। যে বয়সে তোমাকে চেয়েছিলাম, তখন জীবন ছিলো অনেক সরল। অপার সুযোগ ছিলো। কিছু স্বপ্ন ছিলো, কিছু সাহস ছিলো। তখন অর্থেরওM কমতি ছিলো না।
মানুষের জীবন সবসময় একরকম নাও চলতে পারে। বাস্তবতার চাপে আজ বুঝি, জীবন এত সহজ নয়।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের চারপাশে দায়িত্ব জমে। বাস্তবতা এসে স্বপ্নের দরজায় কড়া নাড়ে। পরিবার, দেশ-সমাজ, অর্থনৈতিক চাপ, ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা- সবকিছু মিলে জীবনের সমীকরণ কঠিন হয়ে যায়।,
আজ তুমি এসে বলছো- "এই ভালোবাসাকে একটা বৈধতা দাও। সারাজীবনের জন্য আপন করে নাও।"
তুমি তাড়া দিচ্ছো।
তোমার তাড়াহুড়োর কারণ হয়তো আমি বুঝতে পারি। এত বছর পর নিজে থেকেই সমস্ত দরজা খুলেq আমার কাছে আসতে চাইছো। যে মানুষটির জন্য একসময় আমাকে অপেক্ষা করতে হয়েছে, সেই মানুষটিই আজ আমাকে নিজের করে পাওয়ার জন্য ব্যস্ত।
কী অদ্ভুত নিয়তি !
একসময় আমি তোমার দরজায় দাঁড়িয়ে ছিলাম; দরজা খোলোনি।
আজ তুমি আমার দরজায় দাঁড়িয়ে আছো, আর আমি দরজা বন্ধ করতে চাই না- শুধু ভেতরটা একটু গুছিয়ে নিতে চাই।
এটুকু সময় কি খুব বেশি চাওয়া বলো ?
তুমি হয়তো ভাবছো, এতদিন যখন অপেক্ষা করেছো, এখন কেন দ্বিধা ?
কেন সিদ্ধান্ত নিতে এত সময় লাগছে ?
কেন তোমার ভালোবাসার জবাব দিতে আমার এত হিসাব ?
কিন্তু তুমি কি কখনো ভেবে দেখেছো- যে মানুষটি দীর্ঘদিন তোমাকে চেয়ে থেকেছে, বারবার উপেক্ষিত হয়েছে, অনিশ্চয়তার মধ্যে থেকেছে, তার ভেতরটাও তো একদিন ক্লান্ত হয়ে যায়।
ভালোবাসা কখনো কখনো মানুষকে অপেক্ষা করতে শেখায়, কিন্তু দীর্ঘ অপেক্ষা মানুষকে সতর্কও করে দেয়।
আমি তোমাকে হারাতে চাই না।
কোনোভাবেই না।
এই কথাটা হয়তো আমার সমস্ত দ্বিধার চেয়েও বেশি সত্য।
তোমাকে হারানোর ভয় এখনো আমার মধ্যে আছে। বরং এতো বছর পর এসে সেই ভয় আরও গভীর হয়েছে। কারণ এখন তোমাকে হারানো মানে শুধু একজন মানুষকে হারানো নয়; হারানো মানে আমার জীবনের দীর্ঘতম অপেক্ষাটাকে হারানো, বহু বছরের অনুভূতিকে হারানো, অসংখ্য স্মৃতির অর্থ হারানো।
তবুও বাধ্য হয়ে বলছি, আমাকে একটু সময় দাও।
আমার এই সময় চাওয়াকে অবহেলা ভেবো না।
আমি তোমাকে এড়িয়ে যাচ্ছি না। তোমার হাত ছেড়ে দেওয়ার জন্য সময় নিচ্ছি না। বরং তোমার হাতটা শক্ত করে ধরার মতো সাহস, স্থিরতা আর নিশ্চয়তা তৈরি করার জন্যই একটু সময় চাইছি।
কারণ এবার যদি তোমার দিকে এগিয়ে আসি, আমি আর মাঝপথে থামতে চাই না।
এবার যদি তোমাকে নিজের জীবনের অংশ করি, তবে তোমাকে নিয়ে কোনো অর্ধেক সিদ্ধান্ত চাই না। কোনো গোপন দ্বিধা চাই না। কোনো হঠাৎ বিচ্ছেদ চাই না। কোনো অকারণ নীরবতা চাই না।
দশ-বারো বছর ধরে যে সম্পর্কটি প্রশ্নের ভেতর বেঁচে আছে, তাকে এবার উত্তর দিতে হবে।
আমি চাই না আমাদের গল্পটা আবারও ‘হয়তো’ শব্দের কাছে পরাজিত হোক।
আমি চাই না কাল আবার তুমি হঠাৎ চলে যাও।
আমি চাই না কোনো একদিন আবার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাক।
আমি চাই না আমাদের ভালোবাসা আবার কোনো অনিশ্চিত অপেক্ষার ঘরে বন্দী হয়ে থাকুক।
তাই কেবল কয়েক মাস সময় চাইছি।
তোমার কাছ থেকে পালানোর জন্য নয়, তোমার কাছেই স্থির হয়ে পৌঁছানোর জন্য।
হয়তো জানো না, দীর্ঘদিন কাউকে ভালোবেসে যখন তাকে পাওয়া যায় না, তখন একসময় মানুষ নিজের ভেতরেই তার জন্য একটি ঘর বানিয়ে নেয়। সেই ঘরে কেউ প্রবেশ করতে পারে না। সেখানে থাকে পুরোনো কথোপকথন, অপ্রকাশিত অভিমান, অপেক্ষার রাত, অসমাপ্ত স্বপ্ন আর একটি মানুষের নাম।
তুমি সেই ঘরের মানুষ।
তাই এতো সহজে তোমাকে মুছে ফেলা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।
তোমাকে ভালোবাসার বয়স হয়তো পেরিয়ে গেছে- কিন্তু তোমাকে ভালোবাসার অনুভূতিটা পেরিয়ে যায়নি।
বরং সময়ের সঙ্গে সেটা আরও গভীরে গেছে।
তুমি যখন ছিলে না, তখনও ছিলে।
তুমি যখন কথা বলোনি, তখনও আমার নীরবতার মধ্যে তোমার উপস্থিতি ছিলো।
তুমি যখন দূরে ছিলে, তখনও আমার অনেক সিদ্ধান্তের ভেতরে তোমার কথা ছিলো।
আর আজ যখন তুমি নিজেই ফিরে এসে বলছো- আমাকে তোমার জীবনে জায়গা দাও- তখন আমি কীভাবে তোমাকে বলি, ‘না’ ?
আমি তো এত বছর ধরে এই ‘হ্যাঁ’ এর অপেক্ষাতেই ছিলাম।
শুধু আজ আমার জীবনটা আগের মতো নেই।
আজ আমার চারপাশে অনেক বাস্তবতা। একপ্রকার বিপদেই ফেঁসে আছি।
আজ একটা সিদ্ধান্ত শুধু আবেগ দিয়ে নেওয়া যায় না। আজ একটা সম্পর্কের সঙ্গে আরও অনেক সম্পর্ক, অনেক দায়িত্ব, অনেক ভবিষ্যৎ জড়িয়ে আছে।
তাই আমার একটু সময় প্রয়োজন।
এই সময়টা তোমার বিরুদ্ধে নয়।
এই সময়টা আমাদের পক্ষে।
যদি সত্যিই এতো বছর পর আমাকে পেতে চাও, তবে আমার এই সামান্য সময়টুকুও নিশ্চয়ই আমাকে দিতে পারবে।
কারণ ভালোবাসা শুধু কাউকে কাছে পাওয়ার নাম নয়; ভালোবাসা হলো তার ভয়কে বোঝা, তার দ্বিধাকে সম্মান করা, তার বাস্তবতাকে গ্রহণ করা।
এতদিন আমাকে অপেক্ষা করিয়েছো।
আজ আমার অপেক্ষাটুকু সহ্য করো প্লিজ।
আমি তোমাকে দোষ দিচ্ছি না। পুরোনো হিসাবও চাইছি না। কে কতটা কষ্ট পেয়েছে, কে কাকে কতটা অবহেলা করেছে- তার হিসাব কষে ভালোবাসার ভবিষ্যৎ তৈরি করতে চাই না।
আমি শুধু চাই, এবার আমরা দুজনেই সচেতন হই।
তুমি ফিরে এসেছো- এই ফিরে আসাকে আমি অবহেলা করতে চাই না।
আর আমি একটু দেরি করছি- এই দেরিটাকেও অবহেলা ভেবো না।
কখনো কখনো মানুষ ভালোবাসার মানুষটিকে হারানোর ভয়েই সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করে।
,
কারণ সে জানে-
ভুল করে কাছে পাওয়ার থেকে, ঠিকভাবে কাছে পাওয়া অনেক বেশি জরুরি।
আমার কাছে এসো।
দরজা খোলা থাকবে।
শুধু আমাকে একটু সময় দাও ঘরটা গুছিয়ে নিতে।
যে ঘরে এত বছর ধরে তোমার জন্য অপেক্ষা করেছি, সেখানে এবার তোমাকে স্থায়ী করে রাখতে চাই।
আর যদি সত্যিই আমাকে ভালোবাসো, তবে আমার এই সময়টুকুকে সন্দেহ দিয়ে নয়- বিশ্বাস দিয়ে দেখো।
আমি দূরে যাচ্ছি না।,
আমি তোমাকে প্রত্যাখ্যান করছি না।
আমি শুধু নিজেকে প্রস্তুত করছি।
কারণ তোমাকে হারাতে চাই না।
কোনোভাবেই না।
এত বছরের অপেক্ষার পর এবার যদি আমার জীবনে আসো, আমি চাই না তুমি আবার কোনোদিন আমার জীবন থেকে চলে যাও।
তাই একটু ধৈর্য ধরো।
আর আমার এই সামান্য দেরিটুকুকে অবহেলা ভেবো না।
এটা তোমাকে হারানোর সময় নয়-
তোমাকে চিরদিনের জন্য পাওয়ার আগে নিজেকে প্রস্তুত করার সময়।
লেখক: দার্শনিক ও গণমাধ্যম বিশ্লেষক









