মানবসভ্যতার সবচেয়ে জটিল জীবন্ত রহস্য
সূত্রঃ সংগৃহীত
যদি বলা হয়, মানবদেহের সবচেয়ে বিস্ময়কর অঙ্গ কোনটি- এই প্রশ্নের উত্তরে হৃদযন্ত্র, চোখ কিংবা ফুসফুসের নাম আসতে পারে। কিন্তু মানুষকে ‘মানুষ’ করে তোলার যে ক্ষমতা- চিন্তা করা, সিদ্ধান্ত নেওয়া, ভালোবাসা, ভয় পাওয়া, স্মৃতি ধারণ করা, ভবিষ্যৎ কল্পনা করা, ভাষা সৃষ্টি করা, ভুল থেকে শেখা এবং নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কে প্রশ্ন তোলা- তার কেন্দ্রবিন্দু হলো মস্তিষ্ক।
মস্তিষ্ক মানুষের হৃদয় বা অন্তকরণ থেকে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোকে কমান্ড করে। তাই মস্তিষ্ককে এক প্রকার হৃদয়ের অস্তিত্বও বলা যায়।
মস্তিষ্ক শুধু শরীরের একটি অঙ্গ নয়; এটি মানুষের অভিজ্ঞতা, আচরণ, ব্যক্তিত্ব, জ্ঞান, আবেগ ও চেতনার অন্যতম প্রধান জৈবিক ভিত্তি। আমরা পৃথিবীকে যেভাবে দেখি, বাস্তবতাকে যেভাবে ব্যাখ্যা করি এবং নিজের সম্পর্কে যে ধারণা তৈরি করি- তার পেছনে কাজ করে অসংখ্য নিউরন, বৈদ্যুতিক সংকেত, রাসায়নিক বার্তা এবং জটিল স্নায়বিক নেটওয়ার্ক।
আধুনিক নিউরোসায়েন্স স,০ুসেই অদৃশ্য জগতের দরজা খুলে দিয়েছে। গবেষকেরা এখন মস্তিষ্কের কোষ, তাদের পারস্পরিক সংযোগ, বৈদ্যুতিক মুহ কার্যক্রম, স্মৃতি গঠন, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং রোগের জৈবিক ভিত্তি নিয়ে অভূতপূর্ব গবেষণা করছেন। তবু সত্য হলো- মস্তিষ্ক সম্পর্কে আমরা অনেক কিছু জানলেও, এর সবচেয়ে গভীর রহস্যগুলোর বড় অংশ এখনো অমীমাংসিত।
নিউরোসায়েন্স কী ?
নিউরোসায়েন্স বা স্নায়ুবিজ্ঞান হলো মস্তিষ্ক, মেরুরজ্জু এবং সমগ্র স্নায়ুতন্ত্রের গঠন ও কার্যক্রম নিয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণার ক্ষেত্র। এর সঙ্গে জীববিজ্ঞান, চিকিৎসাবিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, কম্পিউটার বিজ্ঞান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও দর্শনেরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।
একজন নিউরোসায়েন্টিস্ট শুধু ‘মস্তিষ্ক কোথায় কী করে’ তা জানতে চান না। তিনি জানতে চান- একটি চিন্তা কীভাবে সৃষ্টি হয়, একটি স্মৃতি কীভাবে সংরক্ষিত হয়, চোখের আলো কীভাবে দৃশ্যের অভিজ্ঞতায় রূপ নেয়, ভয় কীভাবে আচরণ পরিবর্তন করে এবং কয়েকটি বৈদ্যুতিক ও রাসায়নিক সংকেত কীভাবে মানুষের মতো জটিল আচরণ সৃষ্টি করতে পারে।
বর্তমান গবেষণায় ধারণা করা হয়, মানুষের মস্তিষ্কে প্রায় ৮৬ বিলিয়ন নিউরন রয়েছে এবং এসব কোষ পরস্পরের সঙ্গে বিপুলসংখ্যক সংযোগ তৈরি করে তথ্য আদান-প্রদান করে। মিলিসেকেন্ডের মধ্যে বৈদ্যুতিক কার্যক্রমের মাধ্যমে মস্তিষ্কে তথ্য প্রক্রিয়াকরণ হয়।
এ কারণেই মস্তিষ্ককে কেবল একটি ‘কম্পিউটার’ হিসেবে তুলনা করা পুরোপুরি যথাযথ নয়। কম্পিউটার তথ্য প্রক্রিয়াকরণ করে, কিন্তু মানুষের মস্তিষ্ক একই সঙ্গে অনুভব করে, শেখে, নিজের সংযোগ পরিবর্তন করে এবং পরিবেশের সঙ্গে ক্রমাগত অভিযোজিত করে।
মস্তিষ্কের অন্যতম মৌলিক কোষ হলো নিউরন। নিউরন বৈদ্যুতিক ও রাসায়নিক সংকেতের মাধ্যমে একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করে।
একটি নিউরনের সাধারণ কাঠামোর মধ্যে রয়েছে কোষদেহ, ডেনড্রাইট ও অ্যাক্সন। ডেনড্রাইট অন্য কোষ থেকে সংকেত গ্রহণ করতে পারে, আর অ্যাক্সন সেই সংকেত অন্য কোষের দিকে পাঠাতে পারে। দুই নিউরনের সংযোগস্থলকে বলা হয় সিন্যাপ্স।
এই সিন্যাপ্সগুলোই মস্তিষ্কের তথ্যপ্রক্রিয়াকরণের জটিল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে।
তবে মস্তিষ্কের গল্প শুধু নিউরন দিয়ে শেষ নয়। গ্লিয়াল কোষও স্নায়ুতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তারা নিউরনের সহায়তা, পুষ্টি, পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ, সুরক্ষা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কাজে ভূমিকা রাখে।
অর্থাৎ মস্তিষ্ক একটি বিশাল ‘কোষ-সমাজ’, যেখানে বিভিন্ন ধরনের কোষ সমন্বিতভাবে কাজ করে।
মস্তিষ্ক কীভাবে চিন্তা করে ?
‘চিন্তা’ শব্দটি সহজ হলেও এর জৈবিক প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল।
আমরা কোনো বস্তু দেখি। চোখ থেকে তথ্য স্নায়বিক সংকেত হিসেবে মস্তিষ্কে পৌঁছায়। মস্তিষ্কের বিভিন্ন অঞ্চল সেই তথ্য বিশ্লেষণ করে। আগের স্মৃতির সঙ্গে নতুন তথ্যের তুলনা হয়। এরপর বস্তুটির অর্থ নির্ধারণ হতে পারে।
ধরা যাক, আপনি রাস্তায় একটি পরিচিত মানুষকে দেখলেন। চোখ প্রথমে দৃশ্যমান তথ্য সংগ্রহ করবে। মস্তিষ্ক মুখের বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করবে। স্মৃতির সঙ্গে মিলিয়ে পরিচয় শনাক্ত হবে। এরপর আবেগ যুক্ত হতে, পারে। তারপর আপনি হাসবেন, কথা বলবেন বা হাত নাড়বেন।
এই পুরো ঘটনাটি আমাদের কাছে কয়েক মুহূর্তের একটি সাধারণ অভিজ্ঞতা। কিন্তু এর পেছনে অসংখ্য স্নায়বিক প্রক্রিয়া সক্রিয় থাকে।
সাম্প্রতিক গবেষণায় ক্ষুদ্র মস্তিষ্কীয় অঞ্চলের নিউরনগুলোর সংযোগ ও কার্যক্রম মানচিত্রায়নের মাধ্যমে গবেষকেরা দেখানোর চেষ্টা করছেন কীভাবে জটিল নেটওয়ার্ক থেকে দৃশ্যের মতো অভিজ্ঞতা তৈরি হয়।
মানুষের পরিচয়ের একটি বড় অংশ তৈরি হয় স্মৃতি দিয়ে।
শৈশবের কোনো ঘটনা, মায়ের মুখ, স্কুলের প্রথম দিন, প্রিয় মানুষের সঙ্গে কাটানো মুহূর্ত কিংবা কোনো দুর্ঘটনার স্মৃতি- এসব আমাদের আচরণ ও পরিচয়কে প্রভাবিত করে।
কিন্তু স্মৃতি কোনো ভিডিও রেকর্ডার নয়। আমরা অতীতকে হুবহু সংরক্ষণ করি না; বরং মস্তিষ্ক অভিজ্ঞতার বিভিন্ন অংশকে পুনর্গঠন করে স্মরণ করতে পারে।
এ কারণেই একই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী কয়েকজন মানুষের স্মৃতিতে পার্থক্য দেখা যেতে পারে।
স্মৃতি গঠনের সঙ্গে নিউরনের সংযোগে পরিবর্তন বা সিন্যাপটিক প্লাস্টিসিটির সম্পর্ক রয়েছে। অর্থাৎ শেখার সঙ্গে মস্তিষ্কের নেটওয়ার্কের কার্যকর সংযোগও পরিবর্তিত হতে পারে।
এখানেই নিউরোসায়েন্সের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা সামনে আসে- নিউরোপ্লাস্টিসিটি।
একসময় ধারণা ছিল, মানুষের মস্তিষ্কের কাঠামো মূলত নির্দিষ্ট এবং বয়স বাড়ার সঙ্গে পরিবর্তনের সুযোগ খুব সীমিত।
আধুনিক নিউরোসায়েন্স সেই ধারণাকে অনেকটাই পরিবর্তন করেছে।
মস্তিষ্ক অভিজ্ঞতা, শেখা, পরিবেশ, প্রশিক্ষণ এবং কিছু ক্ষেত্রে আঘাতের পর পুনর্গঠনের মাধ্যমে নিজের কার্যকর সংযোগে পরিবর্তন আনতে পারে। এই অভিযোজনক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ ধারণাগত কাঠামো হলো নিউরোপ্লাস্টিসিটি।ঙ
একজন মানুষ নতুন ভাষা শেখেন, বাদ্যযন্ত্র বাজানো শেখেন, নতুন দক্ষতা অর্জন করেন কিংবা নিয়মিত কোনো জটিল কাজ অনুশীলন করেন- এসব অভিজ্ঞতা মস্তিষ্কের কার্যক্রম ও সংযোগের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
এ কারণেই শিক্ষা শুধু তথ্য মুখস্থ করার বিষয় নয়। শিক্ষা মস্তিষ্কের কার্যকর ব্যবস্থাকেও প্রভাবিত করে।
শিশুর ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। জন্মের আগের সময় থেকে শৈশব পর্যন্ত পুষ্টি, নিরাপত্তা, শিক্ষা, সামাজিক যোগাযোগ ও পরিবেশ মস্তিষ্কের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। WHO- ও জীবনব্যাপী ব্রেন হেলথের ক্ষেত্রে শারীরিক স্বাস্থ্য, নিরাপদ পরিবেশ, শেখা, সামাজিক যোগাযোগ এবং মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবাকে গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারক হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
মানুষ শুধু যুক্তির প্রাণী নয়; আবেগও তার সিদ্ধান্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
ভালোবাসা, ভয়, আনন্দ, রাগ, দুঃখ, লজ্জা কিংবা উত্তেজনা- এসব অভিজ্ঞতার সঙ্গে মস্তিষ্কের বিভিন্ন নেটওয়ার্ক জড়িত।
কোনো বিপদের সম্ভাবনা দেখলে শরীর প্রস্তুত হয়।ে হৃদস্পন্দন বাড়তে পারে, মনোযোগ সংকুচিত হতে পারে এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা তৈরি হতে পারে।
আবার নিরাপদ সামাজিক সম্পর্ক, ভালোবাসা ও ইতিবাচক অভিজ্ঞতাও মস্তিষ্কের কার্যক্রমে প্রভাব ফেলে।
তাই ‘মানসিক স্বাস্থ্য’ ও ‘মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য’কে সম্পূর্ণ আলাদা দুটি জগত হিসেবে দেখার প্রবণতা বৈজ্ঞানিকভাবে ক্রমেইঙ অপ্রতুল হয়ে উঠছে।
অনেকে ঘুমকে নিছক নিষ্ক্রিয় বিশ্রাম হিসেবে মনে করেন। কিন্তু ঘুমের সময় মস্তিষ্ক সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় থাকে না।
ঘুমের বিভিন্ন পর্যায়ে মস্তিষ্কে ভিন্ন ধরনের কার্যক্রম ঘটে। ঘুম স্মৃতি, শেখা, আবেগ নিয়ন্ত্রণ এবং শরীরের পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত।
পর্যাপ্ত ঘুম না হলে মনোযোগ, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, প্রতিক্রিয়ার গতি ও শেখার ক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এআই এর যুগে রাত জেগে মোবাইল ব্যবহার, অনিয়মিত কর্মঘণ্টা এবং দীর্ঘ সময় স্ক্রিনে থাকার কারণে ঘুমের ওপর চাপ বাড়ছে। ফলে ব্রেন হেলথের আলোচনায় ঘুমকে বিলাসিতা নয়, বরং স্বাস্থ্যব্যবস্থাপনার মৌলিক অংশ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
মস্তিষ্ক শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো অঙ্গ নয়।
রক্তসঞ্চালন, রক্তচাপ, রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা, অক্সিজেন সরবরাহ, বিপাকীয় স্বাস্থ্য এবং শারীরিক কার্যক্রম- সবকিছুই কোনো না কোনোভাবে মস্তিষ্কের ওপর প্রভাব ফেলে।
বিশেষ করে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, ধূমপান, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ কিছু স্নায়বিক রোগের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত।
WHO- এর সাম্প্রতিক বৈশ্বিক বিশ্লেষণেও উচ্চ সিস্টোলিক রক্তচাপ এবং বায়ুদূষণকে স্ট্রোকের বোঝার গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনযোগ্য ঝুঁকির মধ্যে রাখা হয়েছে।
অর্থাৎ ব্রেন হেলথ রক্ষার জন্য শুধু ‘ব্রেনের ওষুধ’ খোঁজা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সামগ্রিক স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন ও রোগ প্রতিরোধ।
স্ট্রোক নিউরোলজির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জরুরি অবস্থা।
মস্তিষ্কের কোনো অংশে রক্তপ্রবাহ বন্ধ হয়ে গেলে বা রক্তনালি ফেটে গেলে মস্তিষ্কের কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এর ফলে কথা বলা, হাঁটা, দেখা, স্মৃতি কিংবা শরীরের কোনো অংশের নড়াচড়া ব্যাহত হতে পারে।
স্ট্রোকের ক্ষেত্রে সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা গেলে কিছু ক্ষেত্রে ক্ষতি কমানোর সুযোগ থাকে।
তাই মুখের একপাশ বেঁকে যাওয়া, এক হাত দুর্বল বা অবশ হয়ে যাওয়া এবং কথা জড়িয়ে যাওয়ার মতো হঠাৎ উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত জরুরি চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন।
বয়স বাড়ার সঙ্গে কিছু মানুষের স্মৃতিশক্তি ও চিন্তার ক্ষমতা কমতে পারে। কিন্তু স্বাভাবিক বয়সজনিত ভুলে যাওয়া এবং ডিমেনশিয়া এক বিষয় নয়।
ডিমেনশিয়া এমন একটি ক্লিনিক্যাল সিনড্রোম, যেখানে স্মৃতি, চিন্তা, ভাষা, আচরণ কিংবা দৈনন্দিন কাজ করার সক্ষমতায় এমন পরিবর্তন আসে যা ব্যক্তির স্বাভাবিক জীবনকে প্রভাবিত করে।
বিশ্বজুড়ে মানুষের আয়ু বাড়ছে। ফলে বয়স-সম্পর্কিত স্নায়বিক রোগের গুরুত্বও বাড়ছে।
WHO- এর বর্তমান তথ্য অনুযায়ী, নিউরোলজিক্যাল রোগ বিশ্বব্যাপী অসুস্থতা ও অক্ষমতার প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে এবং ২০২১ সালের হিসাবে তিন বিলিয়নের বেশি মানুষ কোনো না কোনো স্নায়বিক অবস্থার সঙ্গে বসবাস করছিলেন।
এটি শুধু চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিষয় নয়; এটি অর্থনীতি, পরিবার, কর্মক্ষমতা এবং সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়ও।
মাইগ্রেনকে অনেক সময় সাধারণ মাথাব্যথা হিসেবে অবহেলা করা হয়। কিন্তু মাইগ্রেন একটি জটিল স্নায়বিক অবস্থা।
মাথাব্যথার পাশাপাশি আলো বা শব্দে সংবেদনশীলতা, বমিভাব এবং কিছু ক্ষেত্রে অন্যান্য স্নায়বিক উপসর্গও থাকতে পারে।
বিশ্বব্যাপী নিউরোলজিক্যাল রোগের বোঝায় মাইগ্রেনের অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। WHO- এর তথ্যেও মাইগ্রেনকে প্রধান অবদানকারী নিউরোলজিক্যাল অবস্থাগুলোর একটি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তাই দীর্ঘদিনের বা বারবার হওয়া মাথাব্যথাকে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
স্মার্টফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভিডিও প্ল্যাটফর্ম ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের তথ্য গ্রহণের পদ্ধতি বদলে দিয়েছে।
একদিকে প্রযুক্তি শিক্ষা, চিকিৎসা ও গবেষণায়ব বিপ্লব ঘটাচ্ছে। অন্যদিকে অতিরিক্ত নোটিফিকেশন, দ্রুত কনটেন্ট পরিবর্তন এবং অবিরাম মনোযোগ-বিভাজন মানুষের মনোযোগ ব্যবস্থার ওপর কী দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলছে- এটি এখনো গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।
এখানে আতঙ্কের চেয়ে প্রয়োজন বৈজ্ঞানিক ভারসাম্য।
প্রযুক্তি নিজে শত্রু নয়। প্রশ্ন হলো- আমরা প্রযুক্তিকে কীভাবে ব্যবহার করছি।
নিউরোসায়েন্স এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্পর্ক ভবিষ্যতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাক্ষেত্রগুলোর একটি হতে পারে।
মানুষের মস্তিষ্কের তথ্যপ্রক্রিয়াকরণ পদ্ধতি থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে কৃত্রিম নিউরাল নেটওয়ার্কের ধারণা তৈরি হয়েছে। আবার এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে মস্তিষ্কের বিপুল ডেটা বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
ভবিষ্যতে নিউরোইমেজিং, মেশিন লার্নিং ও ব্রেন-কম্পিউটার ইন্টারফেসের সমন্বয় পক্ষাঘাতগ্রস্ত ব্যক্তিদের যোগাযোগ ও পুনর্বাসনের নতুন পথ খুলে দিতে পারে।
তবে এর সঙ্গে নৈতিক প্রশ্নও আছে- মস্তিষ্কের তথ্য কার মালিকানাধীন ? মানুষের চিন্তা বা নিউরাল ডেটা কতটা ব্যক্তিগত ? প্রযুক্তি যদি মস্তিষ্কের সংকেত বিশ্লেষণ করতে পারে, তাহলে ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও গোপনীয়তার সীমা কোথায় ?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর বিজ্ঞানীদের পাশাপাশি আইনবিদ, নীতিনির্ধারক ও সমাজবিজ্ঞানীদেরও দিতে হবে।
বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশে ব্রেন হেলথকে শুধু বিশেষায়িত হাসপাতালের বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না।
স্ট্রোক, মৃগীরোগ, মাইগ্রেন, ডিমেনশিয়া, পারকিনসনসহ বিভিন্ন স্নায়বিক সমস্যার পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্য, শিশুর নিউরো-ডেভেলপমেন্ট, জন্মকালীন জটিলতা এবং দুর্ঘটনাজনিত মস্তিষ্কের আঘাতও গুরুত্বপূর্ণ।
WHO- এর ২০২৫ সালের বাংলাদেশের জন্য প্রকাশিত বিনিয়োগ-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে মানসিক, স্নায়বিক ও মাদক-সম্পর্কিত সমস্যাকে বাংলাদেশের জন্য উল্লেখযোগ্য স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
বাংলাদেশে তাই প্রয়োজন-
প্রথমত, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে নিউরোলজি সেবা সম্প্রসারণ।
দ্বিতীয়ত, স্ট্রোকের জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা।
তৃতীয়ত, শিশুর বিকাশগত সমস্যা দ্রুত শনাক্ত করার ব্যবস্থা তৈরি করা।
চতুর্থত, উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণকে ব্রেন হেলথ নীতির অংশ করা।
পঞ্চমত, বায়ুদূষণ ও পরিবেশগত ঝুঁকি কমানো।
ষষ্ঠত, নিউরোলজি ও নিউরোসায়েন্স গবেষণায় জাতীয় বিনিয়োগ বৃদ্ধি।
সপ্তমত, গ্রাম ও শহরের মধ্যে চিকিৎসাসেবার বৈষম্য কমানো।
অষ্টমত, রোগী ও পরিবারকে ঘিরে সামাজিক কুসংস্কার ও কলঙ্ক কমানো।
মস্তিষ্ক সুস্থ থাকার অর্থ শুধু স্ট্রোক, ডিমেনশিয়া বা মৃগীরোগ না থাকা নয়।
WHO- এর সংজ্ঞায় ব্রেন হেলথের মধ্যে জ্ঞানীয়, সংবেদনশীল, সামাজিক-আবেগীয়, আচরণগত ও মোটর সক্ষমতার কার্যকর অবস্থা অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ একজন মানুষ যেন তার জীবনপর্যায়ে নিজের সম্ভাবনাকে যথাসম্ভব বিকশিত করতে পারেন- ব্রেন হেলথের লক্ষ্য তার চেয়েও বিস্তৃত।
এ কারণে শিশুর পুষ্টি থেকে শুরু করে বৃদ্ধের সামাজিক যোগাযোগ- সবকিছুই ব্রেন হেলথের আলোচনায় আসতে হবে।
আমরা সাধারণত স্বাস্থ্য বলতে শরীরের স্বাস্থ্যকে বুঝি। কিন্তু ভবিষ্যতের স্বাস্থ্যনীতি হতে হবে ‘বডি অ্যান্ড ব্রেন’- শরীর ও মস্তিষ্ককে একসঙ্গে কেন্দ্র করে।
শিশুকে পর্যাপ্ত পুষ্টি দেওয়া ব্রেন হেলথ।
মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা ব্রেন হেলথ।
নিরাপদ সড়ক তৈরি করা ব্রেন হেলথ।
বায়ুদূষণ কমানো ব্রেন হেলথ।
উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করা ব্রেন হেলথ।
মানুষকে সামাজিকভাবে যুক্ত রাখা ব্রেন হেলথ।
পর্যাপ্ত ঘুমের সুযোগ তৈরি করা ব্রেন হেলথ।
বৃদ্ধ মানুষের একাকিত্ব কমানোও ব্রেন হেলথ।
অর্থাৎ মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য আসলে একটি ব্যক্তিগত ও সামাজিক দায়িত্ব।
মানবসভ্যতা মহাকাশে অনুসন্ধান পাঠিয়েছে, সমুদ্রের গভীরে নেমেছে, জিনোমের রহস্য উন্মোচন করেছে। কিন্তু মানুষের নিজের মস্তিষ্ক এখনো তার সবচেয়ে বড় বৈজ্ঞানিক রহস্যগুলোর একটি।
একটি ছোট্ট মস্তিষ্ক কীভাবে ভাষা তৈরি করে, একটি মুখ চিনে ফেলে, প্রিয় মানুষকে মনে রাখে, ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখে এবং নিজের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলে- এই প্রশ্নগুলোর পূর্ণ উত্তর এখনো আমাদের হাতে নেই।
তবে নিউরোসায়েন্স আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছে: মস্তিষ্ক কোনো স্থির যন্ত্র নয়। এটি জীবন্ত, পরিবর্তনশীল এবং পরিবেশের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
আমরা কী খাই, কীভাবে ঘুমাই, কী শিখি, কাদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখি, কী ধরনের পরিবেশে বাস করি এবং কীভাবে আমাদের রোগগুলো নিয়ন্ত্রণ করি- এসবের সঙ্গে মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের সম্পর্ক রয়েছে।
সুতরাং ভবিষ্যতের উন্নত রাষ্ট্র কেবল সেতু, সড়ক, বিদ্যুৎ কিংবা প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করবে না; মানুষের মস্তিষ্কের সক্ষমতা ও সুস্থতাতেও বিনিয়োগ করবে।
কারণ একটি দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ শুধু তার মাটি, খনিজ বা অর্থ নয়- তার মানুষের মস্তিষ্ক।
আর সেই মস্তিষ্ককে সুস্থ, সচল, সৃজনশীল ও মানবিক রাখাই হতে পারে আগামী শতাব্দীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক বিনিয়োগ।
ওমায়ের আহমেদ শাওন
(লেখক, গবেষক ও গণমাধ্যম বিশ্লেষক)









