অনিকেত জীবনের গল্প (পর্ব-০৬) কলমেঃ অনিকেত

প্রকাশিত: ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৯:৪৮ পিএম
অনিকেত জীবনের গল্প (পর্ব-০৬)  কলমেঃ অনিকেত

....ঋতু পরিক্রমায় প্রকৃতিতে জুড়ে পৌষের হাড় কাঁপানো শীত পড়ছে। স্তব্ধ জনজীবনে ইংরেজি নববর্ষের সূচনা হলো সবেমাত্র। চারদিকে আতশবাজি কিংবা ডিজে গানের মোহ কাটিয়ে হঠাৎই আমার চোখ জোড়া আটকে গেল সুদূর আকাশে! এ কি! একখণ্ড চাঁদ যেন মহাকালের সমস্ত সৌন্দর্য কেঁড়ে নিয়েছে! আহা! কী মায়াবী তার অবয়ব! চাঁদের অপূর্ব সৌন্দর্য বর্ধনে তারাগুলোও যেন আকাশময় মিটিমিটি আলো জ্বেলে রেখেছে। মুহুর্তেই পুলকিত হয়ে অনিকেত মন সকল কিছুকে পেছনে ফেলে লিখতে বসেছে এক অসমাপ্ত মহাকাব্যের অপরূপ কাহিনী। অনিকেত জীবনের গল্প! 

বলছিলাম আমার জীবনের বটবৃক্ষ ও একমাত্র আশ্রয়স্থল, আমার বাবার শৈশবের অনিঃশেষ গল্প কথা। বেড়বিন্নী জোয়ার্দার বংশের বীর মুক্তিযোদ্ধা ওয়াজেদ আলী জোয়ার্দারের জ্যেষ্ঠ পুত্র আমার বাবা। রঙিন শৈশবে আমার বাবার জীবন ছিল ধূসর সব গল্পে ঠাসা! অনেকেরই হয়তো বুঝতে বাকি নেই যে, কেনই বা আমার বাবার শৈশব জীবনে অন্ধকার নেমে এসেছিল! প্রকৃতির অবিচারে আমার বাবার অদম্য মেধার বিচ্ছুরণ সেদিন ঘটেনি! দেশের তৎকালীন প্রেক্ষাপট ও দাদার অবর্তমানে আমার বাবার শৈশবের গল্পগুলো নীরবে-নিভৃতে কেঁদে-কেঁদে তিলে তিলে নষ্ট হয়েছিল! নতুন কোন বইয়ের পাতায় বঙ্গ অক্ষরে লেখা হয়নি অমৃত সেই কথাকলি।

ভক্তকূলের স্মরণার্থে আবারও বলছি, সময়টা তখন ৭০-এর দশক। পাক হানাদারদের ভয়ানক তাণ্ডবে উত্তাল বাংলাদেশের শহর-গ্রাম। নদী-নালা, খাল-বিল কিংবা ভাগাড়ে-ভাগাড়ে শুধু লাশ আর লাশ! পাকিস্তানি প্রেতাত্মাদের স্বৈরশাসনে ক্ষত-বিক্ষত বাংলা মায়ের হৃদপিণ্ড! আগেই বলেছি, দাদাভাই মুক্তি বাহিনীতে যোগ দেয়ার পর ঘর ছেড়েছিলেন। আর, আমার বাবা তার বালক সুলভ আনাড়ি হাতে ধরেছিলেন জীবন ও সংসারের হাল! এ যেন যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশে কেবলই বেঁচে থাকার হাহাকার। অথবা, বলতে গেলে অস্তিত্ব রক্ষার্থে সংশপ্তকের মতো টিকে থাকার লড়াই। 

দাদার অবর্তমানে আমার দাদি তাঁর ছয় ছয়টি পুত্র-কন্যা নিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন নিজ মাতুলালয় হরিণাকুণ্ডু উপজেলার ফলসি গ্রামে। আমার ব্যক্তি জীবনের একমাত্র আশ্রয়স্থল, আমার বাবা তখন দাদির জীবনে অন্ধের জষ্ঠি হয়ে সংসার চালাতে মাটি কাটার কাজে যোগ দিয়েছিলেন! কান্না বিজড়িত কণ্ঠে বাবা আমার সেসব দিনের লোমহর্ষক চিত্রকল্প তুলে ধরে প্রায়ই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন! 

একদিন বাবা গল্প বলছিলেন, আর আমি বাবার কোলে মাথা রেখে কান পেতে শুনছিলাম সেই দুর্ভিক্ষ পীড়িত সময়ে জনমানুষের টিকে থাকার অনবদ্য কথাকলি। বাবা বলছিলেন, 

জানো আব্বু, আমরা তখন দল বেঁধে গ্রামে-গ্রামে ঘুরে কাজ করে বেড়াতাম। সেসময় নদী-নালা, খাল-বিল আর ভাগাড়ে-ভাগাড়ে কত মা, বাবা, ভাই, বোন কিংবা অজানা মানুষের লাশ আমরা গলতে-পঁচতে দেখেছি তার কোন হিসেব নেই আব্বু! সে এক ভয়ংকর বিভীষিকাময় সময়। 

আমার বয়স তখন আট কী নয় বছর। আমার বয়সী অনেক ছেলে-মেয়ে সেদিন কচি হাতে ধরেছিল জীবন-সংসারের হাল। তোমার নাসির কাকা, শরিফুল কাকারা সার্বক্ষণিক আমার সাথে থাকতেন। আমরা তো তেমন একটা কাজ করতে পারতাম না, তবুও হাল ছাড়িনি আব্বু। এই দেখো আব্বু, আমার দু'হাতের তালুতে এখনও কড়া পড়ে আছে। দাগ মোছেনি! চোখের পানি মুছে বাবা বললেন, মনে রেখো আব্বু, আমাদের প্রত্যেকের জীবনেরই কিছু কিছু দাগ কখনোই মুছে যায় না। কিংবা, চাইলেও মুছে ফেলার কোন উপায় থাকে না। আমৃত্যু সেই সব ক্ষত চিহ্ন বয়ে বেড়াতে হয়!....

(চলবে)


লেখকঃ 

মোঃ আসাদুজ্জামান



বা/মে২৪/ম