সেন্টমার্টিনে নীরব হাহাকার: প্রবাল দ্বীপের পর্যটন শিল্প কি তবে বিলুপ্তির পথে?

প্রকাশিত: ০৮ এপ্রিল ২০২৬, ০২:১০ পিএম
সেন্টমার্টিনে নীরব হাহাকার: প্রবাল দ্বীপের পর্যটন শিল্প কি তবে বিলুপ্তির পথে?

জুয়েল রানা,  নোয়াখালী প্রতিনিধি :

প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনের নীল জলরাশি আর নারিকেল বিথীর মায়া এখন পর্যটকদের চেয়ে বেশি তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে দ্বীপের কয়েকশ রিসোর্ট মালিক ও বিনিয়োগকারীকে।

সরকারি কঠোর বিধিনিষেধ আর পর্যটন মৌসুমের নজিরবিহীন সংকোচনে এখন সেখানে আনন্দের চেয়ে কান্নার সুরই বেশি ভারী। যে দ্বীপ একসময় দেশের পর্যটন অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র ছিল, ২০২৬ সালের এই সময়ে এসে সেটি এখন বিনিয়োগকারীদের জন্য এক ‘আর্থিক মৃত্যুফাঁদে’ পরিণত হয়েছে।

সেন্টমার্টিনের পর্যটনকে এখন আর 'মৌসুম' বলা চলে না, বরং এটি একটি 'ঝলক' মাত্র। বর্তমানে কার্যকর নিয়ম অনুযায়ী বছরের ৯ মাসই দ্বীপে পর্যটক প্রবেশ নিষিদ্ধ। বাকি ৩ মাসের মধ্যে নভেম্বরে শুধু দিনে গিয়ে দিনে ফেরার সুযোগ থাকলেও রাত যাপন নিষিদ্ধ। অর্থাৎ, কয়েক কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত রিসোর্টগুলো পূর্ণাঙ্গ ব্যবসার সুযোগ পাচ্ছে মাত্র ডিসেম্বর ও জানুয়ারি—এই দুই মাস।

বছরের ৩৬৫ দিনের মধ্যে মাত্র ৬০ দিন ব্যবসা করে বাকি ৩০৫ দিনের রক্ষণাবেক্ষণ খরচ, কর্মচারীদের বেতন এবং ব্যাংক ঋণের কিস্তি শোধ করা কোনোভাবেই সম্ভব হচ্ছে না বলে জানাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা।

দ্বীপের একজন প্রবীণ রিসোর্ট মালিক আক্ষেপ করে বলেন, "আমরা পরিবেশ রক্ষার বিরোধী নই, কিন্তু আমাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। ব্যাংক থেকে কয়েক কোটি টাকা ঋণ নিয়ে রিসোর্ট করেছি। এখন দুই মাস ব্যবসা করে ১০ মাসের খরচ চালানো তো দূরের কথা, জেনারেটর আর আসবাবপত্র রক্ষণাবেক্ষণ করতেই সব শেষ হয়ে যাচ্ছে।"

সরেজমিনে দেখা গেছে, অনেক রিসোর্ট মালিক ঋণের দায় মেটাতে না পেরে তাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বিক্রি করে দেওয়ার চেষ্টা করছেন, কিন্তু বর্তমান অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে কোনো ক্রেতাও মিলছে না। ফলে অনেকেই নিঃস্ব হয়ে দেউলিয়া হওয়ার পথে হাঁটছেন।

ব্যবসায়ীদের এই সংকট শুধু মালিকপক্ষেই সীমাবদ্ধ নয়। এর প্রভাব পড়ছে কয়েক হাজার শ্রমিকের ওপর।

রিসোর্ট ও হোটেল বন্ধ থাকায় কয়েক হাজার হোটেলকর্মী, বাবুর্চি ও পরিচ্ছন্নতা কর্মী কাজ হারিয়েছেন। পর্যটকদের ওপর নির্ভরশীল স্থানীয় দোকানদার, ভ্যান চালক এবং নৌকার মাঝিদের ঘরে এখন চুলা জ্বলছে না বললেই চলে। দীর্ঘ সময় ব্যবহার না হওয়ায় লোনা বাতাসে রিসোর্টগুলোর এসি, ফ্রিজ এবং দামি আসবাবপত্র দ্রুত নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, যা আর্থিক ক্ষতির পাল্লা আরও ভারী করছে।

পরিবেশবাদীরা বলছেন, প্রবাল দ্বীপকে বাঁচাতে মানুষের চাপ কমানোর বিকল্প নেই। তবে পর্যটন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিকল্প কর্মসংস্থান বা পরিকল্পিত ‘ইকো-ট্যুরিজম’ মডেল ছাড়াই হুট করে পর্যটন সীমিত করায় আজ এই বিপর্যয়। মালদ্বীপ বা অন্যান্য দ্বীপরাষ্ট্রের মতো বিজ্ঞানসম্মত ব্যবস্থা না নিয়ে কেবল ‘নিষেধাজ্ঞা’ দেওয়ার ফলে একটি সাজানো শিল্প এখন ধ্বংসের পথে।

সেন্টমার্টিনের আকাশ এখন নীল থাকলেও সেখানকার ব্যবসায়ীদের ভবিষ্যৎ ধোঁয়াশায় আচ্ছন্ন। সঠিক পরিকল্পনা ও পর্যটন নীতিমালা সংস্কার না করলে অচিরেই দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপটি তার জৌলুস হারাবে এবং কয়েক হাজার কোটি টাকার বেসরকারি বিনিয়োগ বালির বাঁধের মতো ধসে পড়বে।