শিক্ষাব্যবস্থার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকারের কাছে প্রত্যাশা-প্রফেসর ড. মনিরুল হাসান

প্রকাশিত: ০৮ এপ্রিল ২০২৬, ০১:১১ পিএম
শিক্ষাব্যবস্থার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকারের কাছে প্রত্যাশা-প্রফেসর ড. মনিরুল হাসান

আহমেদ মুনহা, চবি প্রতিনিধি:

গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রীর হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণের পর থেকে একের পর এক উন্নয়নমূলক উদ্যোগ, নীতিগত সংস্কার এবং প্রশাসনিক গতিশীলতার মাধ্যমে নতুন এক সম্ভাবনাময়, কল্যাণমুখী ও আধুনিক রাষ্ট্র গঠনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর নেতৃত্বে সরকার রাষ্ট্র পরিচালনায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং দক্ষতার নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপনের চেষ্টা করে চলেছে। বিশেষ করে শিক্ষা, অর্থনীতি ও প্রযুক্তি খাতে যুগোপযোগী সংস্কারের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি ইতিবাচক দিগন্ত উন্মোচন করেছে।

শিক্ষাক্ষেত্রেও প্রধানমন্ত্রী এমন একজন যোগ্য, স্মার্ট ও দূরদর্শী ব্যক্তিকে দায়িত্ব দিয়েছেন, যিনি অতীতে শিক্ষাব্যবস্থার শৃঙ্খলা ও সততার এক অনন্য নজির স্থাপন করেছিলেন। তিনি হলেন ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। একসময় শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি পরীক্ষায় নকল প্রতিরোধে কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় একটি ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাঁর সেই সাহসী উদ্যোগ আজও শিক্ষাঙ্গনাঙ্গনে একটি উদাহরণ হিসেবে আলোচিত হয়। বর্তমানে তিনি শিক্ষমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন এবং নতুন করে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছেন। শিক্ষার মানোন্নয়ন, গবেষণা বৃদ্ধি, প্রযুক্তি শিক্ষা সম্প্রসারণ এবং নৈতিক মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে তাঁর বিভিন্ন পরিকল্পনা ইতোমধ্যেই জাতির মধ্যে আশাবাদ সৃষ্টি করেছে। শিক্ষামন্ত্রী দেশের শিক্ষাক্ষতের বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ-বিশেষ করে শিক্ষক সংকট, পাঠদানের মান এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা-দিয়ে উত্তরণ ঘাতে বৈঠক করছেন।

'Education is the most powerful weapon which you can use to change the world.' - Nelson Mandela. এই উক্তিটি আজও বিশ্বের প্রতিটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য প্রাসঙ্গিক। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজের মধ্যে একটি নিবিড় সম্পর্ক বিদ্যমান। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সমাজ তার নতুন সদস্যের সামাজিক করে তোলে। বিখ্যাত দার্শনিক জন ডিউই বলেন- School is simplified, purified and better balanced society. অর্থাৎ স্কুল হলো একটি সরল মার্জিত ও সুষম সমাজ। একটি সুষম ও শিক্ষিত সমাজ প্রতিষ্ঠিত হলেই মানুষ আদর্শবান, নীতি নীতি ও মূল্যবোধ সম্পন্ন, সঠিক ধ্যান ধারণা, ভালো আচার-আচরণ ও তার ব্যক্তিত্বের মাধ্যমে প্রতিফলন করতে সক্ষম হয়। এর ফল লাভ করে পরিবার থেকে শুরু করে রাষ্ট্র পর্যন্ত।

একটি জাতির অর্থনৈতিক উন্নয়ন, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ভিত্তি গড়ে ওঠে তার শিক্ষাব্যবস্থার ওপর। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। স্বাধীনতার পর থেকে শিক্ষাক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। কিন্তু আজকের বাস্তবতায় আমরা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের মুখোমুখি- আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা কি সত্যিই এমন মানবসম্পদ তৈরি করতে পারছে, যারা আগামী বিশ্বের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারবে? তাই আজকের বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য একটি আধুনিক ও যুগোপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি।

আধুনিক শিক্ষা বলতে শুধু পাঠ্যবইভিত্তিক জ্ঞান অর্জনকে বোঝায় না; বরং এটি এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা যা শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা, সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং বাস্তব সমস্যার সমাধান করার সক্ষমতা গড়ে তোলে। আধুনিক শিক্ষার মূল লক্ষ্য হলো-একজন শিক্ষার্থীকে কেবল পরীক্ষায় ভালো ফল করার জন্য নয়, বরং একজন দক্ষ ও সচেতন নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা। আজকের বিশ্বে উন্নত দেশগুলো শিক্ষাব্যবস্থাকে গবেষণা, প্রযুক্তি এবং উদ্ভাবনের সঙ্গে যুক্ত করেছে। উদাহরণস্বরূপ, ফিনল্যান্ড, সিঙ্গাপুর এবং দক্ষিণ কোরিয়ার শিক্ষাব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা ও দক্ষতা বিকাশে বিশেষ গুরুত্ব দেয়। এসব দেশের অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যায় যে শিক্ষাব্যবস্থায় গুণগত পরিবর্তন একটি জাতির সামগ্রিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। নতুন সরকারের সামনে তাই শিক্ষাসংস্কারের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক সুযোগ তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন সময়ে শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষার বিস্তার, নারীশিক্ষার অগ্রগতি এবং উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বৃদ্ধির মতো উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জিত হয়েছে। কিন্তু শিক্ষার মান, গবেষণার সুযোগ, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির সক্ষমতা এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার প্রসারের ক্ষেত্রে এখনও অনেক চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। দেশের বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকার সম্পাদকীয় ও বিশ্লেষণধর্মী নিবন্ধে এসব বিষয় বারবার উঠে এসেছে। শিক্ষামন্ত্রণালয় নতুন নেতৃত্বে গত এক মাসে যে কার্যক্রম পরিচালনা করেছে, তা দেশের জাতীয় পত্র-পত্রিকায় বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন এবং প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজের নেতৃত্বে শিক্ষায়াতে গতি, শৃঙ্খলা ও আধুনিকায়নের একটি সুস্পষ্ট প্রচেষ্টা দৃশ্যমান হয়েছে। তারপরও বাংলাদেশে একটি আধুনিক, কল্যাণমুখী, দক্ষতাকেন্দ্রিক ও আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা গড়ে তুলতে হলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন বলে মনে করি।

প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা: চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষার একটি অপরিহার্য অঙ্গ হয়ে উঠেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডাটা সায়েন্স, রোবোটিক্স এবং ডিজিটাল প্রযুক্তি আজকের বিশ্বের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের কাঠামো পরিবর্তন করছে। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। অনলাইন শিক্ষা, স্মার্ট ক্লাসরুম, ডিজিটাল ল্যাবরেটরি এবং গবেষণাসিত্তিক শিক্ষা চালু করা হলে শিক্ষাব্যবস্থা বিদ্যমান জড়তা কাটাতে সক্ষম হবে। করোনা-পরবর্তী মহামারির সময় অনলাইন শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করেছিল। দৈনিক কালের কণ্ঠ ১৭ আগস্ট ২০১৪ এর একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে ডিজিটাল শিক্ষা এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার প্রসার বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকীকরণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে তদারকিপনা এবং শিক্ষার মানবিক মূল্যবোধ রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মনে রাখতে হবে, প্রযুক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি মানবিক শিক্ষা এবং নৈতিক মূল্যবোধ বজায় রাখা জরুরি।

কারিগরি ও কর্মমুখী শিক্ষা: বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য দক্ষ জনশক্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, সাধারণ শিক্ষার তুলনায় কারিগরি শিক্ষার শিক্ষার্থীর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম। অথচ শিল্পায়ন ও প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতিতে কারিগরি ও কর্মমুখী শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। দৈনিক যুগান্তর-এর ১৪ মার্চ ২০২৩-এর একটি মতামতে নিবন্ধে বলা হয়েছে, কর্মসংস্থানমুখী শিক্ষা সম্প্রসারণের মাধ্যমে বেকারত্ব কমানো সম্ভব। সরকার যদি কারিগরি শিক্ষা সম্প্রসারণ এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্যোক্তা হওয়ার মানসিকতা তৈরি করতে পারে, তবে দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা সম্ভব হবে। এতে বেকারত্ব কমবে এবং দেশের অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে।

উচ্চশিক্ষা, গবেষণা ও উদ্ভাবন: বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা খাত দ্রুত সম্প্রসারিত হয়েছে। বর্তমানে দেশে বহু সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে যারা গবেষণা ও উচ্চশিক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে, তবে এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা তহবিল ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সীমিত। ফলে আন্তর্জাতিক র‍্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখনও পিছিয়ে রয়েছে। দৈনিক প্রথম আলোর ২ নভেম্বর ২০১৮-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গবেষণায় পর্যাপ্ত অর্থায়নের অভাবে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষায় স্থবিরতা দেখা দিচ্ছে। একটি আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো গবেষণা ও উদ্ভাবনকে গুরুত্ব দেওয়া। উন্নত দেশগুলোতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শুধু শিক্ষা প্রদানই করে না; বরং নতুন জ্ঞান সৃষ্টি এবং প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। অন্য একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন ও গবেষণাগারভিত্তিক শিক্ষার পরিবর্তে পাঠ্যবইভিত্তিক শিক্ষা বেশি গুরুত্ব পায়। বাংলাদেশে গবেষণার সুযোগ ও পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ খুবই সামান্য। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে গবেষণার অর্থায়ন বাড়াতে হলে পর্যাপ্ত অর্থায়ন, আধুনিক ল্যাবরেটরি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রয়োজন। একইসঙ্গে শিক্ষার্থীদের গবেষণায় উৎসাহিত করার জন্য উপযুক্ত সংস্কার এবং পরিবেশ তৈরি করা জরুরি।

শিক্ষার মান ও পেশাগত দক্ষতা: শিক্ষাব্যবস্থার মান অনেকাংশে নির্ভর করে শিক্ষকদের দক্ষতার ওপর। একজন দক্ষ শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের জ্ঞান অর্জনে অনুপ্রাণিত করতে পারেন এবং তাদের সৃজনশীলতা বিকাশে সহায়তা করতে পারেন। তাই শিক্ষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, পেশাগত উন্নয়ন এবং সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দৈনিক সমকাল-এর ৪ জুলাই ২০১৪-এর একটি বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, আধুনিক শিক্ষাপদ্ধতি সম্পর্কে শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধি করা জরুরি। বাংলাদেশে অনেক শিক্ষক এখনও আধুনিক শিক্ষাপদ্ধতির সঙ্গে পুরোপুরি পরিচিত নন। এজন্য শিক্ষক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি সম্প্রসারণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাপদ্ধতির ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

শিক্ষাবৈষম্য দূর করা: বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় শহর ও গ্রামের মধ্যে একটি বড় বৈষম্য রয়েছে। অনেক গ্রামীণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত শিক্ষক, ল্যাবরেটরি এবং প্রযুক্তিনির্ভর সুবিধা নেই। ফলে শিক্ষার্থীরা সমান সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। দৈনিক কালের কণ্ঠ-এর ১৭ আগস্ট ২০১৪-এর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, অনেক গ্রামীণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত শিক্ষক ও প্রযুক্তিগত সুবিধা নেই। একটি আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে এই বৈষম্য দূর করা জরুরি। শিক্ষা অবকাঠামো উন্নয়ন, ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার এবং শিক্ষক নিয়োগের মাধ্যমে এই সমস্যা অনেকাংশে সমাধান করা সম্ভব।

শিক্ষা ও নারীর ক্ষমতায়ন: শিক্ষা নারীর ক্ষমতায়নের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। এই প্রসঙ্গে Malala Yousafzai বলেছেন- 'একটি শিশু, একটি শিক্ষক, একটি বই এবং একটি কলম-পৃথিবী পরিবর্তন করতে পারে।' বাংলাদেশে নারীশিক্ষায় অগ্রগতি সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় নারীর অংশগ্রহণ আরও বাড়ানো প্রয়োজন।

শিক্ষা বাজেট ও বিনিয়োগ: বাংলাদেশে শিক্ষাক্ষাতে সরকারি বিনিয়োগ এখনও আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় কম।


 বিশেষজ্ঞরা মনে করেন একটি দেশের শিক্ষাক্ষাতে জিডিপির কমপক্ষে ৪-৬ শতাংশ ব্যয় করা উচিত। কিন্তু বাস্তবে বাংলাদেশে এই হার অনেক কম। পর্যাপ্ত বাজেট না থাকলে অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষক নিয়োগ এবং গবেষণা কার্যক্রম সীমিত হয়ে পড়ে।

নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা: শিক্ষামন্ত্রণালয় সাম্প্রতিক সময়ে নতুন নেতৃত্বে একটি গতিশীল পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। শিক্ষামন্ত্রী দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিক, দক্ষতাকেন্দ্রিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করার লক্ষ্যে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। জাতীয় পত্র-পত্রিকা ও সম্পাদকীয় বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সরকারসহ সবমহলেই শিক্ষাক্ষাতে একটি সক্রিয় ও সংস্কারমুখী ধারা তৈরি হয়েছে। তবে শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর জন্য নিম্নলিখিত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপের প্রতি নজর দেওয়া জরুরি:

১) দীর্ঘমেয়াদি, স্থিতিশীল ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত জাতীয় শিক্ষানীতি।

২) শিক্ষাক্ষাতে বাজেট ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি।

৩) ডিজিটাল প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) শিক্ষাব্যবস্থা।

৪) কারিগরি ও কর্মমুখী শিক্ষা সম্প্রসারণ।

৫) শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও পেশাগত উন্নয়ন নিশ্চিত করা।

৬) গ্রামীণ ও শহরে শিক্ষার বৈষম্য কমানো।

৭) শিক্ষায়াত প্রযুক্তিগত অবকাঠামো উন্নয়ন।

৮) ডিজিটাল শিক্ষা প্ল্যাটফর্ম উন্নয়ন।

৯) বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণা ও উদ্ভাবনের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা।

১০) আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি (গবেষণা সহযোগিতা, এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রাম ইত্যাদি)।

১১) মেধাস্বত্ব অধিকার নিশ্চিত করা।


ইতিমধ্যে উত্থাপিত প্রস্তাবের অনেকগুলো নতুন সরকারের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। তবে এসব উদ্যোগের সফলতা নির্ভর করবে কার্যকর বাস্তবায়ন, পর্যাপ্ত অর্থায়ন এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতার ওপর। তাই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও ধারাবাহিক নেতৃত্ব বজায় রাখাই হবে আগামী দিনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশ একটি সম্ভাবনাময় দেশের নাম। দেশের তরুণ জনগোষ্ঠীই এই সম্ভাবনার সবচেয়ে বড় শক্তি। কিন্তু এই শক্তিকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে হলে একটি আধুনিক, দক্ষতা ভিত্তিক এবং গবেষণামুখী শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা অপরিহার্য। শিক্ষা কেবল একটি খাত নয়; এটি একটি জাতির ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ভিত্তি।

বাংলাদেশ আজ একটি পরিবর্তনের মুখে প্রবেশ করেছে। প্রযুক্তি ও জ্ঞানের এই যুগে শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিক ও যুগোপযোগী করা ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। যদি বাংলাদেশ একটি বিজ্ঞানভিত্তিক, প্রযুক্তিনির্ভর এবং দক্ষতামুখী শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে, তবেই ভবিষ্যতে একটি শক্তিশালী জ্ঞানভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে। শিক্ষা একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার। তাই আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়; বরং শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং সমাজের সকল অংশের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে তা বাস্তবায়ন করতে হবে।

লেখক: প্রফেসর ড. চৌধুরী মোহাম্মদ মনিরুল হাসান গবেষক ও শিক্ষাবিদ; প্রফেসর, ফলিত রসায়ন ও রাসায়নিক প্রকৌশল বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।