তামাক বিষে নীল ঝিনাইদহের কৃষি জমি; কমছে মৌসুমী ফসলের চাষ
মোঃ আসাদুজ্জামান, বিশেষ প্রতিনিধি :
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলা ঝিনাইদহে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে তামাক চাষ।
সম্প্রতি, একটি বিশেষ অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এমনই ভয়াবহ তথ্য। তামাক কোম্পানিগুলোর নানামুখী প্রলোভন ও নামমাত্র সুবিধায় ঝিনাইদহের ছয়টি উপজেলার বিভিন্ন স্থানে কৃষকেরা প্রতি বছর নতুন করে তামাক চাষে উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন। তবে সদর, হরিণাকুণ্ডু ও মহেশপুর উপজেলায় তা ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে জানিয়েছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর।
ঝিনাইদহ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ২০২৩-২০২৪ বছরে জেলায় তামাক চাষ হয়েছিল সর্বমোট ১৯৩ হেক্টর জমিতে। পরের বছর অর্থাৎ ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে তামাক চাষ হয়েছে ২২৯ হেক্টর জমিতে, উৎপাদন হয়েছিল ৫৫২ মেট্রিক টন তামাক। এবছর ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে তামাক চাষ হয়েছে ২২২ হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে সদর উপজেলায় ২১ হেক্টর, মহেশপুরে ১০ হেক্টর, শৈলকুপায় ১৫ হেক্টর এবং হরিনাকুন্ডুতে সবচেয়ে বেশি ১৭৬ হেক্টর জমিতে তামাকের চাষ হয়েছে। বিভিন্ন তথ্য ও অনুসন্ধান বলছে, এসকল জমিতে একসময় চাষ হতো ধানসহ অন্যান্য মৌসুমী ফসল।
অপরদিকে, অধিক কীটনাশক প্রয়োগ, তামাক পাতা ও গাছের নিবিড় সংস্পর্শ এবং রাত জেগে তামাক পাতা জ্বালানিতে রয়েছে মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকি। গবেষণা বলছে, তামাক চাষিদের মধ্যে ক্যানসার, অ্যাজমা, চর্মরোগ, শ্বাসকষ্ট সহ নানাপ্রকার সংক্রামক রোগ ছড়াচ্ছে প্রতিনিয়ত। আবার, তামাক চাষে কৃষি জমিতে অতিরিক্ত সার-কীটনাশক প্রয়োগের ফলে কমে যাচ্ছে জমির স্বাভাবিক উর্বরতা। এদিকে, তামাক পাতা জ্বালাতে প্রয়োজন হয় অতিরিক্ত জ্বালানি খড়ি। সংগত কারণেই, চাষিরা প্রতি বছর পরিবেশ অধিদপ্তরের কোনপ্রকার নিয়মের তোয়াক্কা না করেই বনকে বন উজাড় করে চলেছে, যা জলবায়ু পরিবর্তনে মূখ্য ভূমিকা পালন করছে।
ইতিহাস বলে, বৃটিশরা বাংলা অঞ্চলের বিশাল সমতল ভূমির অতি উর্বরতা দেখেই, একদিন এই সবুজ-শ্যামল বাংলায় আস্তানা গেড়েছিল। পরবর্তীতে, নিজেদের স্বার্থ সিদ্ধির জন্য দূর্গ স্থাপন এবং সিরাজুদ্দৌলার পতনের মধ্যে দিয়ে ভারতবর্ষে বৃটিশ শাসন কায়েম ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে ঘৃণিত ও করুণ প্রতিচ্ছবি। ধীরে ধীরে তারা ধ্বংস করেছিল আমাদের কুটির শিল্প ও কৃষি খাত। নীল চাষের মাধ্যমে তারা বাংলা অঞ্চলের উর্বর ভূমির পবিত্রতা বিনষ্ট করতেও সেদিন কার্পণ্য করেনি। ফসলি জমিগুলো এক সময় নীল অত্যাচারের সাক্ষী হয়েছিল, নিদারুণ সব করুণ যাতনায়। ফলে, বাঙালি খাদ্যে হারিয়েছিল স্বয়ংসম্পূর্ণতা। কত শত তাজা প্রাণের বিনিময়ে নীল চাষ বন্ধ হলেও, বাংলার চাষীদের কপাল থেকে দুর্ভাগ্যের রাজটীকা আজও মুছে যায়নি। আজকের দিনে তামাক চাষ যেন তারই জ্বলন্ত সাক্ষী!
গবেষণা বলছে, বহুকাল পরে এসে বাংলার মাটিতে নীল অত্যাচারের আধুনিক প্রতিবিম্ব হয়ে উঠেছে তামাক চাষ। শাসক পরিবর্তিত হলেও, শোষণের তীব্রতা কিন্তু সেই আগের মতোই চলমান রয়েছে। এক সময় রাস্তার দুপাশ জুড়ে থাকা বিস্তীর্ণ সমতল ভূমিতে প্রচুর পরিমাণে মৌসুমি ফসল উৎপাদন করা হতো। শীতকালীন শাক-সবজি চাষের জন্য অত্র এলাকার সুনাম আজ অবধি লোক মুখে মুখে প্রচলিত। "মাছে-ভাতে বাঙালি" প্রবাদটি আজ কেবলই পাঠ্য বইয়ে সীমাবদ্ধ! কিন্তু, দুর্ভাগ্য জনক হলেও সত্য, যে সকল জমিতে এক সময় সোনার ফসল ফলতো, তা এখন কেবলই তামাক চাষের লীলাভূমি। সংগত ও যৌক্তিক কারণে লাভজনক হওয়ায়, কৃষকেরাও এখন তামাক চাষেই অতি আগ্রহী। সেইসাথে তামাক কোম্পানিগুলোর প্রলোভন নামক অনুদান তো রয়েছেই। অন্যান্য ফসল চাষে প্রণোদনা বা ভর্তুকি না মিললেও, তামাক চাষে তা হাতের নাগালেই মিলে যাচ্ছে। ফলে ধান, গম, ছোলা, মসুরি, আখ, পেঁয়াজ, রসুন কিংবা কাঁচা মরিচের চাষাবাদ আজকাল আগের মতো চোখে পড়ে না। সেদিনের ফসলি জমিগুলোতে এখন কেবলই নীলের মতো করে নবরূপে তামাক চাষ করা হচ্ছে।
ঝিনাইদহ সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নূরে নবী বলেন,
"আমরা প্রতিনিয়ত কৃষকদের তামাক চাষে অনুৎসাহিত করছি। তামাকের ক্ষতিকর দিকগুলো তুলে ধরছি। তামাক মৌসুমে বোরোধান চাষেও নিয়মিত উদ্বুদ্ধ করে যাচ্ছি। তবে, দুঃখজনক বিষয় হলো, তামাক কোম্পানিগুলোর অতি বিনিয়োগে কৃষকেরা সেদিকেই বেশি ঝুঁকছেন। এতকিছুর পরেও, আমরা সরকারের পক্ষ থেকে আরও বেশি কার্যকরী উদ্যোগ নিয়ে তামাক চাষ তুলনামূলক হারে কমিয়ে আনার চেষ্টা করে যাচ্ছি।"
তামাক চাষ সম্পর্কে বেশ কয়েকজন চাষি বলেন,
"অন্যান্য ফসলের তুলনায় তামাক চাষে লাভ বেশি হয়। তামাকে ক্ষতি আছে, তা সবাই জানে। কিন্তু, আমরা তো গরীব মানুষ। দিনশেষে আমাদের টাকাটাই দরকার। তামাক চাষে একসাথে মোটা অঙ্কের নগদ টাকা পাওয়া যায়।"
এদিকে, সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এক বিঘা জমিতে প্রায় ৫০০-৬০০ কেজি তামাক উৎপাদন হয়। গতবছর কোম্পানি ২২৬ টাকা দরে প্রতি কেজি তামাক কেনে কৃষকের কাছ থেকে। এবছরও প্রতি কেজি তামাকের মূল্য বেশ ভালো। ফলে, দিনশেষে কাঁচা টাকার লোভেই ঝুকিপূর্ণ তামাক চাষে উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন বাংলার অধিকাংশ কৃষক।
হরিণাকুণ্ডু উপজেলার রোকন নামে এক তামাক চাষি জানান, আমার নিজের জমি না থাকলেও, এবছর পাঁচ বিঘা জমি লিজ্ নিয়ে তামাক চাষ করেছি। তামাক চাষে পরিশ্রম অনেক, ঝুঁকিও আছে। কিন্তু, দিনশেষে মোটা অংকের টাকা পাওয়া যায়। অন্য কোন চাষে এত লাভ হয় না।
এদিকে, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জমির মালিক জানান, সারা বছরের জন্য জমি লিজ দিলে ১৫-২০ হাজার টাকা পাওয়া যায়। সেখানে তামাক চাষে ৪/৫ মাসের জন্য জমি লিজ দিয়ে বিঘাপ্রতি ২৫-৩০ হাজার টাকা পাওয়া যায়। বাকি সময় নিজে চাষ করি। তামাক চাষে জমি দিয়ে অল্প সময়ে অনেক বেশি টাকা পাওয়া যায়।
ঝিনাইদহ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. কামরুজ্জামান বাংলাদেশ মেইল.নিউজকে বলেন, "কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে কৃষকদের সবসময়ই তামাক চাষে নিরুৎসাহিত করা হয়। তামাকের ক্ষতিকর দিকগুলো সম্পর্কে কৃষকদের অবহিত করা ও বিকল্প চাষ হিসেবে ক্যাপসিকাম, ড্রাগন, রঙিন ফুলকপি ও বাঁধাকপি সহ উচ্চমূল্যের সবজি ও ফল চাষের পরামর্শ দিচ্ছি। তামাকের ভয়াবহতা থেকে কৃষি ও কৃষকে বাঁচাতে সকল প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর।"
তামাক চাষের ভয়াবহতা প্রতিরোধ সম্পর্কে কৃষিবিদেরা বলছেন,
"যদি বাংলাদেশকে খাদ্যে স্বনির্ভর করতেই হয়, তবে কৃষি জমিতে আবারও ফসল ফলাতে হবে। পলি বিধৌত লাল-সবুজের উর্বর বাংলা ভূমির সঠিক ব্যবহার করতে পারলেই কেবল খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করা সম্ভব। এক্ষেত্রে, কৃষিতে বিপ্লব ঘটানোর কোন বিকল্প নেই। কৃষক বাঁচলে, দেশ বাঁচবে। সরকারের উচিত অধিক ভর্তুকি ও প্রণোদনা দিয়ে কৃষককে বিভিন্ন ফসল ফলাতে উদ্বুদ্ধ করা।"
কিন্তু, এতকিছুর পরেও থেমে নেই তামাক চাষ। একদিকে যেমন তামাক বিষে নীল হচ্ছে বাংলার কৃষি জমি, অপরদিকে মারাত্মক হারে বাড়ছে স্বাস্থ্য ঝুঁকি। পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করে প্রতিনিয়ত উজাড় হচ্ছে বনকে বন। ফলে, দেশে খাদ্য সংকট মোকাবিলা, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা ও পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করছেন সমাজের সচেতন মহল।









