একই গন্তব্যে পৌঁছালেও সবার পথ এক নয়

প্রকাশিত: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:২৩ পিএম
একই গন্তব্যে পৌঁছালেও সবার পথ এক নয়

সূত্রঃ ফাইল ছবি

মানুষ সাধারণত সান্ত্বনা খোঁজে, সফলতা খোঁজে, জীবনের সুন্দর পরিণতিটুকু খোঁজে। কারও জীবনে যখন সাফল্যের আলো জ্বলে ওঠে, তখন আমরা সেই আলোই দেখতে পাই। কিন্তু সেই আলোর পেছনে কত রাতের অন্ধকার ছিল, কত নিঃশব্দ কান্না ছিল, কত অপমান গিলে সামনে এগোতে হয়েছিল— সেই হিসাবটা খুব কম মানুষই জানতে চায়।


কারও হাতে যখন সাফল্য এসে ধরা দেয়, আমরা তাকে ভাগ্যবান বলি। বলি, তার সময় ভালো ছিল, সুযোগটা সে ঠিক সময়ে পেয়েছে, ভাগ্য তাকে সহায়তা করেছে। অথচ একই পৃথিবীতে এমন মানুষও আছে, যাদের কাছে একটি ছোট সাফল্যও সহজে আসেনি। তাদের প্রতিটি অর্জনের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ অপেক্ষা, নির্ঘুম রাত, ব্যর্থতার পর আবার উঠে দাঁড়ানোর সাহস, মানুষের অবহেলা আর নিজের সঙ্গে নিজের কঠিন লড়াই।


পেয়ে যাওয়া আর পুড়ে পুড়ে কিছু তৈরি করা— দুটো কখনোই এক কথা নয়।


কেউ হয়তো একটি সুযোগ পেয়েই নিজের জীবন বদলে ফেলতে পারে। আর কাউকে সেই একই জায়গায় পৌঁছানোর জন্য দিনের পর দিন, বছরের পর বছর নিজের সীমাবদ্ধতার সঙ্গে যুদ্ধ করতে হয়। কেউ হয়তো প্রস্তুত মঞ্চে উঠে করতালির শব্দ শুনতে পায়; আর কেউ মঞ্চে ওঠার আগেই অসংখ্যবার নিজের ভেতরে ভেঙে পড়ে আবার নিজেকেই জোড়া লাগায়।


জীবনের সবচেয়ে বড় যুদ্ধগুলো অনেক সময় নিঃশব্দে হয়।


সেখানে কোনো দর্শক থাকে না।

কোনো সংবাদ শিরোনাম হয় না।

কেউ করতালি দেয় না।

কেউ এসে বলে না— “তুমি অনেক কষ্ট করেছ।”


শুধু মানুষটি নিজেই জানে, কতটা পথ তাকে হেঁটে আসতে হয়েছে।


আমরা প্রায়ই একজন মানুষের বর্তমান দেখে তার বিচার করি। তার পোশাক দেখি, তার অবস্থান দেখি, তার সাফল্য দেখি, তার পরিচিতি দেখি। কিন্তু তার হৃদয়ের ভেতর জমে থাকা পোড়াগুলো দেখি না। যে মানুষটি আজ হাসিমুখে কথা বলছে, হয়তো গতরাতে সে নিজের ব্যর্থতার সঙ্গে যুদ্ধ করেছে। যে মানুষটি আজ আত্মবিশ্বাসী, হয়তো একসময় তার ওপর এত অপমান ছুড়ে দেওয়া হয়েছিল যে নিজের যোগ্যতা নিয়েই তার সন্দেহ তৈরি হয়েছিল।


কিন্তু মানুষ বদলায়।


কখনো কখনো অপমানই মানুষকে শক্ত করে। প্রত্যাখ্যান তাকে শেখায় নিজের মূল্য বুঝতে। ব্যর্থতা তাকে শেখায় কোথায় ভুল ছিল। একাকিত্ব তাকে শেখায় নিজের সঙ্গে থাকতে। আর দীর্ঘ অপেক্ষা তাকে শেখায়- সবকিছু দ্রুত পাওয়া যায় না।


জীবনের কিছু অর্জন আছে, যেগুলোর মূল্য টাকা দিয়ে মাপা যায় না। কারণ সেই অর্জনের সঙ্গে মিশে থাকে অসংখ্য ত্যাগ।


একজন মানুষ যখন নিজের স্বপ্নের জন্য দিন-রাত এক করে কাজ করে, তখন তার কাছে প্রতিটি ছোট অগ্রগতি বড় হয়ে ওঠে। অন্যের কাছে যে বিষয়টি সামান্য, তার কাছে সেটিই হয়তো বহু বছরের অপেক্ষার ফল। তাই কারও সাফল্য দেখে শুধু ফলাফলটি দেখলে ভুল হবে; দেখতে হবে তার পথটাও।


কারণ একই গন্তব্যে পৌঁছালেও সবার পথ এক নয়।


কেউ মানুষের ভালোবাসা পায়, কেউ মানুষের অবহেলা।

কেউ উৎসাহ পায়, কেউ শুনতে থাকে— “তোমার দ্বারা হবে না।”

কেউ দরজা খোলা পায়, আর কেউ দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ শুনেও জানালার পথ খুঁজে নেয়।


আমি সেই মানুষগুলোর পাশে থাকতে চাই, যারা রোদে পুড়েও পথ ছাড়েনি।


আমি সেই মানুষগুলোর গল্প বলতে চাই, যাদের শরীরে হয়তো কোনো ক্ষত নেই, কিন্তু হৃদয়ের ভেতরে অসংখ্য যুদ্ধের দাগ রয়েছে। যারা অপমানকে প্রতিশোধের ভাষায় নয়, নিজেদের প্রতিষ্ঠার ভাষায় উত্তর দিতে চায়। যারা পড়ে গিয়ে অন্যকে দোষ না দিয়ে আবার উঠে দাঁড়াতে জানে।


বাস্তবতা আমাদের অনেক ভাবে বেঁধে রাখতে চায়।


কখনো অর্থের অভাব দিয়ে, কখনো পারিবারিক চাপ দিয়ে, কখনো সামাজিক অবস্থান দিয়ে, কখনো মানুষের তুচ্ছতাচ্ছিল্য দিয়ে। কখনো এমন মানুষও আমাদের থামিয়ে দিতে চায়, যাদের কাছ থেকেই আমরা সবচেয়ে বেশি ভালোবাসা ও সমর্থন আশা করেছিলাম।


কিন্তু জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়গুলোই কখনো কখনো আমাদের সবচেয়ে শক্ত সংস্করণটিকে তৈরি করে।


অপমানের দড়ি যদি কেউ আমাদের বেঁধেও রাখতে চায়, তবু সেই দড়িকে চিরস্থায়ী মনে করার কোনো কারণ নেই। কারণ মানুষের সামর্থ্য তার বর্তমান অবস্থান দিয়ে নির্ধারিত হয় না। আজ যে মানুষটি পিছিয়ে আছে, সে আগামীকাল কতদূর যাবে— তা কেউ জানে না।


তাই অন্যের সাফল্য দেখে নিজের ব্যর্থতাকে ছোট করার প্রয়োজন নেই।


তোমার পথ যদি দীর্ঘ হয়, তবে তোমার গল্পও হয়তো দীর্ঘ হবে। তোমার অপেক্ষা যদি বেশি হয়, তবে তোমার অর্জনের অনুভূতিও হয়তো অন্যরকম হবে। যে মানুষটি কিছু পেতে অনেক কেঁদেছে, সে পাওয়া জিনিসটির মূল্য অন্যদের চেয়ে গভীরভাবে বোঝে।


আমি ভাগ্যের ওপর বিশ্বাস করি, কিন্তু শুধু ভাগ্যের ওপর নির্ভর করতে চাই না।


কারণ ভাগ্য দরজা খুলে দিতে পারে, কিন্তু সেই দরজা দিয়ে হাঁটতে হয় মানুষকেই। সুযোগ সামনে আসতে পারে, কিন্তু সেটিকে বাস্তবে পরিণত করার জন্য পরিশ্রম প্রয়োজন। স্বপ্ন দেখা সহজ; স্বপ্নের দায় বহন করা কঠিন।


আর সেই কঠিন পথটাই আমি বেছে নিতে চাই।


রোদে ঝলসানো মানুষের দলে থাকতে চাই। তাদের দলে, যারা আরামের চেয়ে সংগ্রামকে ভয় পায় না। যারা জানে— জীবন সবসময় ন্যায্য হবে না, তবুও নিজের দায়িত্ব থেকে সরে যাওয়া যাবে না। যারা জানে— সবাই পাশে থাকবে না, তবুও পথ চলা থামানো যাবে না।


কারণ শেষ পর্যন্ত মানুষ তার প্রাপ্তির জন্য যতটা স্মরণীয় হয়, তার চেয়েও বেশি স্মরণীয় হয়— সে কীভাবে সেখানে পৌঁছেছিল।


হয়তো আমার পথেও অনেক বাধা থাকবে। হয়তো সামনে আরও অপমান আসবে, আরও প্রত্যাখ্যান আসবে, আরও ব্যর্থতা আসবে। হয়তো অনেকেই বলবে— “এটা সম্ভব নয়।”


তবু আমি চেষ্টা করে যেতে চাই।


কারণ আমি জানি, জীবনের সবচেয়ে সুন্দর গল্পগুলো অনেক সময় শুরু হয় এমন একটি জায়গা থেকে, যেখানে চারপাশের সবাই বলে— “তোমার কিছু হবে না।”


আমি সেই “কিছু হবে না”কে নিজের শেষ পরিচয় বানাতে চাই না।


আমি চাই, আমার পরিচয় হোক আমার চেষ্টা দিয়ে।


যে মানুষটি পড়ে গিয়ে উঠে দাঁড়ায়, তার শরীর হয়তো ধুলোয় ভরে যায়; কিন্তু তার চোখে তখন নতুন এক আলো জন্ম নেয়। সেই আলো সবার চোখে ধরা পড়ে না। কিন্তু একদিন সেই আলোই হয়তো তার পথ দেখাবে।


তাই আজ যারা সংগ্রাম করছেন, তাদের বলি— নিজের কষ্টকে তুচ্ছ ভাববেন না। আপনার নির্ঘুম রাতগুলো বৃথা যাচ্ছে না। আপনার নীরব কান্না, আপনার ব্যর্থতার পর আবার শুরু করা, আপনার একা একা লড়াই— সবকিছুরই মূল্য আছে।


হয়তো আজ কেউ দেখছে না।


হয়তো আজ কেউ বিশ্বাস করছে না।


হয়তো আজ আপনার হাতে সাফল্যের কোনো প্রমাণ নেই।


তবুও পথ চলুন।


কারণ যে মানুষটি আগুনের মধ্য দিয়ে হাঁটতে শেখে, সে একদিন নিজের আলো নিজেই তৈরি করতে পারে।


আর আমি সেই মানুষগুলোর মধ্যেই থাকতে চাই— যারা জীবনের রোদে পুড়েছে, অপমান সহ্য করেছে, ব্যর্থতার স্বাদ পেয়েছে, তবুও স্বপ্ন দেখা বন্ধ করেনি।


কারণ পেয়ে যাওয়ার গল্প অনেকের থাকে; কিন্তু পুড়ে পুড়ে কিছু দাঁড় করানোর গল্পই মানুষকে সত্যিকারের মানুষ করে তোলে।


পোড়া হৃদয়ের মানুষগুলোর গল্প কেউ দেখে না, দেখে সফলতা। 


ওমায়ের আহমেদ শাওন 

(লেখক ও গণমাধ্যম বিশ্লেষক)