চট্টগ্রামে হামের সংক্রমণ উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে, বেশিরভাগ রোগীর জটিলতা হিসেবে নিউমোনিয়া

প্রকাশিত: ০১ এপ্রিল ২০২৬, ০১:০২ এএম
চট্টগ্রামে হামের সংক্রমণ উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে, বেশিরভাগ রোগীর জটিলতা হিসেবে নিউমোনিয়া

মোহাম্মদ ইব্রাহিম, চট্টগ্রাম প্রতিনিধি:

চট্টগ্রাম বিভাগে হামের সংক্রমণ নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে কক্সবাজার, চাঁদপুর ও কুমিল্লা জেলায় রোগীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে বলে স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যে জানা গেছে।

‎বিভাগীয় স্বাস্থ্য দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত চট্টগ্রাম বিভাগে মোট ৯৫ জন রোগী হামে আক্রান্ত হয়েছেন। এর মধ্যে কক্সবাজারে ২৮ জন, চাঁদপুরে ১২ জন, কুমিল্লায় ১৮ জন এবং চট্টগ্রাম জেলায় দুজন বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। একই সঙ্গে উপসর্গ নিয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে আরও বেশ কয়েকজন রোগী ভর্তি রয়েছেন।

‎স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, সাম্প্রতিক সময়ে হামের জটিলতা হিসেবে নিউমোনিয়ার সংক্রমণ বেশি দেখা যাচ্ছে, যা পরিস্থিতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে আক্রান্তের হার বেশি এবং অনেক ক্ষেত্রে রোগীরা গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে আসছেন।

‎চিকিৎসা সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েকদিনে শুধু চট্টগ্রাম নগরের কয়েকটি হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে অন্তত পাঁচ শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। পাশাপাশি প্রায় ২৫ শিশু বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে এবং ছয়জন আইসিইউতে সংকটাপন্ন অবস্থায় চিকিৎসাধীন।

‎চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সূত্র জানায়, বর্তমানে সেখানে হাম ও নিউমোনিয়ার উপসর্গ নিয়ে ১২ শিশু ভর্তি রয়েছে। এর আগে আরও ১৩ জন ভর্তি হয়েছিল, যাদের মধ্যে ১৫ মাস বয়সী এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ রোগীর চাপ বিবেচনায় ডেঙ্গু কর্নারকে সাময়িকভাবে ‘হাম কর্নার’ হিসেবে ব্যবহার করছে।

‎বেসরকারি মা ও শিশু হাসপাতালসহ নগরের একাধিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রেও একই ধরনের চাপ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। গত ১০ দিনে সেখানে তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গেছে। বর্তমানে ছয়জন শিশু আইসিইউতে চিকিৎসাধীন, যাদের মধ্যে একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।

‎চট্টগ্রাম ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও তিনজন শিশু ভর্তি হয়েছিল, যাদের মধ্যে একজন মারা গেছে এবং দুইজন চিকিৎসাধীন রয়েছে। অন্যদিকে চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল, বোয়ালখালী ও হাটহাজারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও একাধিক শিশু চিকিৎসা নিচ্ছে।

‎চিকিৎসকরা বলছেন, হামের পর সবচেয়ে বড় ঝুঁকি তৈরি করছে নিউমোনিয়া ও অন্যান্য জটিলতা। ছয় মাস থেকে তিন বছর বয়সী শিশুরাই বেশি আক্রান্ত হচ্ছে, বিশেষ করে যেসব শিশু টিকা গ্রহণ করেনি তারা বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।

‎চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ মুছা মিঞা জানান, গত এক সপ্তাহ ধরে নিয়মিত রোগী আসছে। বর্তমানে ভর্তি থাকা শিশুদের মধ্যে একজন মারা গেছে এবং ১২ জন চিকিৎসাধীন রয়েছে।

‎বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. সেখ ফজলে রাব্বি বলেন, হামের রোগীরা অনেক সময় অন্যান্য জটিলতায়ও মারা যেতে পারে। ল্যাব পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়া চাঁদপুরের দুই শিশু ঢাকায় মারা গেছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তিনি জানান, রোগটি অত্যন্ত সংক্রামক এবং দ্রুত ছড়াতে সক্ষম।

‎স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করা হচ্ছে। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হাম রোগীদের জন্য আলাদা কর্নার চালু করা হয়েছে।

‎স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কোভিড-১৯ মহামারির সময় টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় অনেক শিশু প্রয়োজনীয় টিকার আওতার বাইরে থেকে গেছে, যার ফলেই এ ধরনের প্রাদুর্ভাব দেখা দিচ্ছে। তারা দ্রুত ও ব্যাপক টিকাদান কর্মসূচি জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন, অন্যথায় পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করতে পারে।