সিংগাইরে নায়েব ফরিদের বিরুদ্ধে ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ, টাকা ছাড়া মেলে না ভূমিসেবা!

প্রকাশিত: ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ০২:১৫ পিএম
সিংগাইরে নায়েব ফরিদের বিরুদ্ধে ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ, টাকা ছাড়া মেলে না ভূমিসেবা!

ফাইল ছবি

সোহরাব হোসেন, সিংগাইর (মানিকগঞ্জ) প্রতিনিধি


মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার সায়েস্তা ইউনিয়ন ভূমি অফিসে নামজারি (খারিজ) ও ভূমি উন্নয়ন কর দিতে গিয়ে ঘুষ, হয়রানি ও অসদাচরণের শিকার হওয়ার অভিযোগ তুলেছেন সেবাপ্রার্থীরা। এসব অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন ইউনিয়ন উপ-সহকারী ভূমি কর্মকর্তা (নায়েব) মো. ফরিদ হোসেন। অভিযোগ, ঘুষ ছাড়া ফাইল নড়ে না, আর মোটা অঙ্কের টাকা দিলে কাগজপত্রে ত্রুটি থাকলেও দ্রুত সম্পন্ন হয় নামজারির কাজ।


ভুক্তভোগীদের দাবি, দালালের মাধ্যমে কাজ না করালে ওই ভূমি অফিসে সাধারণ সেবাপ্রার্থীদের নানা হয়রানির মুখে পড়তে হয়। ঘুষ না দিলে মাসের পর মাস আটকে থাকে আবেদন। এমনকি একই জমি একাধিক ব্যক্তির নামে নামজারি করে দেওয়ারও অভিযোগ উঠেছে ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।


স্থানীয়দের অভিযোগ, দিন দিন ভূমি অফিসটিতে দালালদের দৌরাত্ম্য বাড়ছে। নায়েবের সঙ্গে তাঁদের সখ্য থাকায় দালালদের মাধ্যমে আসা কাজ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সম্পন্ন করা হয়। অন্যদিকে, স্থানীয় বাসিন্দা হওয়ায় প্রভাব খাটিয়ে সেবাপ্রার্থীদের সঙ্গে অসদাচরণ করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে ফরিদ হোসেনের বিরুদ্ধে। এতে সাধারণ মানুষ ভূমিসেবা নিতে গিয়ে নিয়মিত হয়রানির শিকার হচ্ছেন।


একাধিক সেবাপ্রার্থীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নামজারির আবেদন করতে গেলে অনেকের কাছে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করা হয়। চাহিদামতো টাকা না দিলে কাগজপত্রে ত্রুটি দেখিয়ে আবেদন দিনের পর দিন ঝুলিয়ে রাখা হয়।


অভিযোগ রয়েছে, নায়েব ফরিদ হোসেন অফিসের দুটি কক্ষ ব্যবহার করেন। এর মধ্যে একটি কক্ষের দরজা বন্ধ করে ঘুষের টাকা লেনদেন করা হয়। এ সময় অন্য সেবাপ্রার্থীদের দীর্ঘক্ষণ বাইরে অপেক্ষা করতে হয়। এমনকি ঘুষের টাকার একটি অংশ উপজেলা ভূমি অফিসের কর্মকর্তাদের দিতে হয় বলেও আবেদনকারীদের কাছে দাবি করেন তিনি—এমন অভিযোগও করেছেন ভুক্তভোগীরা।


বৈরাগিরটেক গ্রামের মোসলেম উদ্দিন নামে এক বৃদ্ধ জানান, জমির নামজারি করতে দীর্ঘদিন ফরিদ নায়েবের কাছে ঘুরেও কাজ হয়নি তাঁর। পরে এক আত্মীয়ের মাধ্যমে তদবির করে নামজারি সম্পন্ন করতে হয়েছে। এর আগে ভূমি উন্নয়ন কর দিতে গেলে তাঁর কাছে ৫ হাজার টাকা দাবি করা হয়। পরে খাজনার রেজিস্টার বই যাচাই করে জানতে পারেন, তাঁর করের পরিমাণ মাত্র ১০০ টাকা। এরপর ওই ১০০ টাকা জমা দিয়েই রসিদ সংগ্রহ করেন তিনি।


শ্যামনগর গ্রামের রেবেকা বলেন, ‘আমি একজন অসুস্থ মানুষ। জমির নামজারির জন্য আবেদন করে এক মাস ধরে নায়েবের কাছে ঘুরছি। প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র জমা দিলেও নামজারি হচ্ছে না।’


লক্ষ্মীপুর গ্রামের জামাল হোসেন অভিযোগ করেন, পূর্ব সাহাপুর মৌজায় ২৩ শতাংশ জমি নামজারির জন্য আট মাস আগে ফরিদ হোসেনকে ৪৫ হাজার টাকা দেন তিনি। নামজারি সম্পন্ন হওয়ার পর ভূমি অফিসের ভলিউমে নিজের নামে জমির কোনো তথ্য পাননি। বরং একই জমি বালিয়াডাঙ্গী গ্রামের সাদেকুল ইসলামের নামে নামজারি করা হয়েছে বলে জানতে পারেন।


জামাল হোসেনের দাবি, জমির কাগজপত্রে কোনো ভুল ছিল না এবং জমিটি তাঁর দখলেই রয়েছে। বিষয়টি ফরিদ হোসেনকে জানালে তিনি সংশোধনের আশ্বাস দেন। তবে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তাঁকে ঘোরানো হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন জামাল।


চন্দননগর গ্রামের কামাল হোসেন জানান, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে সায়েস্তা মৌজার একটি জমির নামজারির আবেদন করেন তিনি। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ঠিক থাকলেও তাঁর ফাইলটি এখনো আটকে রয়েছে। ঘুষ না দেওয়ায় কাজ হচ্ছে না বলে দাবি তাঁর। অথচ ত্রুটিপূর্ণ কাগজপত্রের ক্ষেত্রেও মোটা অঙ্কের টাকা দিলে দ্রুত নামজারি হয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। এ কাজে ভূমি অফিসের সংশ্লিষ্ট দালাল, বিশেষ করে দলিল লেখকদের সহযোগিতা রয়েছে বলেও দাবি করেন কামাল।


তিনি আরও বলেন, একই মৌজার ঋষিবাড়ি গ্রামের দিনেশ নামে এক ব্যক্তি তাঁর জমির নামজারির কাজ দেখভালের দায়িত্ব দেন। দিনেশের বাবাকে নিয়ে কয়েকবার ভূমি অফিসে গিয়েও হয়রানির শিকার হতে হয়েছে। নামজারির জন্য ফরিদ তাঁর কাছে ৫০ হাজার টাকা দাবি করেন। ওই টাকা না দেওয়ায় ফাইলটি এখনো আটকে রয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।


পূর্ব লক্ষ্মীপুর মৌজার বাসিন্দা মবজেল জানান, লক্ষ্মীপুরের একটি জমির নামজারি করে দেওয়ার কথা বলে নায়েব ফরিদের সাবেক অফিস সহকারী শিবনাথ তাঁর কাছ থেকে ৩৫ হাজার টাকা নেন। বিষয়টি ফরিদও জানতেন বলে দাবি তাঁর। নামজারি সম্পন্ন হওয়ার পর প্রতিপক্ষকে আবার মিসকেস করার পরামর্শ দেওয়া হয়। এতে ওই জমি নিয়ে নতুন করে বিরোধ তৈরির আশঙ্কা করছেন তিনি।


নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কানাইনগর গ্রামের এক ব্যক্তি বলেন, তাঁর মায়ের নামে একটি জমির নামজারির জন্য নায়েব ফরিদ ২০ হাজার টাকা দাবি করেন। প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের মধ্যে শুধু ওয়ারিশ সনদ বাকি ছিল। ওই কর্মকর্তা তাঁকে বলেন, ২০ হাজার টাকা দিলে আর কিছু লাগবে না; ওয়ারিশ সনদ তিনি নিজেই তৈরি করে নেবেন। পরে কথামতো ২০ হাজার টাকা দেওয়ার পর অল্প সময়ের মধ্যেই কোনো শুনানি ছাড়াই নামজারি সম্পন্ন করে দেওয়া হয় বলে দাবি করেন ওই ব্যক্তি।


তিনি আরও জানান, বেগুনটিউরি গ্রামের তাঁর এক খালা ভূমি অফিসে হয়রানি এড়াতে এক দালালের শরণাপন্ন হন। পরে ওই দালালকে ৫০ হাজার টাকা দিয়ে জমির নামজারি করিয়ে নেন তিনি।


মোসলেবাদ গ্রামের ফকর উদ্দিন বলেন, তাঁর একটি জমির নামজারি ও জমাভাগের জন্য নায়েব ফরিদ হোসেন দেড় লাখ টাকা দাবি করেন। পরে তিনি ১০ হাজার টাকা দেন। বাকি টাকা দেওয়ার আগেই নিজে উপজেলা ভূমি অফিসে যোগাযোগ করে নামজারির কাজ সম্পন্ন করেন বলে জানান তিনি।


এদিকে, ভুক্তভোগীদের অনেকে টাকা দেওয়ার পরও প্রকাশ্যে অভিযোগ করতে রাজি নন। জমি নিয়ে ভবিষ্যতে জটিলতায় পড়ার আশঙ্কায় তাঁরা মুখ খুলতে ভয় পাচ্ছেন। তাঁদের দাবি, দালালদের সঙ্গে নায়েবের সখ্যতার কারণে তাঁদের মাধ্যমে আসা কাজগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দ্রুত সম্পন্ন করা হয়। ফলে সাধারণ সেবাপ্রার্থীরা বঞ্চিত হচ্ছেন কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে।


এসব অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত করে অভিযুক্ত নায়েব ফরিদ হোসেনের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।


অভিযোগের বিষয়ে জানতে নায়েব মো. ফরিদ হোসেনের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হয়। নামজারির জন্য টাকা গ্রহণ, ঘুষ লেনদেনে আলাদা কক্ষ ব্যবহার এবং দালালদের সঙ্গে সখ্যতাসহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। পরে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।


এ বিষয়ে সিংগাইর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. আল-আমিন কবির বলেন, ‘বিষয়টি খোঁজখবর নিয়ে দেখব। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’


সিংগাইর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খায়রুন্নাহার বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা নেই। আপনাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’