সিঁদুরের রঙে বিদায় দুর্গার, খাগড়াছড়িতে ‘আসছে বছর আবার হবে’ ধ্বনি

প্রকাশিত: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:১৮ পিএম
সিঁদুরের রঙে বিদায় দুর্গার, খাগড়াছড়িতে ‘আসছে বছর আবার হবে’ ধ্বনি

ছবি: বিডি মেইল

বিপ্লব তালুকদার, খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি


ঢাকের বাদ্যি, শঙ্খনাদ আর উলুধ্বনিতে মুখর মণ্ডপ। কোথাও দেবীর চরণে শেষ অঞ্জলি, কোথাও সিঁদুরের রঙে রাঙা মুখ। আনন্দ-উচ্ছ্বাসের মধ্যেও ছিল বিদায়ের বিষাদ। বিজয়া দশমীতে সিঁদুর খেলা ও নানা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে খাগড়াছড়িতে বিদায় জানানো হয়েছে দুর্গতিনাশিনী দেবী দুর্গাকে।


বুধবার (২১ অক্টোবর) সকাল থেকেই খাগড়াছড়ি জেলার বিভিন্ন পূজামণ্ডপে ভক্তদের ভিড় জমে। দশমীর বিহিত পূজা, অঞ্জলি ও দর্পণ বিসর্জনের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয় দেবীর শাস্ত্রীয় বিদায়পর্ব। এরপর বিবাহিত নারীরা সিঁদুর খেলায় মেতে ওঠেন। একে অপরের কপাল ও গালে সিঁদুর মাখিয়ে ভাগাভাগি করেন উৎসবের আনন্দ।


খাগড়াছড়ি কেন্দ্রীয় লক্ষ্মীনারায়ণ মন্দিরের পূজামণ্ডপেও ছিল ভক্তদের উপচে পড়া ভিড়। দেবীকে বরণ করতে নারীদের হাতে ছিল সিঁদুর, পান, ফুল ও মিষ্টির থালা। কারও হাতে ছিল শঙ্খ, প্রদীপ ও কলস। একে একে দেবীর মুখে মিষ্টি ছুঁইয়ে ও সিঁদুর পরিয়ে তাঁকে বিদায় জানান তাঁরা। ঢাকের বাদ্যি ও উলুধ্বনিতে মুখর হয়ে ওঠে পুরো মণ্ডপ প্রাঙ্গণ।


মন্দিরের পুরোহিত রতন চক্রবর্তী বলেন, “আজ দশমী পূজা, দেবীর বিদায়ের পালা। সকাল ৮টা ৫ মিনিটে আমরা দেবী দুর্গার দশমী বিহিত পূজা শুরু করি। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান শেষে দর্পণ বিসর্জন দেওয়া হয়। ভক্তরা দেবীর চরণে শেষ পুষ্পাঞ্জলি অর্পণ করেন।”


সিঁদুর খেলার তাৎপর্য তুলে ধরে তিনি বলেন, স্বামীর দীর্ঘায়ু ও পরিবারের কল্যাণ কামনায় প্রচলিত এই আয়োজন সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিজয়া দশমীর অন্যতম আকর্ষণ। শাস্ত্রীয় বিশ্বাস ও প্রথা অনুসরণ করে বিবাহিত নারীরা এ আয়োজনে অংশ নেন।


পূজার আনুষ্ঠানিকতা ও অঞ্জলি শেষে সকাল গড়াতেই শুরু হয় সিঁদুর খেলা। প্রথমে দেবীকে সিঁদুর নিবেদন করেন নারীরা। পরে একে অপরের কপাল ও গালে সিঁদুর মাখিয়ে আনন্দে মেতে ওঠেন। নাচ-গান, ঢাকের তালে আর দেবীর নামে জয়ধ্বনিতে উৎসবমুখর হয়ে ওঠে মন্দির প্রাঙ্গণ। অনেক স্বামীও স্ত্রীর কপালে সিঁদুর দিয়ে সংসারের মঙ্গল কামনা করেন।


লক্ষ্মীনারায়ণ মন্দিরে স্বামীর সঙ্গে আসা ভক্ত মিতালী রুদ্র বলেন, “মায়ের কাছে প্রার্থনা করেছি, তিনি যেন সারা বছর সবাইকে সুস্থ ও ভালো রাখেন। সবাই মিলে সিঁদুর খেলার আনন্দটাই আলাদা। তাই প্রতি বছর এখানে ছুটে আসি।”


শুধু খাগড়াছড়ি শহরেই নয়, জেলার অন্যান্য পূজামণ্ডপেও ছিল উৎসবের শেষ দিনের ব্যস্ততা। কোথাও চলেছে বিদায়ী আরতি, কোথাও ভক্তরা শেষবারের মতো দেবীর চরণে অঞ্জলি দিয়েছেন। আনন্দের আবহের মধ্যেও অনেকের চোখেমুখে ছিল প্রিয় দেবীকে বিদায় জানানোর বিষাদ।


এ বিষাদের মধ্যেই তরুণদের কণ্ঠে ভেসে আসে প্রত্যাশার সুর—‘আসছে বছর আবার হবে, বছর বছর আসতে হবে।’


সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস অনুযায়ী, মহালয়ার মধ্য দিয়ে দেবী দুর্গার মর্ত্যে আগমনের সূচনা হয়। আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত চলে দুর্গোৎসবের মূল আনুষ্ঠানিকতা। বিজয়া দশমীতে বিসর্জনের মধ্য দিয়ে দেবী পুত্র-কন্যাদের নিয়ে কৈলাসে ফিরে যান। আবারও নতুন শরতে দেবীর আগমনের অপেক্ষায় থাকেন ভক্তরা।


দেবীর বিদায়ের মধ্য দিয়ে শেষ হলো এবারের দুর্গোৎসব। মণ্ডপে মণ্ডপে রয়ে গেল সিঁদুরের রঙ, উৎসবের স্মৃতি আর আগামী শরতে আবারও মিলিত হওয়ার প্রত্যাশা।