জেল থেকে নিহতের স্ত্রীর সঙ্গে ‘খুনি’র ফোনালাপ, বিএনপি নেতা জাহাঙ্গীর হত্যা মামলায় নতুন মোড়

প্রকাশিত: ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৫৪ এএম
জেল থেকে নিহতের স্ত্রীর সঙ্গে ‘খুনি’র ফোনালাপ, বিএনপি নেতা জাহাঙ্গীর হত্যা মামলায় নতুন মোড়

সংগৃহীত

মোঃ মাহ্ফুজুল হক, কিশোরগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি


কিশোরগঞ্জের মিঠামইনে উপজেলা বিএনপির সভাপতি জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীর হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে নতুন করে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের পর আটক মো. হেলালের সঙ্গে নিহতের স্ত্রী তাসলিমা আক্তার চৌধুরীর ৯ মিনিট ১৮ সেকেন্ডের একটি ফোনালাপ সামনে এসেছে। ওই ফোনালাপে হত্যাকাণ্ডের উদ্দেশ্য ও পরিকল্পনা নিয়ে বেশ কিছু অভিযোগ করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।


আটক হেলাল বরগুনার বামনা উপজেলার চালিতাবুনিয়া এলাকার মৃত সুলতানের ছেলে। হত্যাকাণ্ডের পর ঘটনাস্থল থেকে স্থানীয় জনতা তাঁকে আটক করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে। এরপর থেকে তিনি কারাগারে রয়েছেন।


প্রতিবেদকের হাতে আসা ফোনালাপের বর্ণনা অনুযায়ী, হেলাল দাবি করেন, জাহাঙ্গীরকে হত্যার উদ্দেশ্যে নয়, বরং তাঁর একটি হাত কেটে ফেলার জন্য তাঁদের ভাড়া করা হয়েছিল। এ কাজের জন্য জাহাঙ্গীরের ছোট ভাই আলমগীর শিকদার তাঁদের ভাড়া করেছিলেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।


ফোনালাপে হেলালকে বলতে শোনা যায়, আলমগীর শিকদার তাঁদের ভাড়া করার সময় যেভাবেই হোক জাহাঙ্গীরের একটি হাত কেটে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। এতে তাঁর মৃত্যু হলেও তাঁদের কিছু যায় আসে না—এমন কথাও বলা হয়েছিল বলে দাবি করেন হেলাল। তবে তাঁরা পেশাদার খুনি নন উল্লেখ করে তিনি বলেন, টাকার লোভে পড়ে তাঁরা এ কাজে জড়িয়েছিলেন। জাহাঙ্গীরের মৃত্যু তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল না বলেও দাবি করেন তিনি।


ফোনালাপে আলমগীর ও খোকার নাম


ফোনালাপে হেলাল আরও দাবি করেন, রিয়াজ নামের তাঁর এক বন্ধুর সঙ্গে খোকা ভাইয়ের মাধ্যমে আলমগীরের যোগাযোগ হয়েছিল। তাঁদের সঙ্গে কারাগারে দেখা করতে আসা এক ব্যক্তি আলমগীরের নাম বলায় তাঁদের গালাগাল করেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।


হেলালের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁদের আলমগীরের নাম বলতে নিষেধ করা হয়েছিল। নাম প্রকাশ করলে জামিন পাওয়া কঠিন হতে পারে—এমন আশঙ্কার কথাও ফোনালাপে উঠে আসে। তিনি দাবি করেন, ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে আলমগীরের নাম বলার পর তাঁদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে।


ফোনালাপে হেলাল আরও বলেন, কয়েক দিনের মধ্যে খোকাকে রিমান্ডে নেওয়া হতে পারে, কিন্তু সেখানে আলমগীরের নাম প্রকাশ না করার চেষ্টা চলছে বলে তাঁর ধারণা। এ ছাড়া হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় অনেক নিরপরাধ মানুষও ফেঁসে গেছেন বলে দাবি করেন তিনি।


নিহত জাহাঙ্গীরের স্ত্রী তাসলিমা আক্তার চৌধুরী ফোনালাপে হেলালের কাছে জানতে চান, তাঁকে কারাগার থেকে বের করে আনা হয়েছে কি না। জবাবে হেলাল বলেন, তিনি কারাগার থেকে আসেননি; ঢাকা থেকে এসেছেন। মিঠামইনে ১৫ থেকে ২০ দিন অবস্থান করার সময় কে তাঁদের নিয়ে এসেছেন, কে টাকা দিয়েছেন—এসব বিষয় বুঝতে পেরেছেন বলে দাবি করেন তিনি।


হেলাল আরও দাবি করেন, আলমগীরের একজন লোক তাঁদের খাওয়াদাওয়ার খরচ দিতেন। ওই ব্যক্তির নাম মনে না থাকলেও তাঁকে লম্বা ও কালো বর্ণের বলে বর্ণনা করেন তিনি। তাঁর দাবি, রিয়াজের সঙ্গে আলমগীরের সরাসরি কথা হতো।


নিহতের স্ত্রীর দাবি, আগেই সন্দেহ ছিল


তাসলিমা আক্তার চৌধুরী জানান, এলাকার এক ব্যক্তির মাধ্যমে তিনি খবর পান, কারাগার থেকে হেলাল তাঁর সঙ্গে কথা বলতে চান। এরপর ফোনে কথা হলে হেলাল কীভাবে মিঠামইনে এসেছেন, কে তাঁকে এনেছেন এবং কারা অর্থ দিয়েছেন—এসব বিষয়ে কথা বলেন বলে দাবি করেন তিনি।


তাসলিমা বলেন, প্রায় ১০ থেকে ১১ দিন আগে হেলাল কারাগার থেকে তাঁকে ফোন করেছিলেন। আলমগীর শিকদার এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত বলে তাঁরা আগে থেকেই সন্দেহ করে আসছেন। তবে ফোনালাপে করা অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।


তিনি আরও জানান, হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের শাস্তির দাবিতে শনিবার মিঠামইনবাসী বিক্ষোভ মিছিল করবেন।


অভিযোগ অস্বীকার আলমগীর শিকদারের


বিভিন্ন সূত্র ও আলমগীর শিকদারের ফেসবুক আইডি থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, তিনি কয়েক সপ্তাহ ধরে সুইজারল্যান্ডে অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে।


এ বিষয়ে তাঁর মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে আলমগীর শিকদার অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন। তিনি বলেন, তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। তাঁর ভাষ্য, যে ব্যক্তি আগে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন, তাঁর বক্তব্য এখন কীভাবে সামনে আসছে, তা প্রশ্নের বিষয়। তিনি জড়িত থাকলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাঁকে গ্রেপ্তার করেনি কেন, সেই প্রশ্নও তোলেন।


আলমগীর আরও বলেন, তিনি বর্তমানে দেশের বাইরে আছেন এবং দেশে ফিরবেন। ফোনালাপে তাঁর নাম সরাসরি বলা হয়নি, বরং খোকার নাম এসেছে বলেও দাবি করেন তিনি। নিহতের পরিবারের সঙ্গে তাঁর বিরোধের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, তাঁর ভাইয়ের স্ত্রী আওয়ামী লীগ পরিবারের সন্তান হওয়ায় তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ করছেন। দেশে ফিরে তিনিও সংবাদ সম্মেলন করবেন বলে জানান।


তদন্ত করছে ডিবি


মিঠামইন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনোয়ার মোহাম্মদ জানান, হত্যাকাণ্ডের পর থেকে এ পর্যন্ত ১৫ জনকে আটক করা হয়েছে। বর্তমানে মামলাটি তদন্তের জন্য গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।


অষ্টগ্রাম সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) মো. দিদারুল ইসলাম জানান, অন্য একজনের মাধ্যমে তিনি ফোনালাপের বিষয়ে শুনেছেন। তবে এখনো রেকর্ডটি শোনেননি। বিষয়টি নিয়ে তিনি ডিবির মামলার তদন্ত কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলবেন।


যেভাবে খুন হন বিএনপি নেতা জাহাঙ্গীর


উল্লেখ্য, গত ১৫ জুলাই দিবাগত রাতে কিশোরগঞ্জের মিঠামইনে নিজ বাড়ির সামনে হামলার শিকার হয়ে নিহত হন উপজেলা বিএনপির সভাপতি জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীর। তাঁকে ভাড়াটে খুনিরা হত্যা করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।


এ ঘটনায় ১৮ জুলাই নিহতের স্ত্রী তাসলিমা আক্তার চৌধুরী বাদী হয়ে তিনজনকে আসামি করে মিঠামইন থানায় মামলা করেন। দীর্ঘদিন ধরে জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীর মিঠামইন উপজেলা বিএনপির সভাপতির দায়িত্ব পালন করছিলেন।


ফোনালাপে উঠে আসা অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং মামলার তদন্তের অগ্রগতির ওপর এখন নজর রয়েছে স্থানীয়দের। তবে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত পরিকল্পনা, কারা এতে জড়িত এবং কার কী ভূমিকা ছিল, তা তদন্ত শেষে নিশ্চিত হওয়া যাবে।


এমকে/বিএম২৪