জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ইতিহাস বিকৃতি: ১৬ জুলাইয়ের চট্টগ্রামের প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভূমিকার স্বীকৃতি কোথায়?
— চৌধুরী সিয়াম ইলাহী:
গত বছর হঠাৎ করেই প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক কয়েকটি সংগঠন, যারা আগে মূলত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন বিষয়ে প্রতিবাদ জানাতো, সাংগঠনিক কাঠামো গঠন করে। এরপর তাদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাবের মধ্য দিয়ে ১৮ জুলাইকে "প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি রেসিস্টেন্স ডে" হিসেবে ঘোষণা করানো হয়। তাদের দাবি ছিল, সেদিনই প্রথম দেশের প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সম্মিলিতভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল।
আমি সেই সিদ্ধান্তের সঙ্গে তখনই দ্বিমত পোষণ করেছিলাম। কারণ, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের একজন তালিকাভুক্ত সমন্বয়ক হিসেবে আমার বিশ্বাস—ইতিহাসের সত্য সংরক্ষণ করা আমাদের সবার দায়িত্ব।
বাস্তবতা হলো, ১৬ জুলাই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হয়, শাটল ট্রেন বন্ধ হয়ে যায় এবং আবাসিক হল খালি করে শিক্ষার্থীদের বাড়ি ফিরে যেতে বলা হয়। তখন অনেকেই মনে করেছিলেন আন্দোলনের গতি থেমে যাবে। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম (আইআইইউসি)-এর হাজারো শিক্ষার্থী নতুন করে আন্দোলনের নেতৃত্ব দেয়।
সেদিন সকাল ১০টায় বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ সমাবেশ থেকে আন্দোলন অসহযোগ কর্মসূচিতে রূপ নেয়। শিক্ষার্থীরা ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়ক ও রেলপথ প্রায় চার ঘণ্টা অবরুদ্ধ রাখে। দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রাম কার্যত অচল হয়ে পড়েছিল, যার প্রভাব জাতীয় অর্থনীতিতেও পড়ে।
এরপর ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা কয়েক দফা হামলা চালায়। হামলায় বহু শিক্ষার্থী আহত হন। কিন্তু শিক্ষার্থীদের প্রতিরোধের মুখে হামলাকারীরা পিছু হটতে বাধ্য হয়। আমার মতে, এটাই ছিল দেশের প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের প্রথম সুসংগঠিত প্রতিরোধ।
ক্যাম্পাসে কর্মসূচি সফল করার পর আইআইইউসি-এর হাজারো শিক্ষার্থী চট্টগ্রাম শহরের মূল আন্দোলনে যোগ দিতে রওনা হন। পথে তাদের বহনকারী কয়েকটি বাসে হামলা চালানো হয়। বাস ভাঙচুর করা হয়, শতাধিক শিক্ষার্থী দেশীয় অস্ত্রের আঘাতে আহত হন।
এই হামলার পর আইআইইউসি-এর পাশে দাঁড়ায় চট্টগ্রামের অন্যান্য প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। বিশেষ করে প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটি, বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটি, চিটাগং ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি, সাউদার্ন ইউনিভার্সিটি এবং ইস্ট ডেল্টা ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীরা সম্মিলিতভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলে।
অল্প সময়ের মধ্যেই চট্টগ্রাম কলেজ, মহসিন কলেজ, মহিলা কলেজ, বিভিন্ন মাদ্রাসা, পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটসহ নানা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরাও আন্দোলনে যুক্ত হন। সংঘর্ষে গুলিবর্ষণের ঘটনায় ওয়াসিম আকরাম, ফয়সাল আহমেদ শান্ত ও ওমর ফারুক নিহত হন। তাঁদের আত্মত্যাগ আন্দোলনকে দমাতে পারেনি; বরং আন্দোলন আরও বেগবান হয়েছিল।
প্রশ্ন হলো—চট্টগ্রামে ১৬ জুলাই প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর এই সম্মিলিত প্রতিরোধের যথাযথ স্বীকৃতি কোথায়?
আমার অভিযোগ, ঢাকাকেন্দ্রিক ইতিহাসচর্চার কারণে ১৬ জুলাইয়ের চট্টগ্রামের ঘটনাপ্রবাহকে উপেক্ষা করে ১৮ জুলাইয়ের ঢাকার ঘটনাকে "প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি রেসিস্টেন্স ডে" হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এমনকি এ উপলক্ষে প্রকাশিত ডকুমেন্টারিতেও আইআইইউসি কিংবা চট্টগ্রামের আন্দোলনের উল্লেখযোগ্য কোনো উপস্থিতি ছিল না।
ইতিহাস কোনো অঞ্চল, ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর একক সম্পত্তি নয়। ইতিহাসকে তার প্রকৃত প্রেক্ষাপট, সময় ও অবদানের ভিত্তিতেই মূল্যায়ন করতে হবে।
আমার বিনীত আহ্বান—সঠিক ইতিহাস সংরক্ষণ করুন, চর্চা করুন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে সত্য তুলে ধরুন। যেন আগামী ২০–২৫ বছর পর এসে আমাদের বলতে না হয়, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ইতিহাসও বিকৃত হয়ে গেছে।
যদি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সম্মিলিত প্রতিরোধকে স্মরণ করার জন্য একটি দিন নির্ধারণ করতেই হয়, তবে সেই আলোচনায় ১৬ জুলাই চট্টগ্রামে আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম (আইআইইউসি) এবং অন্যান্য প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা যথাযথভাবে মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পাওয়াই ইতিহাসের প্রতি ন্যায্য সম্মান হবে।









