সাইবার বুলিং এর মাধ্যমে মানুষকে হেয় করার প্রবণতা বাড়ছে

প্রকাশিত: ২২ জুন ২০২৬, ০১:৪২ পিএম
সাইবার বুলিং এর মাধ্যমে মানুষকে হেয় করার প্রবণতা বাড়ছে


বর্তমান যুগ তথ্য ও যোগযোগ প্রযুক্তির যুগ। ইন্টারনেট, স্মার্টফোন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের জীবনকে সহজ ও গতিশীল করেছে। কিন্তু প্রযুক্তির এই ইতিবাচক ব্যবহারের পাশাপাশি কিছু নেতিবাচক দিকও রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো সাইবার বুলিং (Cyberbullying)। এটি এমন একটি সমস্যা যা বিশেষ করে শিশু, কিশোর-কিশোরী এবং তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য, সামাজিক জীবন এবং শিক্ষার ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে।

সাইবার বুলিং হলো- ইন্টারনেট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মেসেজিং অ্যাপ, ই-মেইল, অনলাইন গেম, ওয়েব, ব্লগ বা অন্যান্য ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে কাউকে ইচ্ছাকৃতভাবে অপমান, হুমকি, হয়রানি বা বিব্রত করার প্রক্রিয়া।

এটি সাধারণ বুলিংয়ের মতো হলেও এর পরিধি অনেক বেশি। কারণ অনলাইনে একবার কোনো তথ্য ছড়িয়ে পড়লে তা দ্রুত হাজার হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে।

সাইবার বুলিংয়ের কয়েকটি ধরণঃ 

১। অপমানজনক মন্তব্য- 

কাউকে উদ্দেশ্য করে অশালীন বা অপমানজনক মন্তব্য করা।

২। গুজব বা রিউমারস ছড়ানো: 

মিথ্যা তথ্য বা গুজব ছড়িয়ে কারো সুনাম নষ্ট করা। 

৩। ভূয়া বা ফেইক একাউন্ট তৈরী: 

অন্যের নামে ভুয়া আইডি খুলে বিভ্রান্তিকর বা ক্ষতিকর তথ্য প্রচার করা। এবং টার্গেট করে ভিক্টিম এর পরিচিতদের কাছে সন্মান হানিকর বিষয় গুলো পাঠানো। 

৪। ব্যাক্তিগত ছবি বা তথ্য প্রকাশ: 

কারো অনুমতি ছাড়া ব্যক্তিগত ছবি, ভিডিও বা তথ্য প্রকাশ করা।

৫। অনলাইন হুমকি: 

ভয়ভীতি প্রদর্শন বা ক্ষতির হুমকি দেওয়া।

৬। সামাজিক ভাবে বিচ্ছিন্ন করা: 

অনলাইন গ্রুপ বা কমিউনিটি থেকে কাউকে ইচ্ছাকৃতভাবে বাদ দেওয়া।

সাইবার বুলিংয়ের কারণঃ 

ক) প্রযুক্তির সহজলভ্যতা- 

বর্তমানে প্রায় সবার হাতেই স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট রয়েছে।

খ) পরিচয় গোপন রাখার সুযোগ- 

অনেকে মনে করে অনলাইনে পরিচয় গোপন রেখে যা খুশি করা যায়।

গ) সামাজিক ও পারিবারিক সমস্যা- 

অনেক সময় ব্যক্তিগত হতাশা বা রাগ অন্যের ওপর ঝেড়ে ফেলার জন্য মানুষ সাইবার বুলিং করে।

অনেকেই বুঝতে পারে না যে তাদের আচরণ অন্যের জন্য কতটা ক্ষতিকর হতে পারে।

সাইবার বুলিংয়ের প্রভাব- 

★ উদ্বেগ

★ বিষণ্ণতা

★ আত্মবিশ্বাস হ্রাস

★ একাকীত্ব

★ মানসিক চাপ

সম্মান হারানোর ভয়ে মানুষের সাথে মেলামেশা বন্ধ করে দেওয়া 

★ পরিবার-পরিজন ও আত্মীয়-স্বজনের সাথে সম্পর্কের ঘাটতি

★ পড়াশোনায় মনোযোগ কমে যায়

★ পরীক্ষার ফল খারাপ হয়

★ চাকুরী ও ক্যাম্পাসে অনুপস্থিতি বৃদ্ধি পায়

★ বন্ধুদের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট হয়

★ সামাজিক যোগাযোগ কমে যায়

★ আত্মগোপনের প্রবণতা তৈরি হয়

★ ঘুমের সমস্যা

★ মাথাব্যথা

★ ক্ষুধামন্দা

★ দীর্ঘস্থায়ী মানসিক ক্লান্তি

সাইবার বুলিং এর লক্ষণঃ

যে ব্যক্তি সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়, তার মধ্যে সাধারণত দেখা যায়-

★ হঠাৎ মন খারাপ থাকা

★ মান-সন্মান হারানোর ভয়ে টেনশন 

★ সামাজিক যোগাযোগ কমিয়ে দেওয়া

★ মোবাইল বা ইন্টারনেট ব্যবহার করতে ভয় পাওয়া

★ পড়াশোনায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলা

★ আত্মবিশ্বাস কমে যাওয়া

সাইবার বুলিং এর স্বীকার না হতে চাইলেঃ

ক) ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষিত রাখা

অপরিচিত কারো সঙ্গে ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ার না করা।

খ) শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ব্যবহার

অ্যাকাউন্ট নিরাপদ রাখতে জটিল পাসওয়ার্ড ব্যবহার করা।

গ) গোপনীয়তা সেটিংস ব্যবহার

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে Privacy Settings ঠিকভাবে ব্যবহার করা।

ঘ) অপরিচিতদের পরিপূর্ণ যাচাই ছাড়া গ্রহণ না করা

অচেনা ব্যক্তির Friend Request বা Message সম্পর্কে সতর্ক থাকা।

ঙ) সম্মানজনক আচরণ করা

নিজেও অন্যকে সম্মান করা এবং অনলাইনে ভদ্র আচরণ বজায় রাখা।

সাইবার বুলিং এর স্বীকার হলে করণীয়ঃ 

ক) প্রমাণ সংরক্ষণ করুন: 

স্ক্রিনশট, মেসেজ বা পোস্টের কপি সংরক্ষণ করুন।

খ) উত্তর না দেওয়া: 

বুলিংকারীর সঙ্গে তর্কে না জড়ানো ভালো।

গ) ব্লক ও রিপোর্ট করুন: 

সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্ট ব্লক এবং প্ল্যাটফর্মে রিপোর্ট করুন।

ঘ) বিশ্বস্ত ব্যক্তিকে জানান:

অভিভাবক, শিক্ষক বা কাছের কাউকে বিষয়টি জানান।

ঙ) আইনি সহায়তা নিন: 

গুরুতর ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাহায্য নেওয়া যেতে পারে।

যদি ভারত থেকে কোন ফেইক আইডি থেকে সাইবার বুলিং এর স্বীকার হন তাহলে পরিপূর্ণ ভাবে সেসব আইডি এড়িয়ে চলুন। 

ইদানীং বাংলাদেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইসলামিক ভাবাপন্ন ব্যক্তিদের সহ ভারতীয় আগ্রাসন বিরোধী শক্তিগুলোকে লাঞ্চিত করার জন্য ভারতের বিশাল এক অপরাধ সেক্টর নেমে পড়েছে। সেহেতু এ বিষয় গুলোতে সকলের সচেতনতা সৃষ্টি করা প্রয়োজন। 

বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সাইবার বুলিংয়ের ঘটনাও বেড়েছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিশোর-কিশোরী ও নারীরা বেশি ঝুঁকির মধ্যে থাকে। তাই ডিজিটাল নিরাপত্তা, প্রযুক্তি শিক্ষা এবং সচেতনতা বৃদ্ধি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সাইবার বুলিং আধুনিক যুগের একটি গুরুতর সামাজিক সমস্যা। এটি শুধু একজন ব্যক্তির মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে না, বরং তার শিক্ষা, কর্মজীবন ও সামাজিক সম্পর্ককেও প্রভাবিত করতে পারে। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সমাজ এবং সরকার- সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে সাইবার বুলিং প্রতিরোধ করা সম্ভব। প্রযুক্তিকে নিরাপদ ও ইতিবাচকভাবে ব্যবহার করাই হতে পারে এই সমস্যার সবচেয়ে কার্যকর সমাধান।

সাইবার বুলিং এর স্বীকার হলে ঘাবড়াবেন না। কারণ আনড্রেস এআই টুলস্ রিয়েলিস্টিক৷ নগ্ন ছবি তৈরি করতে সক্ষম এবং সুপার এডিটের মাধ্যমে খুব দ্রুত ভিডিও কল রেকর্ড সহ বিভিন্ন কনটেন্ট বানানো সম্ভব। 

তাই কারো কোন কিছু দেখামাত্র যথোপযুক্ত প্রমাণ ছাড়া সেটি বিশ্বাস করবেন না। মনে রাখবেন, আগামী বিশ্ব স্ক্রিনশট, স্থিরচিত্র ও ভিডিওতে বিশ্বাস রাখবে না। 

ওমায়ের আহমেদ শাওন 

(লেখক, কলামিস্ট ও গণমাধ্যম বিশ্লেষক)