শহীদ আবু সাঈদের রংপুর চিরকাল উপেক্ষিত

প্রকাশিত: ১৫ জুলাই ২০২৬, ১২:৩৬ পিএম
শহীদ আবু সাঈদের রংপুর চিরকাল উপেক্ষিত

বাংলাদেশের প্রতিটি অঞ্চলের নিজস্ব ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং সংগ্রামের গল্প রয়েছে। কিন্তু কিছু অঞ্চল এমনও আছে, যাদের অবদান জাতীয় ইতিহাসে সুস্পষ্ট এবং প্রথম কাতারের হলেও উন্নয়নের প্রশ্নে বারবার আলোচনায় উঠে আসে। উত্তরাঞ্চলের রংপুর সেই অঞ্চল গুলোর একটি। রংপুরকে ঘিরে বহু বছর ধরে একটি প্রশ্ন জনমনে ঘুরপাক খাচ্ছে- এই অঞ্চলের সম্ভাবনা কি যথাযথভাবে কাজে লাগানো হয়েছে ? নাকি উন্নয়নের যাত্রায় রংপুর এখনও প্রত্যাশার চেয়ে পিছিয়ে রয়েছে ?

সাম্প্রতিক সময়ে শহীদ আবু সাঈদের আত্মত্যাগ রংপুরকে নতুনভাবে জাতীয় আলোচনায় নিয়ে এসেছে। তাঁর নাম শুধু একজন সাহসী তরুণের স্মৃতিই বহন করে না; অনেক মানুষের কাছে এটি উত্তরাঞ্চলের তরুণ সমাজের স্বপ্ন, অধিকার এবং ন্যায্য সুযোগের প্রতীকও হয়ে উঠেছে। তবে আবেগের পাশাপাশি বাস্তবতাও বিবেচনা করা জরুরি। কোনো অঞ্চলের উন্নয়ন বা বৈষম্য নিয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হলে ইতিহাস, অর্থনীতি, অবকাঠামো, শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক বাস্তবতা- সবকিছু একসঙ্গে মূল্যায়ন করতে হয়।

রংপুরের ইতিহাস বাংলাদেশের ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। কৃষিভিত্তিক এই অঞ্চল বহু শতাব্দী ধরে দেশের খাদ্য উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ এবং পরবর্তী বিভিন্ন গণআন্দোলনে রংপুরের মানুষের অংশগ্রহণ জাতীয় ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। কিন্তু প্রতিবারই রংপুর অঞ্চলকে অপকৌশলে পিছিয়ে রাখার অপচেষ্টা করা হয়।

শুধু রাজনীতি নয়, সাহিত্য, সংস্কৃতি, শিক্ষা এবং কৃষি গবেষণার ক্ষেত্রেও রংপুরের অবদান উল্লেখযোগ্য। এখানকার মাটি উর্বর, মানুষের কর্মস্পৃহা প্রবল এবং তরুণ সমাজ শিক্ষার প্রতি আগ্রহী। তবুও বহু বছর ধরে এই অঞ্চলের মানুষের মুখে একটি প্রশ্ন শোনা যায- “আমাদের সম্ভাবনা কি পুরোপুরি মূল্যায়িত হয়েছে ?”

এই প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়। কারণ উন্নয়নকে কেবল একটি রাস্তা, একটি সেতু কিংবা একটি ভবন দিয়ে বিচার করা যায় না। উন্নয়নের প্রকৃত মানদণ্ড হলো মানুষের জীবনমান, কর্মসংস্থান, শিক্ষার সুযোগ, স্বাস্থ্যসেবা, শিল্পায়ন এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে মানুষের আত্মবিশ্বাস। 

জাতীয় বাজেট বরাদ্দের সময় দেখা যায়- রংপুর সিটি কর্পোরেশন প্রতিবারই শুন্য। 

অনেক রংপুর বাসীর মধ্যে একটি ধারণা রয়েছে যে, জাতীয় উন্নয়নের তুলনায় তাদের অঞ্চল দীর্ঘদিন তুলনামূলক ভাবে কম বিনিয়োগ পেয়েছে। এই অনুভূতির পেছনে কয়েকটি বাস্তব কারণ আলোচনায় আসে।

প্রথমত, দীর্ঘদিন ধরে উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতি প্রধানত কৃষিনির্ভর ছিল। কৃষি দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি একা বৃহৎ কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে না। শিল্প, সেবা ও প্রযুক্তি খাতের সমান্তরাল বিকাশ না হলে শিক্ষিত তরুণদের জন্য পর্যাপ্ত কর্মক্ষেত্র সৃষ্টি হয় না।

দ্বিতীয়ত, অতীতে রংপুর অঞ্চলে মৌসুমি দারিদ্র্য বা 'মঙ্গা' একটি বড় সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যা হিসেবে পরিচিত ছিল। যদিও সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এবং কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির ফলে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়েছে, তবুও সেই ইতিহাস মানুষের মানসিকতায় গভীর ছাপ রেখে গেছে।

তৃতীয়ত, উচ্চশিক্ষা অর্জনের পর অনেক তরুণকে চাকরির জন্য ঢাকা, চট্টগ্রাম বা অন্যান্য বড় শহরে চলে যেতে হয়। এই বাস্তবতা অনেকের মনে এমন ধারণা তৈরি করে যে নিজের অঞ্চলে পর্যাপ্ত সুযোগ নেই।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন। রংপুরে কোনো উন্নয়ন হয়নি- এমন বক্তব্য বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। গত কয়েক দশকে সড়ক যোগাযোগের উন্নতি হয়েছে, বিদ্যুৎ সুবিধা সম্প্রসারিত হয়েছে, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য অবকাঠামো বিস্তৃত হয়েছে এবং তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারও বেড়েছে। কিন্তু প্রত্যেক উন্নয়নে কোন সরকারের সদিচ্ছা ছিলো না। রংপুর অঞ্চলের মানুষের সচেতনতাই অতটুকু উন্নয়ন সম্ভব হয়েছে।

তবে উন্নয়ন নিয়ে মানুষের মূল্যায়ন অনেক সময় তুলনামূলক হয়। মানুষ শুধু দেখে না যে উন্নয়ন হয়েছে কি না; তারা এটাও দেখে অন্য অঞ্চলের তুলনায় তাদের অবস্থান কোথায়। এখানেই আঞ্চলিক বৈষম্যের প্রশ্নটি সামনে আসে।

যদি কোনো অঞ্চলের মানুষ অনুভব করেন যে তাদের সম্ভাবনা অনুযায়ী শিল্পায়ন, বিনিয়োগ কিংবা কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়নি, তাহলে সেই অনুভূতিকে গুরুত্ব দিয়ে বিশ্লেষণ করা উচিত। কারণ উন্নয়নের অন্যতম লক্ষ্যই হলো মানুষের মধ্যে সমঅধিকার ও সমান সুযোগের অনুভূতি সৃষ্টি করা।

শহীদ আবু সাঈদের নাম আজ অনেক মানুষের কাছে শুধু একটি ব্যক্তিগত আত্মত্যাগের স্মৃতি নয়; এটি তরুণদের স্বপ্ন, সাহস এবং ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। তাঁর স্মৃতি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একটি দেশের প্রতিটি অঞ্চল, প্রতিটি তরুণ এবং প্রতিটি নাগরিক সমান মর্যাদা ও সমান সুযোগ পাওয়ার প্রত্যাশা রাখে।

কোনো অঞ্চলের উন্নয়নের প্রশ্নকে রাজনৈতিক বিতর্কের সীমায় আটকে না রেখে জাতীয় উন্নয়নের অংশ হিসেবে দেখা উচিত। কারণ একটি অঞ্চল পিছিয়ে থাকলে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো দেশই।

রংপুরের উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা আবেগের বিষয় যেমন, তেমনি বাস্তবতারও বিষয়। এই অঞ্চলের ইতিহাস গৌরবময়, মানুষের সম্ভাবনা বিপুল এবং অবদান অনস্বীকার্য। একই সঙ্গে কর্মসংস্থান, শিল্পায়ন এবং আঞ্চলিক ভারসাম্য নিয়ে মানুষের প্রত্যাশাও বাস্তব।

তাই প্রশ্নটি হওয়া উচিত- রংপুর কি চিরকাল উপেক্ষিত, তা নয়; বরং রংপুরের পূর্ণ সম্ভাবনা বাস্তবায়নের জন্য এখনো কী কী করা বাকি আছে ? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে পারলেই শহীদ আবু সাঈদের স্মৃতির প্রতি প্রকৃত সম্মান জানানো সম্ভব হবে।

কোনো অঞ্চলের উন্নয়নকে কেবল দৃশ্যমান অবকাঠামো দিয়ে বিচার করা যায় না। একটি অঞ্চলের প্রকৃত উন্নয়ন নির্ভর করে শিক্ষা, কর্মসংস্থান, শিল্পায়ন, কৃষি, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, প্রযুক্তি, বিনিয়োগ এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের ওপর। এই দৃষ্টিকোণ থেকে রংপুরের অবস্থান বিশ্লেষণ করাই জরুরি।

রংপুরের শিক্ষিত তরুণদের একটি বড় অংশ উচ্চশিক্ষা শেষ করার পর রাজধানী বা অন্য বড় শহরে চলে যেতে বাধ্য হন। এর প্রধান কারণ স্থানীয় পর্যায়ে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা।

এটি শুধু রংপুরের সমস্যা নয়; বাংলাদেশের আরও অনেক অঞ্চলেও একই বাস্তবতা দেখা যায়। তবে রংপুরের ক্ষেত্রে বিষয়টি বেশি আলোচিত হয়, কারণ এখানে বিপুলসংখ্যক শিক্ষিত তরুণ থাকা সত্ত্বেও শিল্প ও সেবাখাতের সম্প্রসারণ তুলনামূলকভাবে সীমিত বলে অনেকের ধারণা।

যখন একজন তরুণ নিজের জন্মভূমিতে যোগ্যতা অনুযায়ী কাজের সুযোগ পান না, তখন শুধু একজন ব্যক্তি নয়—একটি অঞ্চলও তার মেধার একটি অংশ হারায়। এই বাস্তবতা দীর্ঘমেয়াদে আঞ্চলিক উন্নয়নের গতিকে প্রভাবিত করতে পারে।

রংপুর বাংলাদেশের অন্যতম কৃষি সমৃদ্ধ অঞ্চল। ধান, আলু, ভুট্টা, গম, শাকসবজি ও বিভিন্ন কৃষিপণ্য উৎপাদনে এ অঞ্চলের অবদান গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শুধু কাঁচা কৃষিপণ্য উৎপাদনের ওপর নির্ভরশীল অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদে কাঙ্ক্ষিত কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে না।

যদি কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প, কোল্ড স্টোরেজ, খাদ্য সংরক্ষণ, রপ্তানিমুখী কৃষি উদ্যোগ এবং কৃষিভিত্তিক ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প আরও সম্প্রসারিত হয়, তাহলে কৃষির মূল্য সংযোজন বাড়বে এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।

রংপুরের কৃষিকে শুধু উৎপাদনের অঞ্চল নয়, কৃষি-শিল্পের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে।

একটি অঞ্চলের অর্থনৈতিক গতিশীলতা অনেকাংশে নির্ভর করে শিল্প বিনিয়োগের ওপর। রংপুরে শিল্পায়নের কিছু উদ্যোগ থাকলেও অনেকেই মনে করেন, এর গতি আরও বাড়ানো দরকার।

বিনিয়োগকারীরা সাধারণত অবকাঠামো, যোগাযোগ, দক্ষ জনশক্তি, জ্বালানি সুবিধা এবং বাজারের সম্ভাবনা বিবেচনা করেন। তাই শিল্পায়ন বাড়াতে শুধু জমি বরাদ্দ দিলেই হবে না; একই সঙ্গে দক্ষ মানবসম্পদ, সহজ প্রশাসনিক সেবা এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত স্থিতিশীলতাও নিশ্চিত করতে হবে।

যদি রংপুরে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পপার্ক এবং কৃষিভিত্তিক উৎপাদন কেন্দ্র গড়ে ওঠে, তাহলে স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন গতি সৃষ্টি হতে পারে।

রংপুরে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে এবং প্রতিবছর বহু শিক্ষার্থী স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। কিন্তু বর্তমান বিশ্বে শুধু ডিগ্রি যথেষ্ট নয়; প্রযুক্তিগত দক্ষতা, ভাষাজ্ঞান, গবেষণার সক্ষমতা এবং উদ্ভাবনী চিন্তাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

তাই কারিগরি শিক্ষা, তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, কৃষি প্রযুক্তি এবং উদ্যোক্তা উন্নয়নমূলক প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়ানো সময়ের দাবি।

যদি একজন তরুণ নিজ অঞ্চলে আন্তর্জাতিক মানের দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পান, তাহলে তাকে কর্মসংস্থানের জন্য অন্যত্র যেতে হলেও তিনি আরও প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে থাকবেন।

উন্নয়নের জন্য যোগাযোগ ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সড়ক, রেল এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যিক সংযোগ যত উন্নত হবে, বিনিয়োগের সম্ভাবনাও তত বাড়বে।

রংপুরের ভৌগোলিক অবস্থান এমন যে, ভবিষ্যতে এটি উত্তরাঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে বিকশিত হওয়ার সুযোগ রাখে। এ জন্য পরিকল্পিত অবকাঠামো উন্নয়ন, লজিস্টিক সুবিধা এবং আন্তঃজেলা বাণিজ্য সহজ করা প্রয়োজন।

রংপুর নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে দুটি চরম অবস্থান এড়ানো দরকার। একদিকে বলা ঠিক নয় যে, "কিছুই হয়নি"। অন্যদিকে এটাও বলা যায় না যে, "আর কিছু করার নেই।"

বাস্তবতা হলো- উন্নয়ন হয়েছে, কিন্তু আরও অনেক সম্ভাবনা এখনো বাস্তবায়নের অপেক্ষায়। এই ভারসাম্যপূর্ণ মূল্যায়নই ভবিষ্যতের পরিকল্পনা গ্রহণে সহায়ক হতে পারে।

শহীদ আবু সাঈদের স্মৃতি আমাদের আবেগ জাগায়, কিন্তু সেই আবেগকে যদি বাস্তব উন্নয়নের পরিকল্পনায় রূপান্তর করা যায়, তাহলেই তাঁর আত্মত্যাগের তাৎপর্য আরও গভীর হবে।

রংপুরের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে শুধু সরকারি প্রকল্পের ওপর নয়; বরং মানবসম্পদ উন্নয়ন, শিল্পায়ন, কৃষির আধুনিকীকরণ, প্রযুক্তি শিক্ষা এবং উদ্যোক্তা সৃষ্টির ওপরও। আঞ্চলিক উন্নয়নকে জাতীয় উন্নয়নের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা গেলে রংপুর তার সম্ভাবনার আরও বড় অংশ বাস্তবায়ন করতে পারবে।

শহীদ আবু সাঈদের স্মৃতি আমাদের মনে করিয়ে দেয়- প্রতিটি অঞ্চলের মানুষের স্বপ্নের মূল্য আছে। সেই স্বপ্ন পূরণের পথ হলো সমন্বিত উন্নয়ন, ন্যায্য সুযোগ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।

একটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন রাজধানীর পাশাপাশি প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষও সেই উন্নয়নের সুফল অনুভব করে। কোনো অঞ্চলের মানুষ যদি মনে করেন যে তাদের সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো হয়নি, তবে সেই অনুভূতিকে গুরুত্ব দিয়ে শোনা প্রয়োজন। কারণ উন্নয়নের পরিসংখ্যান যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ মানুষের অভিজ্ঞতা ও প্রত্যাশাও।

রংপুরকে ঘিরে যে আলোচনা হয়, তার মূল বিষয় কেবল অবকাঠামো নয়; বরং কর্মসংস্থান, শিল্পায়ন, শিক্ষা, বিনিয়োগ এবং আঞ্চলিক ভারসাম্য। অনেক তরুণের আশা- তাদের জন্মভূমি এমন একটি অঞ্চলে পরিণত হোক, যেখানে উচ্চশিক্ষা শেষ করে কাজের সন্ধানে দূরে যেতে বাধ্য হতে হবে না। এই প্রত্যাশা অযৌক্তিক নয়; বরং একটি উন্নয়নশীল দেশের স্বাভাবিক আকাঙ্ক্ষা।

শহীদ আবু সাঈদের স্মৃতি শুধু একটি ব্যক্তিগত আত্মত্যাগের ইতিহাস নয়; এটি তরুণ প্রজন্মের সাহস, ন্যায়বোধ এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবনারও প্রতীক। তাঁর স্মৃতি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, একটি রাষ্ট্রের শক্তি তার মানুষের ওপর নির্ভর করে। আর সেই মানুষ যদি নিজেকে অবহেলিত মনে করেন, তবে উন্নয়নের ধারাকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করার প্রয়োজন রয়েছে।

তাঁর স্মৃতিকে সম্মান জানানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় কোনো একক প্রতীকী কর্মসূচি নয়; বরং এমন নীতি গ্রহণ করা, যা দেশের প্রতিটি অঞ্চলের তরুণদের শিক্ষা, দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ায়।

রংপুরের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। কৃষিতে এ অঞ্চলের শক্ত ভিত্তি রয়েছে। সেই ভিত্তির ওপর কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্প গড়ে তোলা গেলে স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন গতি আসতে পারে। একই সঙ্গে তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং গবেষণাভিত্তিক শিক্ষা সম্প্রসারণের মাধ্যমে রংপুরকে নতুন অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে।

পর্যটন, সীমান্ত বাণিজ্য এবং আঞ্চলিক যোগাযোগ উন্নয়নের ক্ষেত্রেও পরিকল্পিত উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। এ ধরনের উদ্যোগ শুধু রংপুরের জন্য নয়, সমগ্র উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে সহায়ক হতে পারে।

একটি দেশের উন্নয়ন যদি কয়েকটি বড় শহরের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে দীর্ঘমেয়াদে জনসংখ্যার চাপ, কর্মসংস্থানের বৈষম্য এবং অভ্যন্তরীণ অভিবাসন বৃদ্ধি পায়। তাই পরিকল্পিত আঞ্চলিক উন্নয়ন শুধু একটি অঞ্চলের দাবি নয়; এটি জাতীয় অর্থনীতিরও প্রয়োজন।

রংপুর, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, সিলেট, ময়মনসিংহ কিংবা চট্টগ্রাম- প্রতিটি অঞ্চলের নিজস্ব শক্তি ও সম্ভাবনা রয়েছে। নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে সেই বৈচিত্র্যকে গুরুত্ব দিলে জাতীয় উন্নয়ন আরও টেকসই হতে পারে।

রংপুর নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে আবেগের জায়গা অবশ্যই আছে, বিশেষ করে শহীদ আবু সাঈদের স্মৃতি সামনে এলে। তবে আবেগকে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত করাই সবচেয়ে জরুরি।

উন্নয়ন নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে। কেউ মনে করতে পারেন রংপুর যথেষ্ট অগ্রগতি করেছে, আবার কেউ মনে করতে পারেন আরও অনেক কিছু করার বাকি। এই মতপার্থক্য গণতান্ত্রিক সমাজের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। গুরুত্বপূর্ণ হলো- আলোচনা যেন তথ্য, যুক্তি এবং মানুষের বাস্তব চাহিদার ভিত্তিতে এগিয়ে যায়।

একটি আদর্শ বাংলাদেশ হবে এমন, যেখানে কোনো তরুণ নিজের জন্মস্থানকে পিছিয়ে পড়া অঞ্চল বলে মনে করবে না। যেখানে কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং বিনিয়োগের সুযোগ ধীরে ধীরে দেশের সব অঞ্চলে বিস্তৃত হবে। যেখানে রাজধানী ও মফস্বলের মধ্যে উন্নয়নের ব্যবধান কমে আসবে। এবং যেখানে একজন নাগরিকের সম্ভাবনা তার জন্মস্থানের কারণে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে না।

রংপুরের উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা তাই শুধু একটি জেলার নয়; এটি সমগ্র বাংলাদেশের সুষম উন্নয়নের আলোচনার অংশ।

রংপুরকে নিয়ে যে প্রশ্নগুলো বারবার সামনে আসে, সেগুলোকে বিরোধের ভাষায় নয়, সমাধানের ভাষায় দেখা উচিত। একটি অঞ্চল সম্পর্কে মানুষের প্রত্যাশা থাকাই স্বাভাবিক। সেই প্রত্যাশা পূরণের পথ হলো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, মানবসম্পদে বিনিয়োগ, শিল্পায়ন, শিক্ষা এবং সুশাসন।

শহীদ আবু সাঈদের স্মৃতি আমাদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়- একটি জাতির প্রকৃত শক্তি তার তরুণ সমাজ। সেই শক্তিকে বিকশিত করতে হলে দেশের প্রতিটি অঞ্চলের জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি করা প্রয়োজন। রংপুরের সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়া মানে শুধু একটি অঞ্চলের উন্নয়ন নয়; বরং বাংলাদেশের সামগ্রিক অগ্রগতিকে আরও শক্তিশালী করা।

আসুন, আমরা এমন একটি বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি, যেখানে উন্নয়নের আলো কোনো নির্দিষ্ট শহর বা অঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং দেশের প্রতিটি জনপদে সমানভাবে পৌঁছে যাবে। তবেই শহীদদের আত্মত্যাগের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা আরও অর্থবহ হবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম একটি আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ পাবে।

ওমায়ের আহমেদ শাওন 

(লেখক, উদ্যোক্তা ও গণমাধ্যম বিশ্লেষক)