জনসংখ্যাকে জনসম্পদে পরিণত করা সরকারের দায়িত্ব
একটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি কী- প্রাকৃতিক সম্পদ, সামরিক ক্ষমতা, নাকি বিপুল জনসংখ্যার ? এই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করে রাষ্ট্র তার জনগণকে কতটা দক্ষ, শিক্ষিত, সুস্থ ও উৎপাদনশীল হিসেবে গড়ে তুলতে পেরেছে তার ওপর। পৃথিবীর বহু দেশ প্রাকৃতিক সম্পদে দরিদ্র হওয়া সত্ত্বেও মানবসম্পদের শক্তিতে উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। আবার অনেক দেশ বিপুল জনসংখ্যা থাকা সত্ত্বেও কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন অর্জন করতে পারেনি, কারণ তারা সেই জনসংখ্যাকে দক্ষ জনসম্পদে রূপান্তর করতে ব্যর্থ হয়েছে।
বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম জনবহুল দেশ। সীমিত ভূমি ও সম্পদের এই দেশে জনসংখ্যা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা বিতর্ক রয়েছে। কেউ বলেন, অতিরিক্ত জনসংখ্যা দেশের জন্য বোঝা; আবার কেউ বলেন, সঠিক পরিকল্পনা ও বিনিয়োগের মাধ্যমে এই বিপুল জনগোষ্ঠীই হতে পারে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি। বাস্তবতা হলো, জনসংখ্যা নিজে কখনো সম্পদ বা বোঝা নয়। রাষ্ট্রের নীতি, শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান এবং সুশাসনের ওপর নির্ভর করে একই জনসংখ্যা কখনো সম্পদে, আবার কখনো সংকটে পরিণত হয়।
সুতরাং জনসংখ্যাকে জনসম্পদে পরিণত করা রাষ্ট্রের একটি মৌলিক দায়িত্ব। কারণ একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের লক্ষ্য কেবল নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা নয়; বরং তাদের এমনভাবে গড়ে তোলা, যাতে তারা নিজেদের জীবনমান উন্নত করার পাশাপাশি দেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
জনসংখ্যা বলতে একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে বসবাসকারী মানুষের সমষ্টিকে বোঝায়। কিন্তু জনসম্পদ বলতে সেই জনগোষ্ঠীকে বোঝায়, যারা শিক্ষা, দক্ষতা, স্বাস্থ্য, নৈতিকতা ও কর্মক্ষমতার মাধ্যমে উৎপাদনশীল শক্তিতে পরিণত হয়েছে।
অর্থাৎ প্রতিটি জনসম্পদই জনসংখ্যার অংশ, কিন্তু প্রতিটি জনসংখ্যা জনসম্পদ নয়।
যখন একজন ব্যক্তি শিক্ষিত হন, কর্মদক্ষতা অর্জন করেন, প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারেন, নৈতিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী হন এবং নিজের শ্রম ও মেধার মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখেন, তখন তিনি রাষ্ট্রের জন্য প্রকৃত সম্পদে পরিণত হন।
বর্তমান বিশ্বে অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা আর শুধু প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নির্ভরশীল নয়। জ্ঞান, প্রযুক্তি, উদ্ভাবন এবং দক্ষ মানবশক্তিই এখন উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তি। যে রাষ্ট্র তার নাগরিকদের দক্ষ করে তুলতে পারে, সেই রাষ্ট্র বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকে।
বাংলাদেশে প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক তরুণ কর্মজীবনে প্রবেশ করে। এই তরুণ জনগোষ্ঠীকে যথাযথ শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দেওয়া গেলে তারা শিল্প, কৃষি, প্রযুক্তি, স্বাস্থ্য, গবেষণা, উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। অন্যদিকে দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের অভাবে এই জনগোষ্ঠী বেকারত্ব, দারিদ্র্য ও সামাজিক অস্থিরতার ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
অতএব, জনসংখ্যাকে জনসম্পদে রূপান্তর করা শুধু উন্নয়নের কৌশল নয়; এটি রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতারও অন্যতম শর্ত।
রাষ্ট্র গঠনের মূল দর্শনই হলো নাগরিকের কল্যাণ নিশ্চিত করা। সরকার জনগণের কাছ থেকে কর আদায় করে, আইন প্রণয়ন করে, উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করে এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করে। তাই জনগণের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের জন্য নীতি গ্রহণ করা সরকারের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।
যদি একটি সরকার মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে না পারে কিংবা দক্ষতা উন্নয়নের পর্যাপ্ত সুযোগ সৃষ্টি না করে, তাহলে সেই রাষ্ট্র তার সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ মানুষকে- অব্যবহৃত রেখে দেয়।
সুশাসনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এমন একটি পরিবেশ সৃষ্টি করা, যেখানে প্রতিটি নাগরিক তার যোগ্যতা বিকাশের সুযোগ পায়। এই সুযোগ সৃষ্টি করার ক্ষমতা ও দায়িত্ব রাষ্ট্রের।
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সংবিধান সাধারণত নাগরিকের মৌলিক অধিকার, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দেয়। বাংলাদেশও একটি কল্যাণমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে পরিচালিত হয়।
কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের ধারণা অনুযায়ী সরকার কেবল আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা করবে না; বরং নাগরিকের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মদক্ষতা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্যও কার্যকর ভূমিকা পালন করবে।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে জনসংখ্যাকে জনসম্পদে রূপান্তর করা সরকারের একটি নৈতিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব।
যে রাষ্ট্র শিক্ষায় বিনিয়োগ করে, সেই রাষ্ট্র ভবিষ্যতে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হয়। শিক্ষা মানুষের চিন্তাশক্তি, নৈতিকতা, যুক্তিবোধ এবং দক্ষতা বৃদ্ধি করে।
কেবল সনদনির্ভর শিক্ষা নয়, বাস্তবমুখী ও কর্মমুখী শিক্ষা এখন সময়ের দাবি। এমন শিক্ষা প্রয়োজন যা একজন শিক্ষার্থীকে কর্মসংস্থানের জন্য প্রস্তুত করবে, উদ্যোক্তা হওয়ার সাহস দেবে এবং প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে শেখাবে।
সরকারের উচিত-
* মানসম্মত প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা।
* উচ্চশিক্ষাকে গবেষণামুখী করা।
* কারিগরি ও প্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষার প্রসার ঘটানো।
* শিল্পখাতের চাহিদার সঙ্গে শিক্ষার সমন্বয় করা।
* ডিজিটাল দক্ষতা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিক্স ও আধুনিক প্রযুক্তির প্রশিক্ষণ বাড়ানো।
যদি শিক্ষাব্যবস্থা বাস্তব জীবনের সঙ্গে সংযুক্ত না হয়, তবে সনদধারী বেকারের সংখ্যা বাড়বে; কিন্তু প্রকৃত জনসম্পদ তৈরি হবে না।
একজন অসুস্থ ব্যক্তি তার পূর্ণ কর্মক্ষমতা দিয়ে কাজ করতে পারেন না। তাই স্বাস্থ্য খাতেও সরকারের বিনিয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
জনস্বাস্থ্য, মাতৃস্বাস্থ্য, শিশুপুষ্টি, টিকাদান, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, বিশুদ্ধ পানি, নিরাপদ স্যানিটেশন এবং সহজলভ্য চিকিৎসা- এসবই মানবসম্পদ উন্নয়নের ভিত্তি।
সুস্থ নাগরিকই দীর্ঘ সময় উৎপাদনশীল থাকতে পারেন। ফলে স্বাস্থ্য খাতে ব্যয়কে ব্যয় নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ হিসেবে দেখা উচিত।
বর্তমান বিশ্বে শুধু শিক্ষিত হওয়াই যথেষ্ট নয়; দক্ষ হওয়াও অপরিহার্য। একজন দক্ষ ইলেকট্রিশিয়ান, প্রোগ্রামার, কৃষি প্রযুক্তিবিদ, নার্স, মেশিন অপারেটর বা উদ্যোক্তা অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ সনদধারীর চেয়ে বেশি অর্থনৈতিক অবদান রাখতে পারেন।
তাই সরকারের উচিত জাতীয় পর্যায়ে দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচিকে আরও সম্প্রসারিত করা, যাতে তরুণরা দেশীয় ও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী নিজেদের প্রস্তুত করতে পারে।
জনসংখ্যা কোনো দেশের জন্য অভিশাপও নয়, আশীর্বাদও নয়। এটি কী হবে, তা নির্ধারণ করে রাষ্ট্রের নীতি, পরিকল্পনা এবং নেতৃত্ব। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের মাধ্যমে সরকার যদি জনগণের সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে পারে, তাহলে সেই জনগোষ্ঠীই হবে দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ।
অন্যদিকে অব্যবস্থাপনা, দুর্বল পরিকল্পনা এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে অবহেলা একটি সম্ভাবনাময় জাতিকেও পিছিয়ে দিতে পারে। তাই জনসংখ্যাকে জনসম্পদে পরিণত করা কেবল একটি উন্নয়নমূলক কর্মসূচি নয়; এটি জাতীয় অগ্রগতি, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি অপরিহার্য রাষ্ট্রনৈতিক দায়িত্ব।
বাংলাদেশ আজ এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছে, যখন দেশের একটি বড় অংশই কর্মক্ষম তরুণ জনগোষ্ঠী। অর্থনীতির ভাষায় এই পরিস্থিতিকে অনেক সময় জনমিতিক সুবিধা (Demographic Dividend) বলা হয়। অর্থাৎ, কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা যখন নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর তুলনায় বেশি থাকে, তখন একটি দেশ দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুযোগ পায়। কিন্তু এই সুযোগ চিরস্থায়ী নয়। সঠিক সময়ে উপযুক্ত নীতি গ্রহণ করা না গেলে এই সম্ভাবনাই ভবিষ্যতে বেকারত্ব, সামাজিক অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক চাপের কারণ হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশের প্রতিটি জেলা, উপজেলা এবং গ্রামে অসংখ্য মেধাবী তরুণ-তরুণী রয়েছে। তাদের অনেকেই উচ্চশিক্ষা অর্জন করছে, আবার অনেকেই বিভিন্ন কারণে পড়াশোনা শেষ করতে পারছে না। কেউ কৃষিকাজে যুক্ত, কেউ ক্ষুদ্র ব্যবসায়, কেউ বিদেশে কর্মরত, আবার কেউ কর্মসংস্থানের অভাবে হতাশ। এই বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠীকে রাষ্ট্র যদি দক্ষতাভিত্তিক পরিকল্পনার আওতায় আনতে পারে, তাহলে দেশের উন্নয়নের গতি বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।
একজন মানুষকে দক্ষ করে তোলার পর যদি তার জন্য কাজের সুযোগ সৃষ্টি না হয়, তাহলে সেই দক্ষতা ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যায়। তাই জনসম্পদ উন্নয়নের সঙ্গে কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য।
সরকারের দায়িত্ব শুধু সরকারি চাকরি বৃদ্ধি করা নয়; বরং এমন একটি অর্থনৈতিক পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে বেসরকারি শিল্প, কৃষি, তথ্যপ্রযুক্তি, উৎপাদন, পর্যটন, সেবা ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা খাত দ্রুত বিকশিত হতে পারে।
একটি দেশে যখন নতুন শিল্পকারখানা গড়ে ওঠে, বিনিয়োগ বৃদ্ধি পায়, কৃষিভিত্তিক শিল্প সম্প্রসারিত হয় এবং প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়, তখন লক্ষ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়। সরকার যদি নীতিগত সহায়তা, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে কর্মসংস্থানের পরিধিও ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়।
বর্তমান বিশ্বে শুধু একাডেমিক শিক্ষা দিয়ে উন্নত অর্থনীতি গড়া সম্ভব নয়। দক্ষ প্রযুক্তিবিদ, মেশিন অপারেটর, ইলেকট্রিশিয়ান, প্লাম্বার, ওয়েল্ডার, কৃষি প্রযুক্তিবিদ, সফটওয়্যার ডেভেলপার, গ্রাফিক ডিজাইনার, রোবট অপারেটর, সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ- এসব পেশার চাহিদা দিন দিন বাড়ছে।
বাংলাদেশে এখনও অনেক পরিবার কারিগরি শিক্ষাকে যথাযথ মর্যাদা দেয় না। ফলে অনেক শিক্ষার্থী বাস্তব দক্ষতা অর্জনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়।
সরকারের উচিত-
* প্রতিটি জেলায় আধুনিক কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলা।
* শিল্পকারখানার সঙ্গে প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের সমন্বয় করা।
* প্রশিক্ষণ শেষে চাকরির সংযোগ নিশ্চিত করা।
* নারীদের প্রযুক্তিভিত্তিক দক্ষতা অর্জনে বিশেষ সহায়তা প্রদান।
* আন্তর্জাতিক মানের দক্ষতা সনদ চালু করা।
দক্ষতা যত বাড়বে, দেশের উৎপাদনশীলতাও তত বাড়বে।
চতুর্থ শিল্পবিপ্লব বিশ্ব অর্থনীতির কাঠামো বদলে দিয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা অ্যানালিটিক্স, ক্লাউড কম্পিউটিং, সাইবার নিরাপত্তা, সফটওয়্যার উন্নয়ন এবং ডিজিটাল সেবা এখন বৈশ্বিক অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি।
বাংলাদেশের তরুণদের মধ্যে প্রযুক্তি শেখার আগ্রহ অনেক। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ, গবেষণাগার, আধুনিক সরঞ্জাম এবং আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষকের ঘাটতি এখনও একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
সরকারের উচিত প্রযুক্তিশিক্ষাকে শহরকেন্দ্রিক না রেখে উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত সম্প্রসারণ করা। একই সঙ্গে ফ্রিল্যান্সিং, স্টার্টআপ এবং উদ্ভাবনী উদ্যোগে তরুণদের আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা প্রদান করা।
একটি উন্নত অর্থনীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো উদ্যোক্তার সংখ্যা বৃদ্ধি। সবাই সরকারি বা বেসরকারি চাকরি করবে- এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। বরং দক্ষ তরুণদের মধ্যে উদ্যোক্তা হওয়ার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে।
সরকার সহজ শর্তে ঋণ, ব্যবসায়িক প্রশিক্ষণ, বাজারসংযোগ, কর-সহায়তা এবং প্রযুক্তিগত পরামর্শ প্রদান করলে নতুন উদ্যোক্তার সংখ্যা দ্রুত বাড়তে পারে।
একজন সফল উদ্যোক্তা শুধু নিজের জীবনের পরিবর্তন ঘটান না; তিনি আরও অনেক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেন। তাই উদ্যোক্তা উন্নয়নও জনসম্পদ সৃষ্টির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বাংলাদেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ এখনও কৃষিনির্ভর। কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তির অভাব, বাজারব্যবস্থার দুর্বলতা এবং সংরক্ষণ সুবিধার সীমাবদ্ধতার কারণে কৃষকরা অনেক সময় ন্যায্য মূল্য পান না।
সরকার যদি আধুনিক কৃষিযন্ত্র, উন্নত বীজ, সেচব্যবস্থা, কৃষি গবেষণা, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং বাজার ব্যবস্থার উন্নয়নে বিনিয়োগ করে, তাহলে কৃষিও উচ্চ আয়ের পেশায় পরিণত হতে পারে।
শিক্ষিত তরুণরা যদি কৃষিকে আধুনিক ব্যবসা হিসেবে গ্রহণ করে, তাহলে কৃষি খাতেও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।
বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ বিদেশে কর্মরত। তাদের পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু এখনও অনেক শ্রমিক অদক্ষ অবস্থায় বিদেশে যান। ফলে তারা কম মজুরি পান এবং নানা ধরনের ঝুঁকির মুখোমুখি হন।
সরকারের উচিত-
* বিদেশগামী কর্মীদের আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ প্রদান।
* ভাষা শিক্ষা নিশ্চিত করা।
* কর্মীদের অধিকার রক্ষায় কূটনৈতিক তৎপরতা বৃদ্ধি করা।
* নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধান করা।
* দক্ষ পেশাজীবী বিদেশে পাঠানোর উদ্যোগ বাড়ানো।
দক্ষ শ্রমিক বিদেশে গেলে দেশের মর্যাদা যেমন বাড়ে, তেমনি বৈদেশিক আয়ও উল্লেখযোগ্য ভাবে বৃদ্ধি পায়।
দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারী। তাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত না করলে জনসম্পদ উন্নয়ন কখনোই পূর্ণতা পাবে না।
নারীদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ, প্রযুক্তি শিক্ষা, উদ্যোক্তা সহায়তা, মাতৃত্বকালীন সুবিধা এবং নেতৃত্ব বিকাশের সুযোগ বাড়াতে হবে। নারীকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সুযোগ দিলে পরিবার, সমাজ এবং জাতীয় অর্থনীতি- সব ক্ষেত্রেই ইতিবাচক পরিবর্তন আসে।
জনসম্পদ শুধু প্রযুক্তিগত দক্ষতা দিয়ে গড়ে ওঠে না। একজন দক্ষ কিন্তু দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তি রাষ্ট্রের জন্য সম্পদ নয়; বরং বোঝা।
তাই শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের পাশাপাশি সততা, দায়িত্ববোধ, আইন মানার সংস্কৃতি, সামাজিক সহমর্মিতা এবং দেশপ্রেমের মূল্যবোধও গড়ে তুলতে হবে।
একজন সৎ, দক্ষ ও কর্মনিষ্ঠ নাগরিকই প্রকৃত জনসম্পদ।
বাংলাদেশের সামনে আজ এক অনন্য সুযোগ রয়েছে। এই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে জনসংখ্যাকে দক্ষ, শিক্ষিত, সুস্থ, প্রযুক্তিজ্ঞানসম্পন্ন এবং কর্মমুখী মানবসম্পদে রূপান্তর করতে হবে। কর্মসংস্থান, কারিগরি শিক্ষা, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, আধুনিক কৃষি, তথ্যপ্রযুক্তি, বৈদেশিক কর্মসংস্থান এবং নারীর ক্ষমতায়ন- এসব ক্ষেত্রেই সরকারের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা ও কার্যকর বাস্তবায়ন অপরিহার্য।
রাষ্ট্র যদি সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এবং উন্নয়নের প্রতিটি স্তরে মানুষের সক্ষমতা বৃদ্ধিকে অগ্রাধিকার দেয়, তাহলে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ হবে তার জনগণ।
বাংলাদেশের সামনে জনসম্পদ উন্নয়নের অপার সম্ভাবনা থাকলেও বাস্তবায়নের পথে নানা প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা না করলে জনসংখ্যাকে জনসম্পদে রূপান্তরের লক্ষ্য পূরণ করা কঠিন হবে।
প্রথমত, বেকারত্ব ও অর্ধ-বেকারত্ব একটি বড় সমস্যা। প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী শিক্ষা শেষ করে শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও সবার জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি হয় না। অনেকেই তাদের শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কাজ পান না, আবার অনেকে কম দক্ষতার কাজ করতে বাধ্য হন। এতে ব্যক্তিগত সম্ভাবনা যেমন অপচয় হয়, তেমনি রাষ্ট্রও কাঙ্ক্ষিত উৎপাদনশীলতা থেকে বঞ্চিত হয়।
দ্বিতীয়ত, শিক্ষা ও শ্রমবাজারের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এখনও এমন পাঠ্যক্রম চালু আছে যা আধুনিক শিল্প, প্রযুক্তি ও বৈশ্বিক বাজারের চাহিদার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে ডিগ্রি থাকলেও বাস্তব দক্ষতার অভাব দেখা দেয়।
তৃতীয়ত, দুর্নীতি, প্রশাসনিক জটিলতা ও সেবার মানের বৈষম্য উন্নয়নের গতি কমিয়ে দেয়। নিয়োগ, প্রশিক্ষণ, বিনিয়োগ বা উদ্যোক্তা সহায়তায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে জনসম্পদ উন্নয়নের সুফল সীমিত হয়ে পড়ে।
সুশাসন ছাড়া মানবসম্পদ উন্নয়নের কোনো উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে সফল হতে পারে না। একটি কার্যকর রাষ্ট্রব্যবস্থা এমন পরিবেশ তৈরি করে, যেখানে আইনের শাসন, জবাবদিহি, দক্ষ প্রশাসন এবং সমান সুযোগ নিশ্চিত হয়।
সরকারের প্রতিটি উন্নয়ন কর্মসূচিতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। প্রকল্প গ্রহণের আগে বাস্তব চাহিদা মূল্যায়ন, বাস্তবায়নের সময় নিয়মিত তদারকি এবং কাজ শেষে নিরপেক্ষ মূল্যায়নের ব্যবস্থা থাকতে হবে।
যেখানে যোগ্যতা মূল্যায়নের প্রধান মানদণ্ড হবে, সেখানে তরুণদের মধ্যে আস্থা বাড়বে। তারা বিশ্বাস করবে যে মেধা, দক্ষতা ও পরিশ্রমের মূল্য আছে। এই বিশ্বাসই একটি জাতিকে এগিয়ে নিয়ে যায়।
বিশ্বের উন্নত দেশগুলো শুধু শ্রমনির্ভর নয়; তারা জ্ঞাননির্ভর অর্থনীতি গড়ে তুলেছে। বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও প্রযুক্তি খাতের মধ্যে শক্তিশালী সম্পর্ক গড়ে উঠেছে বলেই তারা নতুন নতুন উদ্ভাবন করতে সক্ষম হয়েছে।
বাংলাদেশেও গবেষণা, উদ্ভাবন এবং প্রযুক্তি উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি। বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাকে শিল্পের প্রয়োজনের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। তরুণ গবেষক, উদ্ভাবক ও প্রযুক্তি উদ্যোক্তাদের জন্য অনুদান, গবেষণা তহবিল এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।
একজন দক্ষ গবেষক বা উদ্ভাবক কেবল একটি পণ্যই তৈরি করেন না; তিনি নতুন শিল্প, নতুন কর্মসংস্থান এবং নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দ্বারও উন্মুক্ত করেন।
যুবসমাজ একটি দেশের সবচেয়ে প্রাণবন্ত শক্তি। এই শক্তিকে যদি সঠিক পথে পরিচালিত করা যায়, তবে তারা জাতীয় উন্নয়নের চালিকাশক্তি হয়ে ওঠে। আর যদি তারা হতাশা, বেকারত্ব, মাদকাসক্তি, অপরাধ বা চরমপন্থার দিকে ধাবিত হয়, তবে সমাজ ও রাষ্ট্র উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
তাই সরকারের পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠন এবং গণমাধ্যমেরও দায়িত্ব রয়েছে যুবসমাজকে নৈতিকতা, মানবিকতা, দেশপ্রেম এবং সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে উদ্বুদ্ধ করার।
জনসম্পদ উন্নয়নের পুরো দায়িত্ব শুধু কেন্দ্রীয় সরকারের নয়। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও কার্যকর করতে হবে, যাতে তারা নিজ নিজ এলাকার কর্মসংস্থান, প্রশিক্ষণ, কৃষি, ক্ষুদ্র শিল্প ও উদ্যোক্তা উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে।
একইভাবে বেসরকারি খাতকেও দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে অংশীদার হতে হবে। শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথভাবে প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করতে পারে। এতে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার পাশাপাশি বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ পাবে।
বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের অনেকেই আন্তর্জাতিক মানের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। দেশে ফিরে তাদের সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর জন্য বিশেষ নীতি প্রয়োজন।
তাদের বিনিয়োগে উৎসাহ, উদ্যোক্তা সহায়তা, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং দক্ষতা প্রশিক্ষণের সুযোগ তৈরি করা হলে দেশ উপকৃত হবে। প্রবাসী বাংলাদেশিদের শুধু বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের উৎস হিসেবে নয়, জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার হিসেবেও মূল্যায়ন করা উচিত।
মানবসম্পদ উন্নয়ন একদিনে সম্ভব নয়। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। তাই সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নীতির মৌলিক পরিবর্তন না করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দক্ষতা উন্নয়ন, গবেষণা ও কর্মসংস্থান নিয়ে সর্বদলীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন।
যে পরিকল্পনা ২০–৩০ বছরের লক্ষ্য নির্ধারণ করবে এবং ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়িত হবে, সেটিই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য টেকসই ভিত্তি গড়ে তুলতে পারে।
যদিও জনসংখ্যাকে জনসম্পদে পরিণত করার নেতৃত্ব সরকারের, তবুও নাগরিকদেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
প্রত্যেক নাগরিকের উচিত-
* নিয়মিত শিক্ষা ও দক্ষতা অর্জনে আগ্রহী হওয়া।
* আইন মেনে চলা।
* দুর্নীতিকে নিরুৎসাহিত করা।
* কর্মকে মর্যাদা দেওয়া।
* নতুন প্রযুক্তি শেখা।
* উদ্যোক্তা হওয়ার সাহস অর্জন করা।
* সামাজিক সম্প্রীতি ও মানবিক মূল্যবোধ চর্চা করা।
রাষ্ট্র সুযোগ সৃষ্টি করবে, কিন্তু সেই সুযোগ কাজে লাগানোর দায়িত্ব নাগরিকদেরও।
একটি দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ তার মানুষ। প্রাকৃতিক সম্পদ সীমিত হতে পারে, কিন্তু দক্ষ, সৎ, সুস্থ ও কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী একটি জাতিকে বিশ্বদরবারে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।
বাংলাদেশের জনসংখ্যা যদি সঠিক শিক্ষা, আধুনিক দক্ষতা, উন্নত স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তিগত জ্ঞান এবং নৈতিক মূল্যবোধের মাধ্যমে গড়ে ওঠে, তবে এই জনগোষ্ঠীই হবে দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং টেকসই উন্নয়নের প্রধান ভিত্তি।
জনসংখ্যাকে জনসম্পদে পরিণত করা নিঃসন্দেহে সরকারের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। তবে এই দায়িত্ব সফলভাবে পালন করতে হলে সরকার, বেসরকারি খাত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পরিবার এবং নাগরিক- সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। সমন্বিত উদ্যোগই পারে একটি সম্ভাবনাময় জনগোষ্ঠীকে জাতীয় শক্তিতে রূপান্তর করতে।
আজকের বিশ্বে যে রাষ্ট্র মানুষের ওপর বিনিয়োগ করে, আগামী দিনের নেতৃত্ব সেই রাষ্ট্রই দেয়। তাই বাংলাদেশের উন্নয়নের মূলমন্ত্র হওয়া উচিত-
"মানুষে বিনিয়োগই সর্বোচ্চ বিনিয়োগ, আর দক্ষ মানবসম্পদই একটি জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ সম্পদ।"
ওমায়ের আহমেদ শাওন
(লেখক, উদ্যোক্তা ও গণমাধ্যম বিশ্লেষক)









