চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৫ বছরে বিজ্ঞাপিত পদের বাইরে ১৪৫ শিক্ষক নিয়োগ: স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন, তদন্তের আশ্বাস

প্রকাশিত: ০৯ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:০৩ পিএম
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৫ বছরে বিজ্ঞাপিত পদের বাইরে ১৪৫ শিক্ষক নিয়োগ: স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন, তদন্তের আশ্বাস

আহমেদ মুনহা, চবি প্রতিনিধি:

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) গত ১৫ বছরে বিজ্ঞাপিত পদের বাইরে অতিরিক্ত ১৪৫ জন শিক্ষক নিয়োগের তথ্য সামনে এসেছে। এই নিয়োগকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও নীতিমালার যথাযথ প্রয়োগ নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্ট মহলের অভিযোগ, এসব নিয়োগের বড় একটি অংশে রাজনৈতিক প্রভাব, ব্যক্তিস্বার্থ ও প্রশাসনিক অনিয়ম ভূমিকা রেখেছে।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ১৯ মার্চ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করা পাঁচ উপাচার্যের মেয়াদকালে এসব নিয়োগ দেওয়া হয়। এর মধ্যে অধ্যাপক মো. আনোয়ারুল আজিম আরিফের সময়ে সর্বোচ্চ ৭০ জন, অধ্যাপক ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরীর সময়ে ৩৭ জন এবং অধ্যাপক ড. শিরীণ আখতারের সময়ে ৩৪ জন শিক্ষক বিজ্ঞাপিত পদের অতিরিক্ত হিসেবে নিয়োগ পান। সাবেক উপাচার্য ড. আবু ইউসুফের সময়ে নিয়োগ দেওয়া হয় ৪ জন।

নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ

অভিযোগ রয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে নিয়োগ বোর্ড গঠনে নিয়ম মানা হয়নি। সংশ্লিষ্ট বিভাগের জ্যেষ্ঠ শিক্ষকদের বাদ দিয়ে অন্য বিভাগের শিক্ষকদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এতে করে নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এছাড়া উপাচার্যের পছন্দের প্রার্থীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে, যার ফলে প্রকৃত যোগ্য প্রার্থীরা বঞ্চিত হয়েছেন বলে দাবি করা হচ্ছে।

প্রায় সব অনুষদেই অতিরিক্ত নিয়োগ

বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ও মানববিদ্যা, বিজ্ঞান, ব্যবসায় শিক্ষা, সমাজবিজ্ঞান, জীববিজ্ঞান, প্রকৌশল এবং মেরিন সায়েন্সেস—প্রায় সব অনুষদেই বিজ্ঞাপিত পদের বাইরে শিক্ষক নিয়োগের নজির পাওয়া গেছে। বিভিন্ন সিন্ডিকেট সভার মাধ্যমে এসব নিয়োগ অনুমোদিত হয়।

কলা ও মানববিদ্যা অনুষদের বাংলা, নাট্যকলা, আরবি, পালি, চারুকলা, ইতিহাস, সংগীত, ইংরেজি ও শিক্ষা গবেষণা ইনস্টিটিউটসহ একাধিক বিভাগে অতিরিক্ত নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। একইভাবে বিজ্ঞান অনুষদের পদার্থবিদ্যা, গণিত, মৃত্তিকা বিজ্ঞান ও বন ও পরিবেশ বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটেও এমন নিয়োগের তথ্য পাওয়া গেছে।

ব্যবসায় অনুষদের ফাইন্যান্স, অ্যাকাউন্টিং, ম্যানেজমেন্ট ও মার্কেটিং বিভাগেও অতিরিক্ত নিয়োগ হয়েছে। সমাজবিজ্ঞান অনুষদের সমাজতত্ত্ব, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, নৃবিজ্ঞান, যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা, রাষ্ট্রবিজ্ঞান এবং উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগেও একই চিত্র দেখা যায়।

এছাড়া জীববিজ্ঞান অনুষদের বিভিন্ন বিভাগ—মাইক্রোবায়োলজি, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং, প্রাণিবিদ্যা, ফার্মেসিসহ একাধিক বিভাগে অতিরিক্ত নিয়োগ হয়েছে। প্রকৌশল অনুষদের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ এবং মেরিন সায়েন্সেস অনুষদের ইনস্টিটিউট অব মেরিন সায়েন্সেস ও ওশানোগ্রাফি বিভাগেও একই প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে।

বিভিন্ন পক্ষের ভিন্নমত

এ বিষয়ে বিভাগীয় সভাপতিদের মধ্যে মতভেদ দেখা গেছে। কেউ কেউ বলছেন, শিক্ষক সংকট এবং উচ্চশিক্ষার জন্য শিক্ষকদের বিদেশে যাওয়ার কারণে জরুরি প্রয়োজনেই অতিরিক্ত নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, অনেকের মতে এটি নিয়মবহির্ভূত ও অনৈতিক। তাদের দাবি, প্রয়োজন অনুযায়ী পদ সৃষ্টি করে বিজ্ঞপ্তি দিয়েই নিয়োগ দেওয়া উচিত।

সাবেক উপাচার্য ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী বলেন,

“বিভাগের প্রয়োজন অনুযায়ী বিজ্ঞাপিত পদের বাইরে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার বিধান বিশ্ববিদ্যালয়ের শুরু থেকেই রয়েছে। সিলেকশন বোর্ড সুপারিশ করলে এবং সিন্ডিকেট অনুমোদন দিলে তা বৈধ হিসেবে গণ্য হয়।”

অন্যদিকে প্রশাসনের একটি সূত্র জানায়, অতীতে এ ধরনের নিয়োগ নিয়ে মামলা হলেও আদালত বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষেই রায় দিয়েছেন। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) একাধিকবার তদন্ত করলেও শেষ পর্যন্ত অর্থ মঞ্জুরি দিয়ে এসব নিয়োগ নিয়মিত করা হয়েছে।

তদন্তের আশ্বাস বর্তমান প্রশাসনের

বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল-ফোরকান বলেন,

“পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। যদি কোনো অনিয়ম পাওয়া যায়, তাহলে ইউজিসির পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

তিনি আরও বলেন, “বিভাগের প্রয়োজন থাকলে অতিরিক্ত নিয়োগ হতে পারে, তবে তা কোনোভাবেই অনিয়ন্ত্রিত বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হওয়া উচিত নয়।”

এ বিষয়ে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

সারসংক্ষেপে, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিজ্ঞাপিত পদের বাইরে শিক্ষক নিয়োগের এই প্রবণতা উচ্চশিক্ষা প্রশাসনে নীতিমালা প্রয়োগ ও সুশাসনের প্রশ্নকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। এখন দেখার বিষয়, তদন্ত শেষে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এ বিষয়ে কী পদক্ষেপ গ্রহণ করে।