সরবরাহে স্বস্তি, বাজারে অস্থিরতা: রমজান ঘিরে দামের চোখ রাঙানি

প্রকাশিত: ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৪:১১ পিএম
সরবরাহে স্বস্তি, বাজারে অস্থিরতা: রমজান ঘিরে দামের চোখ রাঙানি

‎মোহাম্মদ ইব্রাহিম, রিপোর্টার চট্টগ্রাম :

পবিত্র রমজান গত কাল থেকে শুরু হলো। এ উপলক্ষে চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জে এখন চরম ব্যস্ততা। সকাল থেকেই বাজারের প্রধান সড়কজুড়ে সারিবদ্ধ ট্রাক, মাল খালাসে ব্যস্ত শ্রমিক আর আড়তদারদের দৌড়ঝাঁপ জানিয়ে দিচ্ছে রমজানকেন্দ্রিক বেচাকেনা পুরোদমে জমে উঠেছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ট্রাকে ট্রাকে আসছে ছোলা, চিনি, ডাল, খেজুর, ভোজ্যতেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য।

‎তবে সরবরাহে স্বস্তির এই চিত্রের মাঝেই দামে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। পাইকারি পর্যায়ে পণ্যের পর্যাপ্ততা থাকলেও খুচরা বাজারে কিছু পণ্যের উর্ধ্বমুখী দাম সাধারণ ক্রেতাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলছে।

‎ব্যবসায়ীরা বলছেন, রমজানের প্রধান পণ্যগুলোর সরবরাহ মোটামুটি সন্তোষজনক, কোনো কোনো ক্ষেত্রে চাহিদার তুলনায় দ্বিগুণ। তবুও সপ্তাহের ব্যবধানে কিছু ডালজাতীয় পণ্যের দাম বেড়েছে। বর্তমানে প্রতি কেজি ছোলা বিক্রি হচ্ছে ৭২ থেকে ৮২ টাকায়, যা এক সপ্তাহ আগে ৫–৭ টাকা কম ছিল। খেসারি ডালের দামও কেজিতে ৫ টাকা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৫ থেকে ৭৭ টাকায়।

‎দাম বৃদ্ধির কারণ হিসেবে ব্যবসায়ীরা বন্দরকেন্দ্রিক আন্দোলন ও নির্বাচনী পরিস্থিতির কারণে পণ্য ওঠানামায় বিঘ্নের কথা উল্লেখ করেছেন। চিনির বাজারেও অস্থিরতা রয়েছে; সপ্তাহের ব্যবধানে কেজিতে প্রায় ৬ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে।

‎খাতুনগঞ্জ আড়তদার সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আহসান উল্লাহ জাহেদী বলেন, দেশে এখন পেঁয়াজের মৌসুম চলায় সরবরাহ ভালো। রমজান সামনে রেখে বেচাকেনা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। বর্তমানে পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে কেজিতে ৪৫ থেকে ৫৫ টাকায়।

খেজুরে পাইকারি-খুচরায় ভিন্ন চিত্র

‎রমজানের ইফতারের অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ খেজুর। দেশে বছরে প্রায় ৯৫ হাজার টন খেজুরের চাহিদার বড় অংশই রমজানে পূরণ হয়। পাইকারি পর্যায়ে আমদানি বেশি হওয়ায় গত বছরের তুলনায় কিছু জাতের খেজুরের দাম ১৫ থেকে ৩০ শতাংশ কমেছে বলে ব্যবসায়ীরা দাবি করছেন। তবে খুচরা বাজারে দেখা যাচ্ছে উল্টো চিত্র—গত এক সপ্তাহে ধরনভেদে কেজিতে ২০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে।

‎বর্তমানে জাহিদী খেজুর বিক্রি হচ্ছে ২৮০ টাকা, বরই ৪৮০–৫০০ টাকা, দাব্বাস ৫০০ টাকা এবং উন্নতমানের মেডজুল ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকায়। খুচরা বিক্রেতাদের দাবি, পাইকারি বাজারেই তাদের বেশি দামে কিনতে হচ্ছে।

ফলে শুল্কের প্রভাব

‎ফল আমদানিতে উচ্চ শুল্কের প্রভাব পড়েছে আপেল, কমলা ও আনারের দামে। আমদানিকারকদের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি কেজি বিদেশি ফলে ১২৫ থেকে ১৬০ টাকা পর্যন্ত শুল্ক দিতে হয়। ফলে খুচরা বাজারে কেজিতে ৪০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে।

তেলের বাজারে অস্থিরতার আশঙ্কা

‎রমজানের আগে সয়াবিন তেলের বাজারে অস্থিরতার ইঙ্গিত মিলছে। গত এক সপ্তাহে প্রতি মণে সয়াবিন তেলের দাম প্রায় ২০০ টাকা বেড়েছে। বর্তমানে খোলা সয়াবিন তেল প্রতি মণ ৭ হাজার ৫০ টাকায় এবং পামঅয়েল ৫ হাজার ৯০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পাইকারি বিক্রেতাদের অভিযোগ, মিল থেকে সরবরাহ কম এবং বাজারে সীমিত কয়েকটি গ্রুপের তেল পাওয়া যাচ্ছে।

‎চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর উদ্ভিদ সংগনিরোধ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, গত নভেম্বর মাসে সয়াবিন তেল আমদানি হয়েছে ১ লাখ ৪৩ হাজার ২৮৭ মেট্রিক টন, ডিসেম্বরে ৩ লাখ ২৩ হাজার ৫২০ মেট্রিক টন এবং জানুয়ারিতে ৩ লাখ ৩১ হাজার ১০৩ মেট্রিক টন। আমদানির পরিমাণ বাড়লেও আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধি ও বুকিং কমে যাওয়ার প্রভাব স্থানীয় বাজারে পড়ছে বলে জানিয়েছেন আমদানিকারকরা।

‎খাতুনগঞ্জ পামঅয়েলের প্রধান পাইকারি কেন্দ্র। এখানে শতাধিক পাইকারি তেল ব্যবসায়ী ও কয়েকশ ব্রোকার সক্রিয়। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, ডিও (ডেলিভারি অর্ডার) ও স্লিপ বেচাকেনাকে কেন্দ্র করে বাজারে অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে। নির্ধারিত সময়ে পণ্য ডেলিভারি না হওয়া এবং ডিওর মেয়াদ দীর্ঘায়িত হওয়ায় কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি হয়। একটি ডিও ছয়-সাত মাস পর্যন্ত ব্যবহার হচ্ছে, যা নিয়মবহির্ভূত। স্লিপ হাতবদলের মাধ্যমেও দামের ওপর প্রভাব পড়ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রশাসনের নজরদারি জোরদার না হলে রমজানের আগে তেলের বাজার আরও অস্থির হতে পারে।

টিসিবির আশ্বাস

‎এদিকে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) চট্টগ্রাম কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘পবিত্র রমজান উপলক্ষে পর্যাপ্ত পরিমাণে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য মজুত রয়েছে। ছোলা, চিনি, ডাল, ভোজ্যতেলসহ সব পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক আছে। কোনো সংকট নেই। নিয়মিতভাবে নতুন পণ্য আসছে এবং নির্ধারিত কার্যক্রম অনুযায়ী তা বিতরণ করা হচ্ছে।’

‎সরবরাহের ইতিবাচক বার্তা থাকলেও খুচরা বাজারে দামের লাগাম টানতে কার্যকর নজরদারি ও সমন্বিত উদ্যোগের দিকে তাকিয়ে আছেন সাধারণ ক্রেতারা।



বা/মে২৪/ম