মধ্যরাতে ভবন ঘেরাও ডিবির, স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে রক্ষায় হুলুস্থুল কাণ্ড করলেন নেতা-কর্মীরা

প্রকাশিত: ২৮ জুন ২০২৬, ১০:২৯ পিএম
মধ্যরাতে ভবন ঘেরাও ডিবির, স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে রক্ষায় হুলুস্থুল কাণ্ড করলেন নেতা-কর্মীরা

রাজশাহী ব্যুরো:

রাজশাহী মহানগরের নিউমার্কেট এলাকায় মধ্যরাতে ডিবি পুলিশের একটি অভিযানের পর হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি ও মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক মীর তারেক পুলিশের উপস্থিতিতেই ভবন থেকে বেরিয়ে যেতে সক্ষম হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। প্রায় দুই ঘণ্টা ভবন ঘিরে রাখার পর পুলিশ সরে গেলে দলীয় নেতাকর্মীরা আহত অবস্থায় তাকে সেখান থেকে বের করে নিয়ে যান। পুরো ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দেয়।

শনিবার (দিবাগত রাত) রাজশাহী মহানগরীর বোয়ালিয়া থানাধীন নিউমার্কেট এলাকার একটি ছয়তলা ভবনে এ ঘটনা ঘটে।

মীর তারেক রাজশাহী মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক। তিনি গত বছরের ৭ মার্চ নগরের দড়িখড়বোনা এলাকায় সংঘটিত রিকশাচালক গোলাম হোসেন হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, মামলায় তিনি এখনো গ্রেপ্তার হননি এবং আদালত থেকেও জামিন নেননি।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, শনিবার রাত পৌনে ১১টার দিকে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) একটি দল নিউমার্কেট এলাকার ছাত্রদল নেতা আসাসের বাসা অবস্থিত ভবনটি ঘিরে ফেলে। এ সময় মীর তারেক পাশের ভবনের ছাদে লাফ দিয়ে আশ্রয় নেন। এতে তার ডান পা ভেঙে যায় বলে জানা যায়। একই ঘটনায় তার সঙ্গে থাকা আরেকজনও আহত হন।

ঘটনার সময় মীর তারেক নিজের ফেসবুক আইডি থেকে লাইভে এসে দাবি করেন, পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করতে এসেছে এবং নেতাকর্মীদের ঘটনাস্থলে আসার আহ্বান জানান। তার ওই আহ্বানের পরপরই শতাধিক নেতাকর্মী ভবনের সামনে জড়ো হয়ে পুলিশের বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে থাকেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত পুলিশ ও আরএমপির ক্রাইসিস রেসপন্স টিম (সিআরটি) ঘটনাস্থলে মোতায়েন করা হয়।

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, রাত প্রায় ১২টা ৫৫ মিনিটে ডিবি পুলিশ ধীরে ধীরে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। এরপর রাত ১টার দিকে মোটরসাইকেলের বহর নিয়ে নেতাকর্মীরা ঘটনাস্থলে এসে ভবনের তালা ভেঙে আহত মীর তারেককে বের করে নিয়ে যান। অভিযোগ রয়েছে, বের করে নেওয়ার আগে ভবনের সিসিটিভি ক্যামেরা আড়াল করারও চেষ্টা করা হয়। এ সময় দায়িত্ব পালনরত কয়েকজন সাংবাদিককে ছবি ও ভিডিও ধারণে বাধা দেওয়া হয় এবং মোবাইল ফোন ভেঙে দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।

ঘটনার বিষয়ে রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের মুখপাত্র অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার গাজিউর রহমান দাবি করেন, ডিবি পুলিশের ওই অভিযান মীর তারেককে গ্রেপ্তারের জন্য ছিল না। তার ভাষ্য, পুলিশ অন্য এক আসামিকে ধরতে সেখানে গিয়েছিল। তবে মীর তারেক ভুল বুঝে আত্মগোপনের চেষ্টা করেন। কাঙ্ক্ষিত আসামিকে না পাওয়ায় পুলিশ ফিরে আসে।

তবে পুলিশের এই বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় সচেতন মহল। তাদের প্রশ্ন, যদি অভিযানের লক্ষ্য মীর তারেক না-ও হয়ে থাকে, তাহলে হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত একজন পলাতক আসামি ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পরও কেন তাকে গ্রেপ্তারের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি?

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত ২১ জুন শাহ মখদুম থানার ছায়ানীড় এলাকায় ফয়সাল বাঁধন নামে এক যুবক গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনায় একটি অবৈধ পিস্তল, ম্যাগাজিন, গুলির খোসা ও বিস্ফোরক উদ্ধার করা হয়েছিল। ওই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে।

অন্যদিকে, গত বছরের রিকশাচালক গোলাম হোসেন হত্যা মামলার নথি অনুযায়ী, মীর তারেক ওই মামলার অন্যতম এজাহারভুক্ত আসামি। সংশ্লিষ্ট থানার তথ্য অনুযায়ী, মামলার কোনো আসামিকেই এখন পর্যন্ত গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি।

ঘটনার সময় ফেসবুক লাইভে মীর তারেক বলেন, তিনি আইনকে সম্মান করেন এবং পুলিশ ডাকলে হাজির হতেন। তার দাবি, তাকে অযথা গ্রেপ্তারের চেষ্টা করা হয়েছে। তবে পরে তার ফেসবুক লাইভটি মুছে ফেলা হয়।

মধ্যরাতের এই অভিযানে পুলিশের অবস্থান, হত্যা মামলার একজন আসামির পুলিশের সামনেই ঘটনাস্থল ত্যাগ এবং সাংবাদিকদের বাধা দেওয়ার অভিযোগ—সব মিলিয়ে ঘটনাটি নিয়ে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা ও পুরো ঘটনার প্রকৃত সত্য উদঘাটনে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল।