মধু আহরণ ছয় বছরের সর্বনিম্নে: বনদস্যু আতঙ্ক ও জলবায়ুর দ্বিমুখী চাপে বিপন্ন মৌয়ালরা
প্রিন্স মন্ডল অলিফ, বাগেরহাট প্রতিনিধি:
চলতি মৌসুমে সুন্দরবন থেকে মধু আহরণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১ এপ্রিল থেকে ৩১ মে পর্যন্ত দুই মাসে সুন্দরবন থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে মাত্র ১ হাজার ৭৩৮ কুইন্টাল মধু, যা গত ছয় বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় উৎপাদন কমেছে প্রায় ৪৫ শতাংশ। বনদস্যুদের পুনরুত্থান, নিরাপত্তাহীনতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবকে এই উৎপাদন হ্রাসের প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
বন বিভাগের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৫ সালে একই সময়ে সুন্দরবন থেকে ২ হাজার ৭৬ কুইন্টাল মধু সংগ্রহ করা হয়েছিল। সে হিসাবে চলতি বছরে উৎপাদন কমেছে ৩৩৮ কুইন্টাল। সাতক্ষীরা, খুলনা, চাঁদপাই ও শরণখোলা—এই চারটি বন রেঞ্জেই মধু সংগ্রহের পরিমাণ কমেছে। উৎপাদন কমে যাওয়ায় সরকারের রাজস্ব আয়ও নেমে এসেছে ৩৯ লাখ ৩১ হাজার ২৭০ টাকায়। এর ফলে যেমন সরকারি রাজস্ব ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনি সুন্দরবননির্ভর হাজারো মৌয়াল ও বনজীবী পরিবারের আয়ের পথও সংকুচিত হয়ে পড়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, মধু উৎপাদন কমে যাওয়ার অন্যতম বড় কারণ হলো মৌয়ালের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পাওয়া। ২০২৪ সালে যেখানে প্রায় ৮ হাজার মৌয়াল সুন্দরবনে প্রবেশ করেছিলেন, সেখানে চলতি বছর সেই সংখ্যা নেমে এসেছে মাত্র ৩ হাজার ৪৭৯ জনে। অর্থাৎ মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে মৌয়ালের সংখ্যা অর্ধেকেরও বেশি কমে গেছে।
মৌয়ালরা বলছেন, এখন বাঘের ভয়কে ছাড়িয়ে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে বনদস্যুদের তৎপরতা। নিরাপত্তাহীনতার কারণে অনেক অভিজ্ঞ মৌয়াল এবার বনের গভীরে যেতে সাহস করেননি। ফলে উৎপাদনও কমে গেছে। বন বিভাগের তথ্য বলছে, শরণখোলা ও খুলনা রেঞ্জে মাথাপিছু মধু সংগ্রহের হার প্রায় আগের মতো থাকলেও মৌয়ালের সংখ্যা কমে যাওয়ায় মোট উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। এর প্রভাব ইতোমধ্যে বাজারেও পড়েছে। খলিশা ও গরান ফুলের মধুর দাম গত বছরের তুলনায় প্রতি মণে প্রায় ৭ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে, যা সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও উৎপাদন হ্রাসে বড় ভূমিকা রাখছে। পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত না হওয়ায় গাছে ফুল কম ফুটছে। আবার অস্বাভাবিক আবহাওয়ার কারণে অনেক ফুল সময়ের আগেই ঝরে পড়ছে। ফলে মৌমাছিরা প্রয়োজনীয় পরিমাণ মধু সংগ্রহ করতে পারছে না। এতে স্বাভাবিকভাবেই কমে যাচ্ছে মৌচাকের উৎপাদন।
বন বিভাগের কর্মকর্তারাও স্বীকার করেছেন, মৌয়ালের সংখ্যা কমে যাওয়ায় এ বছর রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা সম্ভব হয়নি। এ বিষয়ে পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এ জেড এম হাছানুর রহমান বলেন, বনদস্যু দমনে র্যাব, কোস্টগার্ড ও পুলিশের সমন্বয়ে যৌথ অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তবে স্থানীয়দের দাবি, শুধুমাত্র অভিযান পরিচালনা করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। বনজীবীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
উল্লেখ্য, সুন্দরবনের মধু জিআই (Geographical Indication) স্বীকৃতি পাওয়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারে এর ব্যাপক সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু উৎপাদনের এই ধারাবাহিক পতন সেই সম্ভাবনাকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে। সুন্দরবন ও উপকূল সংরক্ষণ আন্দোলনের নেতারা সতর্ক করে বলেছেন, বনদস্যুদের দৌরাত্ম্য নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবেশগত সংকট মোকাবিলায় দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে সুন্দরবনের ঐতিহ্যবাহী মৌয়াল পেশা মারাত্মক সংকটে পড়বে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হবে বননির্ভর মানুষের জীবন-জীবিকা এবং সুন্দরবনের সামগ্রিক বাস্তুসংস্থান। তাই নিরাপত্তা জোরদার, বনজীবীদের সুরক্ষা নিশ্চিত এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ গ্রহণ এখন সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দাবি।









