বিএসসিতে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ, ইউসুফ-জিয়াসহ ৪ জনকে মন্ত্রণালয়ের তলব

প্রকাশিত: ২৮ জুলাই ২০২৬, ১১:৫১ পিএম
বিএসসিতে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ, ইউসুফ-জিয়াসহ ৪ জনকে মন্ত্রণালয়ের তলব

মোহাম্মদ ইব্রাহিম, চট্টগ্রাম প্রতিনিধি: 

রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশনে (বিএসসি) নাবিক নিয়োগে অনিয়ম ও ঘুষ, পদোন্নতিতে বিধিবহির্ভূত প্রক্রিয়া, জাহাজ মেরামতের নামে কোটি কোটি টাকা ব্যয়, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলার অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগে বিএসসির কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পর প্রায় ১০ মাসের মাথায় এ বিষয়ে শুনানির তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে।



অভিযোগ করেছেন বিএসসির মহাব্যবস্থাপক (দূরপ্রাচ্য ও পশ্চিম এশিয়া) মো. আতাউর রহমান। তাঁর লিখিত অভিযোগে বিএসসির নির্বাহী পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ ইউসুফ, মহাব্যবস্থাপক (চলতি দায়িত্ব) মো. জিয়াউর রহমান চৌংসহ কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ তোলা হয়েছে।



নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, অভিযোগ পাওয়ার পর ২০২৫ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর যুগ্মসচিব (জাহাজ) মোহাম্মদ এমরান হোসেনকে তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তদন্তের অংশ হিসেবে চলতি মাসের গত ১৫ জুলাই জারি করা নোটিশে আগামী ২৯ জুলাই সকাল ১১টায় মন্ত্রণালয়ে শুনানির জন্য সংশ্লিষ্টদের উপস্থিত হতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে তাঁদের লিখিত বক্তব্য ও স্বপক্ষের প্রমাণাদি নিয়ে উপস্থিত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।



নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে দেওয়া লিখিত অভিযোগে বিএসসির নির্বাহী পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ ইউসুফ এবং তৎকালীন জাহাজ মেরামত বিভাগের কর্মকর্তা, বর্তমানে শিপ পার্সোনেল বিভাগের মহাব্যবস্থাপক মো. জিয়াউর রহমানের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার ও যোগসাজশের অভিযোগ করা হয়েছে।



অভিযোগে বলা হয়েছে, বিএসসির একজন স্থায়ী প্রধান প্রকৌশলীকে (চিফ ইঞ্জিনিয়ার) প্রায় এক বছর ‘অন-স্টাফ’ হিসেবে অফিসে রাখা হয়। অভিযোগকারীর দাবি, বিদ্যমান বিধি অনুযায়ী কোনো জাহাজী কর্মকর্তাকে তিন মাসের বেশি সময় অন-স্টাফ রাখার সুযোগ নেই। তবে ওই কর্মকর্তার ক্ষেত্রে নির্ধারিত সময়সীমা অতিক্রম করে মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে।



অভিযোগ অনুযায়ী, ওই সময় ঘুষের বিনিময়ে ছয়জনকে চুক্তিভিত্তিক চিফ ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তাঁদের মধ্যে দুজনের মাসিক বেতন ১২ হাজার ৫০০ মার্কিন ডলার এবং অপর চারজনের মাসিক বেতন ১২ হাজার মার্কিন ডলার নির্ধারণ করা হয়।



অভিযোগকারী দাবি করেছেন, স্থায়ী কর্মকর্তাকে অন-স্টাফ রাখার কারণে তাঁর বেতন বাবদ বিএসসির প্রায় ১৪ লাখ ৭০ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। অন্যদিকে চুক্তিভিত্তিক ছয় চিফ ইঞ্জিনিয়ারের পেছনে বছরে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার মার্কিন ডলার ব্যয় হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।



অভিযোগে এসব নিয়োগের কারণে বিএসসির আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।



অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়েছে, ঘুষের মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া অদক্ষ কর্মকর্তাদের কারণে বিএসসির জাহাজগুলো বিদেশি বন্দরে জরিমানা ও ডিমেরিট পয়েন্টের মুখে পড়ছে।



অভিযোগকারীর দাবি, এসব কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে বিএসসির জাহাজ উচ্চমূল্যে চার্টার দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।



অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, কয়েক মাস আগে একটি জাহাজ দুর্ঘটনার কবলে পড়ার পর সেটি উদ্ধারে প্রায় ৩ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে।



অভিযোগকারী এসব ঘটনার সঙ্গে বিএসসির নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়মের সম্পর্ক থাকার দাবি করেছেন।



বিএসসির মেরিন ওয়ার্কশপের অপারেটিভ কর্মচারীদের পদোন্নতি নিয়েও অভিযোগ করা হয়েছে।



অভিযোগপত্র অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি বিএসসি মেরিন ওয়ার্কশপের অপারেটিভ কর্মচারীদের পদোন্নতি কমিটির সভার আগে বিধিবহির্ভূতভাবে একটি বাছাই উপকমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটির সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন বিএসসির নির্বাহী পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ ইউসুফ।



অভিযোগে বলা হয়েছে, অধিক যোগ্য গ্র্যাজুয়েট ও ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের বাদ দিয়ে অষ্টম শ্রেণি ও মাধ্যমিক পাস কয়েকজন কর্মচারীকে পদোন্নতির সুপারিশ করা হয়।



অভিযোগকারী দাবি করেছেন, এ প্রক্রিয়ায় বিএসসির চাকরি প্রবিধানমালা ও পদোন্নতি নীতিমালা লঙ্ঘন করা হয়েছে।



পদোন্নতি সংক্রান্ত অভিযোগে এক কর্মচারীর কাছ থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা ঘুষ নেওয়ার কথিত স্বীকারোক্তির বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।



অভিযোগকারী দাবি করেছেন, পদোন্নতি পাওয়া এক কর্মচারী ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা ঘুষ দেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। বিএসসির এক সুপারিনটেনডেন্ট ওই বক্তব্য মোবাইল ফোনে রেকর্ড করেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।



অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ওই কথিত রেকর্ড পরবর্তীতে বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের শোনানো হয়। তবে এ বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগকারী দাবি করেছেন।



বিএসসির জাহাজ মেরামত বিভাগে পছন্দের ঠিকাদারের মাধ্যমে অতিমূল্যে যন্ত্রাংশ ও মেরামতকাজ দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ করা হয়েছে।



অভিযোগপত্রে পরিবহন অডিট অধিদপ্তরের একটি অডিট আপত্তির উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, মেরামতের অযোগ্য দুটি জাহাজ “এমটি বাংলার জ্যোতি ও এমটি বাংলার সৌরভ” মেরামতের নামে ৫ কোটি ৬৬ লাখ ৭৬ হাজার ৯২৭ টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে।



অভিযোগে এসব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে বিএসসির নির্বাহী পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ ইউসুফ এবং তৎকালীন জাহাজ মেরামত বিভাগের মহাব্যবস্থাপক মো. জিয়াউর রহমানের সম্পৃক্ততার অভিযোগ করা হয়েছে।



অভিযোগকারী দাবি করেছেন, পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ দেওয়ার মাধ্যমে অতিমূল্যে যন্ত্রাংশ ও মেরামতকাজ দেখিয়ে অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে।



অভিযোগপত্রে বিএসসির বিভিন্ন বিভাগে অনিয়মের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও করা হয়েছে।



অভিযোগকারী দাবি করেছেন, এসব অনিয়মের তথ্য গণমাধ্যমে প্রকাশ না করার জন্য প্রশাসনিক বাজেট থেকে অর্থ ব্যয় করা হয়েছে।



এ বিষয়ে অভিযোগপত্রে প্রশাসনিক বাজেট থেকে অর্থ ব্যয়ের অভিযোগ তুলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।



বিএসসির প্রশাসনিক কাঠামো নিয়েও অভিযোগ করা হয়েছে।



অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, বিএসসির নির্বাহী পরিচালক (প্রযুক্তি) পদ প্রায় আট বছর ধরে এবং নির্বাহী পরিচালক (অর্থ) পদ পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে শূন্য রয়েছে।



অভিযোগকারীর দাবি, গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো দীর্ঘদিন শূন্য থাকায় চলতি দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা এসব দায়িত্ব পালন করছেন এবং এর ফলে ক্ষমতার অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয়েছে।



অভিযোগে বিএসসির প্রশাসনিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।



বিএসসির মহাব্যবস্থাপক (দূরপ্রাচ্য ও পশ্চিম এশিয়া) মো. আতাউর রহমানের লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পর ২০২৫ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় যুগ্মসচিব (জাহাজ) মোহাম্মদ এমরান হোসেনকে তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেয়।



তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে তাঁকে অভিযোগগুলো তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের দায়িত্ব দেওয়া হয়।



অভিযোগ পাওয়ার প্রায় ১০ মাস পর গত ১৫ জুলাই জারি করা নোটিশে তদন্ত কর্মকর্তা ২৯ জুলাই শুনানির তারিখ নির্ধারণ করেন।



নোটিশে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে সংশ্লিষ্টদের লিখিত বক্তব্য ও স্বপক্ষের প্রমাণাদিসহ উপস্থিত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।



নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের নোটিশ অনুযায়ী, আগামীকাল ২৯ জুলাই সকাল ১১টায় অনুষ্ঠিতব্য শুনানিতে বিএসসির নির্বাহী পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ ইউসুফ, অভিযোগকারী মহাব্যবস্থাপক (দূরপ্রাচ্য ও পশ্চিম এশিয়া) মো. আতাউর রহমান, মহাব্যবস্থাপক (চলতি দায়িত্ব) মো. জিয়াউর রহমান চৌং, রেকর্ড কিপার ও সিবিএ নেতা মো. আতিকউর রহমান এবং মেরিন ওয়ার্কশপের ফোরম্যান ও সিবিএ নেতা মো. নাজমুল আহসানকে উপস্থিত থাকতে বলা হয়েছে।



নোটিশে সংশ্লিষ্টদের তাঁদের লিখিত বক্তব্য এবং অভিযোগের বিষয়ে স্বপক্ষের প্রমাণাদি নিয়ে উপস্থিত হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।



যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে, তাদের সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। ফলে এ বিষয়ে তাদের কোনো মন্তব্যও জানা সম্ভব হয়নি।